কলাম

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিং বন্ধ করা জরুরি

ডা. কামরুল হাসান খান
গত ১৬ অক্টোবর সন্ত্রাস-সাম্প্রদায়িকতা রুখে দেয়ার শপথের মধ্য দিয়ে বুয়েটে আবরার হত্যার প্রতিবাদে গড়ে ওঠা মাঠের আন্দোলনের ইতি টানলেন শিার্থীরা। শপথে তারা বলেছেন, বুয়েটের আঙিনায় আর যেন নিষ্পাপ কোনো প্রাণ ঝরে না যায়, আর কোনো নিরপরাধ শিক্ষার্থী যেন অত্যাচারের শিকার না হয়, সেটা সবাই মিলে নিশ্চিত করবেন।
সেদিন বুয়েট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই শপথে বিপুল শিার্থী অংশ নেন। শপথ নেন বুয়েটের উপাচার্য ড. সাইফুল ইসলাম এবং বিভিন্ন হলের প্রভোস্টরাও। শপথ পড়ান বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের ছাত্রী রাফিয়া রিজওয়ানা। তবে শিকরা মিলনায়তনে উপস্থিত থাকলেও শপথে অংশ নেননি।
৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে সম্পূর্ণ বিনা কারণে পিটিয়ে হত্যা করে বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী। এর পর থেকেই আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন শিার্থীরা। শিার্থীরা আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধসহ ১০ দফা দাবিতে বিােভে উত্তাল করে রাখে ক্যাম্পাস। সরকার এ ঘটনার পরপরই ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে ১৯ জন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা রিমান্ডে স্বীকারোক্তি দিয়েছে। বুয়েট কর্তৃপ তাদের সাময়িক বরখাস্ত করে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এবং ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে। শিার্থীদের দাবি বাস্তবায়ন হচ্ছে এবং যেগুলো সময়সাপে তা বাস্তবায়নাধীন আছে। আইনমন্ত্রী সরকারের প থেকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেয়ার অঙ্গীকার করেছেন।
আবরার হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অপরাধী যারাই হোক তারা অপরাধীই। অপরাধী কে কোন দলের, সেটা আমি কখনো দেখি না। অপরাধীদের বিচার হবেই। একই সঙ্গে সারাদেশে প্রতিটি শিা প্রতিষ্ঠান ও হলে তল্লাশি চালানো হবে। কারা মাস্তানি করে বেড়ায় তা-ও দেখা হবে।’
আবরার হত্যাকা-ের ঘটনা দেশের মানুষকে ভয়ঙ্করভাবে নাড়া দিয়েছে। যে শিা প্রতিষ্ঠানে দেশের সেরা মেধাবী সন্তানরা লেখাপড়া করতে আসে সেখানে এ রকম অসুস্থ, ভয়ঙ্কর পরিবেশ দেশের মানুষ বুঝতেই পারেনি। পাশাপাশি দেশের তিনটি গৌরবের প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও বুয়েট দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে আসছিল তাদের কৃতী ছাত্রদের জন্য। লাখ লাখ ছাত্রের মধ্যে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে অত্যন্ত কঠিন পরীার মধ্য দিয়ে মেধা যাচাই করে ছাত্রদের ভর্তি হতে হয়। কোনো অসাধু উপায় অবলম্বন করার সুযোগ নেই।
বুয়েটের এ ঘটনা ঘিরে শিা প্রতিষ্ঠানগুলোর যে ভয়াবহ চিত্র অভিভাবকদের, দেশের সাধারণ মানুষের সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তাতে স্বাভাবিকভাবেই সবাই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত।
পত্রপত্রিকা, গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে শিা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিংয়ের ভয়াবহ চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। শুধু ছাত্ররাই নয়, র‌্যাগিংয়ের শিকার হন ছাত্রীরাও। র‌্যাগিংয়ের নামে নির্দয়, নিষ্ঠুর নির্যাতন এবং অশ্লীল, অসামাজিক কার্যকলাপ পর্যন্ত ঘটেছে।
গত বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিা প্রতিষ্ঠানে র‌্যাগিংয়ের ওপর জরিপ পরিচালনা করে গোয়েন্দা সংস্থা। দেখা যায়, শিা প্রতিষ্ঠানগুলোর শতকরা ৮৪ ভাগ শিার্থী র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়েও কোনো অভিযোগ জানায়নি। শতকরা ৫৬ ভাগ শিার্থী বলেছিল, র‌্যাগিং তাদের ভবিষ্যৎ জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পরও তা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। শতকরা ৯০ ভাগ শিার্থী বলেছে, র‌্যাগিং খুবই নির্দয়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক। তবে বড়দের ভয়ে র‌্যাগিংয়ের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চায়নি শতকরা ৭০ ভাগ শিার্থী। র‌্যাগিংয়ের নামে শিা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হলেও ফৌজদারি আইনে কোনো সুনির্দিষ্ট শাস্তির ব্যবস্থা অনুপস্থিত।
