কলাম

সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়ে কিছু প্রাথমিক সাধারণ কথা

অ্যাডভোকেট মোমিন শেখ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
রাদ্দ (জধফফ) বা রদনীতি বা
ফেরতনীতি বা প্রত্যর্পণনীতি
মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকার বা ফারায়েজের নিয়ম মোতাবেক অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করার পর যদি কিছু সম্পত্তি বেঁচে যায় বা উদ্বৃত্ত থাকে, সেই উদ্বৃত্ত সম্পত্তি অংশীদারদের মধ্যে আনুপাতিক হারে পুনর্বণ্টন করতে হয়। এ উদ্বৃত্ত সম্পত্তি অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করার নিয়মকেই রাদ্দনীতি বা রদনীতি বা ফেরতনীতি বলে।
মনে রাখতে হবে, মৃত ব্যক্তির কোনো অবশিষ্টভোগী বা দূরবর্তী আত্মীয় উপস্থিত থাকলে স্বামী বা স্ত্রী উদ্বৃত্ত বা অবশিষ্ট সম্পত্তি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে। তবে অবশিষ্টভোগী বা দূরবর্তী কোনো আত্মীয় উপস্থিত না থাকলে তখন স্বামী বা স্ত্রী রাদ্দনীতিতে অংশ পাওয়ার অধিকারী হবে, যা রাদ্দনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যতিক্রমী বিষয়। আউলনীতিতে ভাগের সংখ্যা (হর) বৃদ্ধি করতে এবং রাদ্দনীতিতে ভাগের সংখ্যা (হর) কমাতে হয়। আর এই বৃদ্ধি এবং কমানোর বিষয়টি শুধু হরকে দিয়েই করতে হয়। অর্থাৎ আউল এবং রাদ্দ যেটিই হোক না কেন, পরিবর্তন হরকেই করতে হয়। লবের কোনো পরিবর্তন করতে হয় না।

আউলনীতির সমালোচনা
ফারায়েজ বা উত্তরাধিকারের বিধি-বিধান যতটা সহজ মনে হয় বাস্তবে তা অনেক কঠিন এবং জটিলও বটে। সম্পত্তি বণ্টনের সময় আউলনীতি, রাদ্দনীতি, ওমরিয়াতান নীতি, মিম্বোরিয়া, ভাগ্যবান দুর্ভাগ্যবান আত্মীয়, বৈপিত্রেয় ও বৈমাত্রেয় ভাই-বোন ইত্যাদির ক্ষেত্রে নিয়মগুলো না থাকলে বেশ সহজ মনে হতো। আউলনীতি সম্পর্কে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যেও মতামতের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) আউলকে কোরআনিক বিধানের পরিপন্থি বলে গণ্য করে বলেছেন ‘আল্লা আলিজ মরুভূমির প্রতিটি বালু-কণার হিসাব রাখেন। তিনি সম্পত্তি বণ্টনে এমন বিধান দিতে পারেন না।’ মো. ফেরদাউস খান রচিত ‘ঞযড়ঁমযঃং ড়হ ঃযব সঁংষরস ষধি ড়ভ রহযবৎরঃধহপব’ বইয়ের ২০-৩০ পৃষ্ঠায় আউলনীতির ব্যাখ্যায় সম্পত্তি বণ্টন সংক্রান্ত আয়াতগুলোর কিছু শব্দের ভিন্ন ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে আউলনীতির প্রয়োগের প্রয়োজন হতো না। অন্যদিকে সুন্নি উত্তরাধিকার আইনের আউলনীতি শিয়া উত্তরাধিকার আইনে প্রযোজ্য নয়। শুধু আউলনীতিই নয়, সুন্নি উত্তরাধিকার আইনের সাথে শিয়া উত্তরাধিকার আইনের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। শিয়া আইনের অধ্যায়ে তা আলোচনা করা হবে।

