অর্থনীতি

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমছে: ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সরকারও চিন্তিত

নিজস্ব প্রতিবেদক
একদিকে নিরাপদ বিনিয়োগ, অন্য দিকে সুদহার ব্যাংকের তুলনায় দ্বিগুণ Ñ এ জন্য এতদিন সঞ্চয়পত্র কেনা ছিল লাভজনক বিনিয়োগ। বৈধ-অবৈধ অর্থ দিয়ে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ গত জুলাই থেকে রহিত হয়। চালু হয় অনলাইন ম্যানেজমেন্ট। এরপর থেকে পতনের রেকর্ড হতে থাকে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে। গত দুই মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে সরকারের দেয়া কিছু বিধিনিষেধের কারণে এ খাতে বিনিয়োগ কমছে। এতে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। আগের মতো বর্তমানে যে কেউ চাইলেই ঢালাওভাবে সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছেন না। ফলে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে নিট সঞ্চয়পত্র বিক্রি ৩ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা। অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। এর আগের মাস জুলাইয়ে বিক্রি হয়েছে ২ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে ৬৬১ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে বিক্রি হয়েছিল ৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র। সে হিসেবে ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী ধারায় হাঁটছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এতে চিন্তিত হয়ে পড়েছে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি সরকারও।
সরকার সঞ্চয়পত্র কেনার লক্ষ্যমাত্রা বাজেটে নির্ধারণ করে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিক্রির চাপ কমাতে চলতি বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে কোনো সঞ্চয়পত্র কেনা যাবে না মর্মে শর্ত আরোপ করা হয়।
আগে কাগুজে সিস্টেম চালু থাকায় নামে-বেনামে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ ছিল। কিন্তু জুলাই থেকে অনলাইন সিস্টেম চালু হয়েছে। এর ফলে একই ব্যক্তি একাধিকবার এবং সীমার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে পারছেন না।
সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়াকে ব্যাংকে আমানত কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে মনে করেছিলেন অনেকে। ব্যাংক খাতের চাইতে এ খাতে সুদের হার অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় অনেকেই সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকতে থাকেন। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রিতে রাশ টানতে এ সুদের হার কমিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন ব্যাংকাররা। অবশ্য সরকার সুদের হার না নামিয়ে কর বাড়ানোসহ সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে বেশকিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে। দুর্নীতির আয় কিংবা অপ্রদর্শিত অর্থ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধ করতে ক্রেতার একটি তথ্যভা-ার সংরক্ষণ করা হচ্ছে। চাইলেই প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। এছাড়া এখন প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে কর কমিশনারের প্রত্যয়নপত্র লাগে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ফার্মের নামে সঞ্চয়পত্র কিনতেও কর কর্মকর্তাদের প্রত্যয়নের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে ভুল কিংবা ভুয়া তথ্য দিয়ে সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের সুযোগ কমে আসে। এর ফলে ব্যাংকের তারল্যসংকট কাটানোর পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও অর্থপ্রবাহ বাড়বে বলে অশা করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব কারণেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কমছে।
সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ৫ বছরে আলোচ্য দু’মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কখনো কমেনি, বরং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধির রেকর্ড হয়। ওই বছরের জুলাই-আগস্টে সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে সরকারের নিট আয় হয় ৭ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৪ হাজার ৬২৭ কোটি টাকা। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে আগের অর্থবছরের তুলনায় সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ে ৭ শতাংশ। এছাড়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আলোচ্য দুই মাসে বিক্রি বাড়ে দশমিক ৪৭ শতাংশ।
ব্যাংকের আমানতের সুদের হারের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার অনেক বেশি হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হচ্ছিল। পুঁজিবাজারেও দীর্ঘদিন ধরে মন্দা চলছে। সব মিলিয়ে যাদের সঞ্চয় ছিল তারা ‘নিরাপদ’ বিনিয়োগ সঞ্চয়পত্রকেই বেছে নিয়েছিল। কিন্তু করের হার বৃদ্ধির কারণে এখন কম মুনাফা পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এ ছাড়া টিআইএন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন অনেকেই।
বর্তমানে ৫ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে সুদহার ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, ৩ বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ ও ৩ বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদহার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। কিন্তু ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার এই হারের চাইতে কম। ফলে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি কেবলই বাড়ছিল। এর রাশ টানতে সরকার বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দেয়ায় সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকে ঝামেলাপূর্ণ মনে করছেন, দুর্নীতিবাজ বিনিয়োগকারীদের নামে-বেনামে বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। আর এর ফলে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণগ্রহণে ঋণাত্মক ধারা বিরাজ করায় চিন্তিত হয়ে পড়েছে সরকার।