অর্থনীতি

ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
খেলাপি ঋণ হ্রাস করাসহ ব্যাংকিং খাত সংস্কারে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিচ্ছে সরকার। এর আওতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সংশ্লিষ্ট আইনের সংস্কার করা হবে। সংস্কারের আগে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেতে নভেম্বরে একটি জাতীয় সেমিনারের আয়োজন করবে অর্থ বিভাগ। সেখানে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন।
এছাড়া আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই খেলাপি ঋণ কমাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠনের ল্েয বিশেষ আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হবে। ২০২০ সালে গঠন হবে এএমসি। ক্র্যাশ কর্মসূচির অধীনে সংস্কার করা হবে ঋণশ্রেণিকরণ ও পুনঃতফসিলিকরণে বিদ্যমান আইনও। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদারে আন্তর্জাতিক সংস্থা আইপিএএফ সদস্যপদ লাভের উদ্যোগ নেয়া হবে। কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।
সম্প্রতি ক্র্যাশ কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, এডিবি ব্যাংকিং খাত সংস্কারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি নিজস্ব টুলস ব্যবহার করে ব্যাংক ও আর্থিক খাত উন্নয়নে কাজ করবে। এডিবি এ ধরনের কাজ বিশ্বের অন্যান্য দেশেও করেছে।
উল্লেখ্য, নানামুখী সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বস্তাভরে টাকা বের করে নিয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ বিদেশেও পাচার করেছে। নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। মামলাজটের কারণে অর্থঋণ আদালতে ঋণের কয়েক লাখ কোটি টাকা আটকে আছে। সংশ্লিষ্ট আইনগুলো দুর্বল থাকায় অনিয়ম করেও পার পেয়ে যাচ্ছে অভিযুক্তরা। এমন সংকটময় মুহূর্তে এ খাত সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছে এডিবি।
এডিবির সহায়তায় খেলাপি ঋণ হ্রাস করাসহ ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে নেয়া ক্র্যাশ প্রোগ্রাম প্রসঙ্গে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর কাছে কর্মপরিকল্পনা দাখিল করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সেখানে বলা হয়, খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। গঠন করা হবে এএমসি। এ জন্য নভেম্বরে ২ দিনব্যাপী জাতীয় সেমিনার ডাকা হবে। সেখান থেকে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট সুপারিশ বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে।
এছাড়া আগামী ২০২০ সালের মধ্যে এ খাতে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি (এএমসি) গঠন করা হবে। এএমসি গঠনের ল্েয আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে বিশেষ আইনের খসড়া তৈরি করা হবে।
ক্র্যাশ কর্মসূচির কর্মপরিকল্পনায় আরও বলা হয়, ঋণশ্রেণিকরণ, পুনঃতফসিলিকরণ, রিস্ট্রাকচারিং, রাইট-অফ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো সংস্কার করা হবে। এ ছাড়া ২০২০ সালের মধ্যে ব্যাংক ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট আইনগুলো যুগোপযোগী করা হবে। এ ল্েয আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক যৌথভাবে একটি খসড়া প্রস্তুত করছে।
খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদারের জন্য দি ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ারড অ্যাক্সেস ফেডারেশনের (আইপিএএফ) প্রথমে সহযোগী ও পরে পূর্ণ সদস্যপদ অর্জনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে ওই কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়।
আইপিএএফ হচ্ছে অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান। যেকোনো প্রতিষ্ঠান বা খাত (সরকারি ও বেসরকারি) উন্নয়ন ও দতা বাড়াতে এ প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশে কাজ করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠান ১৯৮৩ সাল থেকে কাজ করছে।
এছাড়া দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) বাজার সৃষ্টি করা হবে। খেলাপি ঋণ ও জামানতের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি আলাদা ডিস্টারসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ডিএএমডি) প্রতিষ্ঠা করা হবে। দতা বাড়াতে প্রশিণের আওতায় আনা হবে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থ ঋণ আদালতের বিচারকদের।
খেলাপি ঋণ কমাতে দণি কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন ও ভিয়েতনামে কাজ করছে এডিবি। এর মধ্যে দণি কোরিয়ায় কেএএমসিকো, ভিয়েতনামে ভিএএমসি, মালয়েশিয়ায় ডানাহারলজ, চীনে এফআরএফ ও থাইল্যান্ডে টিএএমএল গঠনের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর েেত্র সাফল্য এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবমতে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। জুন শেষে অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। আর অবলোপনসহ খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আগের বছরের জুন পর্যন্ত অবলোপন বাদে খেলাপি ঋণ ছিল ৯০ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অব্যবস্থা ও দুর্বল আইনের কারণে প্রতি বছর ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। এ অর্থের সিংহভাগই পাচার হচ্ছে বিদেশে।
পাশাপাশি একটি কার্যকর ও দুর্নীতিমুক্ত বিচারব্যবস্থা দাঁড় করাতে হবে। অন্যথায় খেলাপি ঋণের সমস্যা ও পুঁজি লুণ্ঠন থেকে ব্যাংকিং খাতকে রা করা সম্ভব হবে না। মাত্র কয়েক শ’ ধনাঢ্য রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যাংকিং খাত পুঁজি লুটপাটের আকর্ষণীয় েেত্র পরিণত হয়েছে। আর এসব থেকে উত্তরণের জন্যই অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে। এই প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায়, ব্যাংকিং খাত নিয়মনীতির আওতায় আসবে এবং খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে আসবে।