প্রতিবেদন

রেলের উন্নয়নে সরকারের নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের যোগাযোগ খাতের উন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। নৌ-সড়ক-রেল ও আকাশপথের উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু চলমান। এছাড়াও নতুন নতুন আরও বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব সেক্টরকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হলে এগিয়ে যাবে দেশের গোটা অর্থনীতি। দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহের সঙ্গে যোগাযোগ খাতে এগিয়ে থাকতে চায় বাংলাদেশ। এর মধ্যে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাও চূড়ান্ত। পাকিস্তান আমলে বন্ধ হয়ে যাওয়া রেলপথগুলো আবার চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সে লক্ষ্যে কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। দেশের যোগাযোগ সেক্টরের উন্নয়নে এবারের বাজেটে ৫০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে রেলপথের গুরুত্ব বিবেচনায় এর নেটওয়ার্ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে। এরই অংশ হিসেবে দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম, কালুখালী-ভাটিয়াপাড়া-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া, পাচুঁরিয়া-ফরিদপুর-ভাঙ্গা, ঈশ্বরদী-পাবনা-ঢালারচর এবং খুলনা-মোংলা রেললাইন নির্মাণ/পুনঃনির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে। উদ্বোধনের দিন থেকেই পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে রেল সার্ভিস চালু করার লক্ষ্যে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণের কাজ চলছে।
পায়রা বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে ফরিদপুরের ভাঙ্গা জংশন হতে বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া রোলিং স্টক ব্যবস্থার উন্নয়নে ১০০ এমজি লোকোমোটিভ, ৫৫০ এমজি এবং ১৫০ বিজি যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে করিডোরকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জাইকার অর্থায়নে যমুনা নদীর ওপর নির্মিত বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে একটি রেল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতীয় ঋণের আওতায় খুলনা-দর্শনা সেকশন ডাবল লাইনে উন্নীত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া আখাউড়া-সিলেট সেকশনে ডাবল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও আছে।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যেসব রুটে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, সেগুলো পুনরায় চালু করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ১৬ অক্টোবর গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে ঢাকা-কুড়িগ্রাম-ঢাকা রুটে প্রথম আন্তঃনগর ট্রেন চালু এবং রংপুর এক্সপ্রেস ও লালমনিরহাট এক্সপ্রেসের র‌্যাক প্রতিস্থাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, উত্তরবঙ্গে যেসব রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল, সেগুলো আমরা চালু করেছি। আর ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর যেসব লিংক বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল তখনকার পাকিস্তানের পক্ষ থেকে, সেই লিংকগুলো আবার চালু করে দিতে চাচ্ছি।
লাইনগুলো ফের চালু হলে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ে আরও লাভবান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে অনেক রেল ও রেললাইন বন্ধ করে দেয়া হয়। এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছিল। রেলকে উন্নত করার জন্য আমরা ব্যবস্থা নিই। পাশাপাশি যেসব এলাকায় রেল যোগাযোগ ছিল না, সেসব জায়গাতেও রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণবঙ্গসহ সারা বাংলাদেশই রেল যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসা হবে। দ্রুতগতির রেল চালুরও পরিকল্পনা রয়েছে। যেটি একেবারে মুমূর্ষূ অবস্থায় ছিল, লাভজনক ছিল না বলে যারা এটিকে বন্ধ করতে চেয়েছিল, আমরা আজকে তাদের দেখাতে চাই, রেলকে লাভজনক করা যেতে পারে।
গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী সবুজ পতাকা নাড়িয়ে, বাঁশি বাজিয়ে নতুন ট্রেনের উদ্বোধন করেন। ১৭ অক্টোবর থেকে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুড়িগ্রামকে আমরা সব সময়ই গুরুত্ব দেই। কারণ কুড়িগ্রাম, রংপুর বা ওই অঞ্চল ছিল দুর্ভিক্ষপীড়িত একটা এলাকা। এই কুড়িগ্রামে বলতে গেলে প্রায় সারা বছর দুর্ভিক্ষ লেগেই থাকত। যোগাযোগব্যবস্থা এত দুর্গম ছিল যে চিন্তাও করা যায় না।
যমুনা সেতু নির্মাণের সময় রেল লাইন স্থাপনসহ সেতুটিকে বহুমুখীকরণে তার সরকার উদ্যোগে গ্রহণ করে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, যমুনা সেতুর মূল নকশা প্রণয়ন হয়ে যাওয়ার পর সরকারে এলেও আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি এই সেতুর সঙ্গে আমাদের রেলের লাইন, গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন থাকতে হবে। এটি মাল্টিপারপাস হবে এবং সেই মোতাবেকই আমরা এর সঙ্গে রেল সংযোগ সম্পৃক্ত করি। রেললাইন স্থাপনের ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে আমাদের রাজধানী ঢাকার ভালো যোগাযোগের সুব্যবস্থা হয়ে যায়।
রেলের জন্য কুড়িগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির কথা উল্লেখ করে সে দাবি পূরণে নিজের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কুড়িগ্রামে আমরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় করে দিতে পারি। আর লালমনিরহাটে আমরা ভিন্ন ধরনের একটি বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। সেটা হচ্ছে অ্যারোস্পেস অ্যান্ড অ্যাভিয়েশন বিশ্ববিদ্যালয়।
ভিডিও কনফারেন্সের শুরুতেই গণভবনে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস এবং রেল সেক্টরের উন্নয়ন নিয়ে একটি উপস্থাপনা দেন রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন। তিনি জানান, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস কুড়িগ্রাম রেলস্টেশন থেকে সকাল ৭টা ২০ মিনিটে ছেড়ে বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছাবে। কমলাপুর স্টেশন থেকে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে সকাল ৬টা ২০ মিনিটে কুড়িগ্রাম স্টেশনে পৌঁছাবে।
ট্রেনটি বুধবার চলাচল করবে না। ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে শোভন চেয়ার ৫১০ টাকা, স্নিগ্ধা চেয়ার ৯৭২ টাকা, এসি প্রতি আসন ১ হাজার ১৬৮ টাকা এবং এসি বাথ ১ হাজার ৮০৪ টাকা।