রাদ্দনীতিতে দুইভাবে অংশ বণ্টন করতে হবে
স্বামী বা স্ত্রী না থাকলে হরকে কমিয়ে অংশীদারদের মধ্যে অংশ বণ্টন করতে হবে। স্বামী বা স্ত্রী উপস্থিত থাকলে অন্যদের অংশ দেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বহাল রেখে অবশিষ্ট সম্পত্তি অন্যদের অংশের সাথে যোগ করে দিতে হবে।
আউল ও রাদ্দনীতির মধ্যে
মৌলিক কিছু পার্থক্য
প্রথমত: সম্পত্তি বণ্টন করার পূর্বে মোট সম্পত্তির পরিমাণ বণ্টন করার পর সম্পত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তখন ভগ্নাংশের লব বড় হয় এবং হর ছোট হয়। কিন্তু রাদ্দনীতি আউলনীতির ঠিক বিপরীত। রাদ্দনীতিতে সম্পত্তি বণ্টনের পর মোট সম্পত্তির যোগফল কম হয় অর্থাৎ লব ছোট হয় এবং হর বড় হয়।
দ্বিতীয়ত: আউলে অংশীদারদের অংশ আনুপাতিক হারে অংশ কমে যায়। আর রাদ্দনীতিতে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ বহাল থাকে এবং অন্যান্য অংশীদারদের অংশ বেড়ে যায়।
তৃতীয়ত: আউলনীতিতে স্বামী বা স্ত্রীর অংশ আনুপাতিক হারে কমে যায়। কিন্তু রাদ্দনীতিতে স্বামী বা স্ত্রীর অংশের কোনো পরিবর্তন হয় না।
চতুর্থত: আউলনীতিতে বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষার জন্য হরকে বৃদ্ধি করে লবের সমান করতে হয়। কিন্তু রাদ্দনীতিতে স্বামী বা স্ত্রী না থাকলে হরকে কমিয়ে লবের সমান করতে হয়।
পঞ্চমত: আউলনীতিতে হরকে বৃদ্ধি করতে হয় এবং রাদ্দনীতিতে হরকে কমাতে হয়।

পবিত্র কোরআনে নির্ধারিত অংশ
৬টি নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ নিয়ে সামান্য আলোচনা করা যাক। পবিত্র কোরআনে সুরা আন নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নং আয়াতে অংশীদারদের অংশ নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করেছেন। এ নির্দিষ্ট অংশগুলোকে মোট ৬টি ভগ্নাংশ আকারে নির্ধারণ করেছেন । যেমনÑ
১/২ অংশ বা দুই ভাগের একভাগ
১/৪ অংশ বা চার ভাগের একভাগ
১/৮ অংশ বা আট ভাগের একভাগ
২/৩ অংশ বা তিন ভাগের দুইভাগ
১/৩ অংশ বা তিন ভাগের একভাগ
১/৬ অংশ বা ছয় ভাগের একভাগ
উল্লিখিত অংশগুলো জাবিল ফুরুজ অর্থাৎ অংশীদারদের অংশের কথা উল্লেখ করেছেন, সম্পত্তির পরিমাণের কথা নয়। অর্থাৎ মোট সম্পত্তির পরিমাণ যতটুকু হবে ওই পরিমাণ সম্পত্তিতে কে কত অংশ পাবে সেটাই উল্লেখ করেছেন। যেমন ১০ বিঘা সম্পত্তির ১/২ অংশ = ৫ বিঘা, আবার ২০ বিঘা সম্পত্তির ১/২ অংশ = ১০ বিঘা। এখানে দেখা যাচ্ছে অংশ সমান হলেও সম্পত্তির পরিমাণ সমান নয়। ফারায়েজবিদগণ এ অংশগুলোকে দুটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন।
যেমন প্রথম পর্যায়ের অংশগুলো ১/২, ১/৪ ও ১/৮ এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের অংশগুলো ২/৩, ১/৩ ও ১/৬।
দু’টি পর্যায়ের মধ্যে চমৎকার একটি মিল পাওয়া যায়। প্রথম পর্যায়ের ভগ্নাংশ ১/২ কে অর্ধেক করলে বা ২ দ্বারা ভাগ করলে পরবর্তী ভগ্নাংশ ১/৪ পাওয়া যায়। একইভাবে পরবর্তী ভগ্নাংশ ১/৪ কে অর্ধেক করলে বা ২ দ্বারা ভাগ করলে পরবর্তী ভগ্নাংশ ১/৮ পাওয়া যায়। দ্বিতীয় পর্যায়েও তা লক্ষ্য করা যায়। যেমন ২/৩ অংশকে ২ দ্বারা ভাগ করলে পরবর্তী ১/৩ অংশ এবং ১/৩ অংশটিকে ২ দ্বারা ভাগ করলে পরবর্তী ১/৬ অংশ পাওয়া যায়। এভাবে অংশীদারদের অংশ বের করবার জন্য মোট ৬টি ভগ্নাংশের হরগুলোর লসাগু থেকে মোট ৭টি সংখ্যা পাওয়া যায় যেমন ২, ৩, ৪, ৬, ৮, ১২ ও ২৪। এ সংখ্যাগুলো আউল এবং রাদ্দনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ
কিভাবে এই ৭টি সংখ্যা পাওয়া গেল তা সংক্ষেপে উদাহরণসহ নিচে দেয়া হলো।
যেমন ১/২ + ১/২ ভগ্নাংশ দু’টি যোগ করতে হলে হর দু’টি ২ ও ২ এর লসাগু করতে হবে। এক্ষেত্রে লসাগু হবে = ২
একইভাবে –
১/২ + ১/২ এর লসাগু হবে = ২
১/৩ + ১/৩ এর লসাগু হবে = ৩
১/২ + ১/৪ এর লসাগু হবে = ৪
১/২ + ১/৩ + ২/৩ এর লসাগু হবে = ৬
১/২ + ১/৪ + ১/৮ এর লসাগু হবে = ৮
১/৪ + ১/৬ এর লসাগু হবে = ১২
১/৪ + ১/৬ + ১/৮ এর লসাগু হবে = ২৪
এখন এই ৬টি নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ যেমন ১/২, ১/৪, ১/৮, ২/৩, ১/৩ এবং ১/৬ কে যতভাবেই যোগ-বিয়োগ করি না কেন এদের লসাগু মৌলিকভাবে উল্লিখিত ২, ৩, ৪, ৬, ৮, ১২ এবং ২৪ মোট ৭টি সংখ্যার বাইরে অন্য কোনো সংখ্যা হবে না। অর্থাৎ ৬টি ভগ্নাংশের লসাগু হবে ২, ৩, ৪, ৬, ৮, ১২ ও ২৪। এই ৭টি সংখ্যার বাইরে অন্য কোনো সংখ্যা হবে না। এ ৭টি সংখ্যা দিয়েই মূল সম্পত্তির বণ্টন করতে হয়। ৭টি সংখ্যার মধ্যে ৪টি সংখ্যার আউল হয় না যেমন ২, ৩, ৪ ও ৮। তবে অবশিষ্ট ৩টি সংখ্যারই সময়ভেদে আউল হয়। যেমন ৬, ১২ এবং ২৪।