শিা প্রতিষ্ঠানে নতুন শিার্থীদের সঙ্গে পুরনো শিার্থীদের সখ্য গড়ে তোলার জন্য যে আনুষ্ঠানিক পরিচিতি প্রথা সেটাকেই র‌্যাগিং বলে অভিহিত করা হলেও তা দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিা প্রতিষ্ঠানে রসিকতার ছলে র‌্যাগিংয়ের নামে যে প্রথা চলছে, তা এককথায় নির্যাতন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ক্যাম্পাসে প্রথম পা রেখেই র‌্যাগিং নামে বর্বর নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নবীন শিার্থীরা। এ নির্যাতনে পিছিয়ে নেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত সরকারি কলেজগুলোও।
র‌্যাগিংয়ের নামে নবীন শিার্থীদের ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। যেভাবে র‌্যাগিং করানো হয় তার মধ্যে আছে, কান ধরে ওঠবস করানো, রড দিয়ে পেটানো, পানিতে চুবানো, উঁচু ভবন থেকে লাফ দেয়ানো, সিগারেটের আগুনে ছ্যাঁকা দেয়া, গাছে ওঠানো, ভবনের কার্নিশ দিয়ে হাঁটানো, মুরগি হয়ে বসিয়ে রাখা, ব্যাঙ দৌড়ে বাধ্য করা, সিগারেট-গাঁজা-মদপানে বাধ্য করা, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করানো, সবার সামনে নগ্ন করে নাচানো, যৌন অভিনয়ে বাধ্য করা, ছেলেমেয়ে হাত ধরা বা জোর করে আলিঙ্গন করতে বাধ্য করা, অপরিচিত মেয়ে অথবা ছেলেকে প্রকাশ্যে প্রেমের প্রস্তাব দিতে বাধ্য করা, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে যৌন হয়রানি করা, ম্যাচের কাঠি দিয়ে রুম অথবা মাঠের মাপ নেয়া, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের মাপ নেয়া, শীতের মধ্যে পানিতে নামিয়ে নির্যাতন করা, পুরনো শিার্থীদের থুতু মাটিতে ফেলে নতুনদের তা চাটতে বলা, বড় ভাইদের পা ধরে সালাম করা, গালাগাল করা, নজরদারি করা, নিয়মিত খবরদারি করার মতো নির্দয়, নিষ্ঠুর ও অমানবিক কর্মকা-। র‌্যাগিংয়ের নামে এমন বর্বর আচরণে অনেক শিার্থী আতঙ্কে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে অনেকে আত্মহত্যারও চেষ্টা করে। তা ছাড়া যে শিার্থী র‌্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছে, সে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে পরে এর চেয়ে বেশি মাত্রায় র‌্যাগিং করার পরিকল্পনা করে এবং নতুন ছাত্রছাত্রীরা আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ওপর চড়াও হয়। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘চাঁদরাত’ বলে একটা কথা আছে। সে রাতে নির্যাতনের বিভীষিকা নেমে আসে হলে হলে। আবাসিক শিার্থীদের এই বিশেষ র‌্যাগিংয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়ার মধ্যে নিহিত আছে অনেক মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা।
শিা প্রতিষ্ঠানগুলোতে র‌্যাগিংয়ের ভয়াবহতা দিন দিন যেভাবে বাড়ছে তাতে মনে হতে পারে সমাজে নতুন এক ব্যাধি ধীরে ধীরে জাতির মেধাবী সন্তানদের গ্রাস করে কঠিন আকার ধারণ করছে। প্রত্যেক মানুষের বয়সের আলাদা আলাদা গুরুত্ব আছে, যেমন শৈশব, কৈশোর, যৌবন, প্রাপ্তবয়স, বার্ধক্য-প্রত্যেক সময়েরই রয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। কিন্তু নানা বিবেচনায় ১৬ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত বলা হয় জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, যখন মানুষ স্বপ্ন দেখে, বিকশিত হয়, ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে, ঝুঁকি নিতে পারে, যুদ্ধে যেতে পারে, ফুল ফোটাতে পারে, ভালোবাসতে শেখে, দেশপ্রেম গাঢ় হয়। সাহস, সততা, প্রতিশ্রুতি আর ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত থাকে শরীর-মন। আমরা যারা হলে-হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করেছি সেই মধুময় স্মৃতি মনে হলে নস্টালজিয়ায় ভরে যায় মন। মনে হয়, আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম! আর এখন মনে হয় শিার্থীরা ভাবে, কবে এ বিভীষিকা থেকে বেরোতে পারব। পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা, ক্রীড়া, বিতর্ক, প্রাণবন্ত আড্ডা – সবই হয়ে গেছে সীমিত। মনে হয় ক্যাম্পাসে শুধু পালিয়ে থাকা, আড়ালে থাকা।
