রাজনীতি

বিএনপি কি ‘দ্বিতীয় শিক্ষা’টি পেতে যাচ্ছে?

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি কি আবার ঐক্যফ্রন্টনির্ভর হচ্ছে, নাকি ঐক্যফ্রন্টই বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছে Ñ জনমনে এমন প্রশ্ন নতুন করে উত্থাপিত হচ্ছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর ঐক্যফ্রন্টের এক প্রকার রাজনৈতিক মৃত্যু ঘটে। ঐক্যফ্রন্টপ্রধান ড. কামাল হোসেন রাজনৈতিকভাবে একেবারে নিরব হয়ে পুরনো আইনব্যবসায় ফিরে যান। এখন তিনি আবার রাজনৈতিকভাবে সরব হয়ে উঠছেন। গণফোরামের বদলে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ হয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন। কারাবন্দি বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন সরকারের অনুমতিও পেয়ে গেছেন।
ড. কামালের তৎপরতা দেখে অনেকেই মন্তব্য করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যে বিএনপি তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থের জন্য সেই বিএনপির ছায়াতলেই তিনি আবার আশ্রয় নিতে চাচ্ছেন। আর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন করে ড. কামালের মাঝে আশ্রয় খুঁজছেন মূলত নিজ দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের ওপর বিতশ্রদ্ধ হয়েই। মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে গত দুই বছরে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারেননি। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে তারা বরং ক্ষমতার হালুয়ারুটি খেতেই ব্যস্ত আছেন।
সরকারবিরোধী আন্দোলন নতুন করে শুরুর জন্যই মূলত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান চাচ্ছেন, বিএনপি আবার ঐক্যফ্রন্টের ছায়াতলে আশ্রয় নিক। কারণ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী অভিজ্ঞতায় তারেক রহমান দেখেছেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা সরকারবিরোধী আন্দোলন ও খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এ অবস্থায় তাদের ওপর মোটেও আস্থা রাখতে না পেরে আবারও ঐক্যফ্রন্টে শামিল হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। আর এ চেষ্টার অংশ হিসেবেই সম্প্রতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে স্কাইপে আলাপও সম্পন্ন করেছেন তিনি।
লন্ডনে অবস্থানকারী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামালের সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ, সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে তোলা, খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাাৎ ও তার মুক্তি দাবি এবং জামায়াতের প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেছেন বলে জানা যায়। তারেক রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ-আলোচনার পর ঐক্যফ্রন্টের নেতারা বৈঠকে মিলিত হয়ে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাাতের বিষয়ে সরকারের কাছে অনুমতির আবেদনও করেছেন। খালেদা জিয়ার সঙ্গে ড. কামাল হোসেনসহ ঐক্যফ্রন্টের একটি প্রতিনিধিদলকে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেখা করার অনুমতিও দিয়েছে সরকার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়া ও ড. কামালের সাাতের মধ্য দিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বের প্রতি নেতাকর্মীদের আস্থা তৈরি করাতে চাচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি চাচ্ছেন, সমন্বিত মনোভাবের ভেতর দিয়ে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নতুন রোডম্যাপ সৃষ্টি হোক।
বিএনপি নেতারা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপির তৃণমূলে যে প্রশ্ন ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছিল, তা কেটে যাবে। বিএনপি চেয়ারপারসনকে দেখে এসে ড. কামাল আইনি বিষয়ে আরো সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ও সহযোগিতা দেবেন।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর এই প্রথম ঐক্যফ্রন্ট নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাাৎ করতে যাচ্ছেন। এর আগে ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা যাওয়ার পর গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে শোক জানাতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে ১০ মিনিটের বৈঠক হয়েছিল ড. কামালের নেতৃত্বে বর্তমানে ঐক্যফ্রন্টে থাকা নেতাদের। অবশ্য সেই বৈঠকের বেশিরভাগ সময়জুড়েই ছিল কোকোর স্মৃতিচারণ।
জানা গেছে, খালেদা জিয়াকে দেখতে যাওয়ার এই সিদ্ধান্ত বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টে নতুন আশা তৈরি করেছে। কেননা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ড. কামালের অংশ না নেয়া, নির্বাচনের পর বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তাঁর ‘দলীয় মতাদর্শভিত্তিক’ বক্তব্য দেয়া, জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক না বলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সভায় বিএনপি নেতাদের ােভ প্রকাশ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে গুরুত্ব না দেয়াসহ নানা কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে কামাল হোসেনকে নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন উঠেছিল। এই সাাতের মধ্য দিয়ে সেই সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাাতের জন্য ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের যে তালিকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেয়া হয়েছে। তাতে আছেন গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রধান আ স ম আবদুর রব, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বিকল্পধারার আহ্বায়ক নুরুল আলম বেপারী, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক ড. রেজা কিবরিয়া ও জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব।
বিএনপির একটি পক্ষ বলছে, সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙা করার জন্য নয়, খালেদা জিয়া যাতে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য স্থায়ীভাবে বিদেশ চলে যান, সে বিষয়টিতে রাজি করানোর জন্যই সরকার খালেদা জিয়ার সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামালের সাক্ষাতের অনুমতি দিয়েছে। সরকার মনে করছে, ড. কামাল যেভাবে বিএনপিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনেছিল, সেভাবেই খালেদা জিয়াকে আইনী মারপ্যাঁচে কথা বলে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশ পাঠাতে সক্ষম হবেন। এর মধ্য দিয়ে ড. কামালের মাধ্যমে বিএনপি ‘দ্বিতীয় শিক্ষা’টি পাবে।