ভাগ্যবান ও দুর্ভাগ্যবান আত্মীয়ের নীতি
ভাগ্যবান আত্মীয় অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় অংশীদারদের মধ্যে থেকে যদি কোনো দুর্ভাগ্যবান আত্মীয় অংশ পেয়ে থাকেন তখন তাকে ভাগ্যবান আত্মীয় বলে। যেমন কোনো মৃত ব্যক্তির ২ কন্যা থাকা সত্ত্বেও পুত্রের কন্যা সম্পত্তিতে অবশিষ্টভোগী হিসেবে অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবে না। কারণ, পুত্রের কন্যার সাথে যদি পুত্রও থাকে তখন পুত্রের পুত্রের সাথে পুত্রের কন্যা অবশিষ্টভোগী হিসেবে সম্পত্তি পেয়ে থাকেন।
আবার আপন দুই বোন থাকলেও বৈমাত্রেয় বোন বৈমাত্রেয় ভাই থাকার কারণে অবশিষ্টভোগী হিসেবে সম্পত্তি পেয়ে থাকেন (এখানে পুত্রের কন্যা এবং বৈমাত্রেয় বোন ভাগ্যবান ব্যক্তি)।

দুর্ভাগ্যবান আত্মীয়
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় অংশীদারদের মধ্যে থেকে যদি কেউ অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় তখন তাকে দুর্ভাগ্যবান আত্মীয় বলে। যেমন মৃত ব্যক্তির ২ কন্যা থাকলে পুত্রের কন্যা সম্পত্তি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। আবার আপন ২ বোন থাকলে বৈমাত্রেয় বোন সম্পত্তি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় (এখানে পুত্রের কন্যা এবং বৈমাত্রেয় বোন দুর্ভাগ্যবান আত্মীয়)।
Ñ(চলবে)
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