যারা নির্যাতিত হচ্ছে আর যারা নির্যাতন করছে সবাই আমাদের সন্তান, দেশের পরীতি মেধাবী সন্তান। তাদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকার কথা অথচ এখন এরা সবাই হয়ে যাচ্ছে মানসিক বিকারগ্রস্ত-ভবিষ্যতে তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, পেশাগত, সামাজিক জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। ধীরে ধীরে সমাজও হয়ে পড়বে অসুস্থ।
এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য আমাদের সবাইকে ভাবতে এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ দায়িত্ব শিকদের, সরকারের, অভিভাবকদের, রাজনীতিবিদসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের।
সবচেয়ে বড় দায় হচ্ছে শিকদের। তারাই প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রক, অভিভাবক এবং আদর্শের প্রতীক। কিছু কিছু শিকের দলাদলি, অনৈতিক আকাক্সক্ষা এবং অতিমাত্রায় রাজনীতিমুখিনতা পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। যেকোনো পরিস্থিতিতেই ছাত্রদের সামনে শিকদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতেই হবে। শিকরা কেবল শিা প্রতিষ্ঠানেরই শিক নন, তারা দেশ ও জাতিরও শিক। সে কারণে যুগে যুগে, দেশে দেশে শিকদেরই মর্যাদার সর্বোচ্চ আসন দেয়া হয়। সে মর্যাদা আমরা কতটা রা করতে পারছি Ñ সেটি এ সময়ের একটি বড় প্রশ্ন।
এ পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য শিা প্রতিষ্ঠানের শিাবান্ধব সুষ্ঠু পরিবেশের জন্য কিছু প্রস্তাবনা সবার গভীর বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করছি:
ক্স যেকোনো পরিস্থিতিতেই শিা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে সর্বময় মতার অধিকারী হতে হবে। তাদের হতে হবে নিরপে, নিয়মতান্ত্রিক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি-প্রবিধির অনুসারী। তাদের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিল এবং ফ্যাকাল্টির মাধ্যমে।
ক্স সরকার, রাজনৈতিক দল, অভিভাবক এবং সামাজিক সংগঠনকে শিা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে হবে।
ক্স সব শিা প্রতিষ্ঠান শিকদের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে, নইলে শিা কার্যক্রম ব্যাহত হবে। শিকদের ছাত্রদের প্রশ্নে নিরপেতা বজায় রাখতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু পরিবেশ রার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ এবং সহযোগী থাকতে হবে। ছাত্র-শিক সুসম্পর্ক ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশের অপরিহার্য উপাদান।
ক্স শিকদের প্রকাশ্যে রাজনীতি ও দলাদলি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনোক্রমেই ছাত্রদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া যাবে না। সব ছাত্রই যেন তাদের অভিভাবক মনে করতে পারে।
ক্স শিার্থীর পাঠ গ্রহণে এবং শিকদের পাঠদানে (সব শিা কার্যক্রমে) অনিয়মের েেত্র কোনো ধরনের আপস বা গাফলতি গ্রহণযোগ্য হবে না।
গোটা বিশ্ব অনেক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আমাদের মতো উন্নয়নশীল ছোট দেশের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করতে হবে, রা করতে হবে। সব েেত্রর জন্যই রাজনীতি একটি বড় কারণ। শিা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুষ্ঠু শিার পরিবেশ রা করে নতুন প্রজন্মকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। সে েেত্র রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি।
লেখক: সাবেক উপাচার্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়