কলাম

শেখ রাসেল কোনো গল্পের নাম নয়!

আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল
বাংলাদেশের মানুষকে বঙ্গবন্ধুর পর যে নামটি আবেগ ও ভালোবাসায় মোহাবিষ্ট করে রেখেছে, সে নামটি শেখ রাসেল। স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবার জাতির পিতাকে হত্যার পর শুধু বঙ্গবন্ধুর নামই নয়, নিষিদ্ধ ছিল ১০ বছরের শিশু রাসেলকে স্মরণও। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরম মমতা ও ভালোবাসায় জনমানসে স্থান করে নেয় শেখ রাসেল।
এদেশে হাজার হাজার শিশুর নাম রাসেল রাখা হয়েছে শুধু শেখ রাসেলের স্মরণে। কিংবদন্তীর মতো শেখ রাসেলের শোকগাঁথা যুক্ত হয় আমাদের স্থানীয় সংস্কৃতিতে, গল্পে ও সাহিত্যে। তবে শেখ রাসেলের মর্মান্তিক হত্যাকা- মানুষের মনে যে রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করে, তা ছিল এক অর্থে দুর্দমনীয়। তাই একনায়ক ও স্বৈরাচারেরা বাক-স্বাধীনতা হরণ করলেও জাতির বিবেক বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, কি অপরাধ ছিল শিশু রাসেলের! কখনো কষ্টের আর্তি নিয়ে, কখনো সভ্য জাতির লজ্জা হয়ে আবির্ভূত হয় রাসেল হত্যাকা-ের দায়। বাংলার দিগন্ত থেকে দিগন্তে জ্বলে ওঠা দ্রোহানলে জাতির পিতা হত্যাকা-ের বিচারের সমান্তরালে উঠে আসে শেখ রাসেল হত্যার বিচারের দাবি।
শেখ রাসেলের জীবনীতে জানা যায়, একদিন একটি কালো পিঁপড়ার কামড়ে রাসেলের আঙ্গুল ফুলে যায়। তারপর থেকেই কালো বড় পিঁপড়া দেখলে বলতেন ‘ভুট্টো’! আমরা যারা উন্নয়ন ও প্রগতির কথা বলি, শান্তি ও মানবতার কথা বলি, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের কথা বলি এবং অধিকার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা বলি; সেই আমাদের সামনে বড় এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে যায় শেখ রাসেল। ভুট্টোর মতো কালো পিঁপড়ার অস্তিত্ব তো আমাদের চারপাশজুড়ে!
মানুষ কতটা নিষ্ঠুর, বর্বর ও অমানুষ হলে ১০ বছরের শিশুকেও গুলিতে ঝাঁঝরা করে হত্যা করে, এ প্রশ্নটি এখনো আবেদন হারায়নি। কারণ যে কাপুরুষ দেশদ্রোহীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করেছিল, সেই খুনিরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল, খুনিদের ৬ জন বিদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেছে এবং খুনিদের দোসররা এখনো এই বাংলায় রাজনীতি করছে। রাসেলের হত্যাকারীদের পৃষ্ঠপোষকদের কি সুশাসন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ইত্যাদি শব্দগুলো উচ্চারণ করার অধিকার আছে?
আমাদের বিবেকের কাছে শেখ রাসেল নামটি আজো বহমান। শিশু রাসেল যাদের হৃদয়ে সহানুভূতি সৃষ্টি করেনি, রাসেল হত্যার বিচার নিয়ে যারা একটি কথা বলেনি, উপরন্তু যারা খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করেছে, তাদের মাঝে মানবতা আছে বললে কি কপটতা হবে না? তাদের মুখে ন্যায়বিচারের বাণী কি হাস্যকর নয়?
আমরা প্রায়ই দেশের সংকট নিরসনে রাজনৈতিক সমঝোতা ও ঐক্যের কথা বলি, দেশের প্রধান দুটি দলের মধ্যে সংলাপের কথা বলি, উদার হৃদয় নিয়ে আমরা যে শান্তির আহ্বান জানাই, তাতেও নিহিত রয়েছে নির্মমতা। কারণ এ জাতি হতবাক হয়ে ল্য করেছে, সংবিধানকে কলঙ্কিত করে জাতির পিতা হত্যাকা-ের বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। আমরা কখনোই ভেবে দেখিনি শেখ হাসিনা একজন মানুষ, তিনি অনুভূতিহীন কেউ নন। ১৫ আগস্টের হত্যাকা-, বিশেষত বঙ্গবন্ধু ও শেখ রাসেলের স্মৃতিচারণ করার সময় শেখ হাসিনা সব সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অসহ্য কষ্টে তিনি কখনোই সেই স্মৃতিচারণ সম্পূর্ণ করতে পারেন না। দীর্ঘ ২১ বছর শেখ হাসিনা তার পিতা, ভাই বা পরিবার হত্যার বিচার চাইতে পারেননি। এর চেয়ে অমানবিক দৃষ্টান্ত কি আর একটিও আছে? কে, কেন বা কার সঙ্গে ঐক্য ও সমঝোতা করবে বলতে পারেন?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে মতা গ্রহণের পর বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিচার শুরু করেও বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। জাতির পিতা হত্যাকা-ের বিচারকার্যে বিচারপতি মহোদয়ের বিবেকহীনের মতো বিব্রতবোধ করার ঘটনাও ঘটেছে। একটি কালো দিনে বানোয়াট জন্মদিন নির্ধারণ করে কেক কেটে উল্লাস করা কোন ধরনের রাজনৈতিক সৌজন্য ও সৌহার্দ্যরে পরিচয় দেয়? কোনো সভ্য দেশে কি এমন নির্লজ্জ ঘটনা ঘটতে পারে? শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ বাদ দিচ্ছি। একজন মানুষ হিসেবে, এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, আমি বা আপনি কি শেখ রাসেল হত্যার বিচার চাই না? আর বিচার যদি চাই, তাহলে বিএনপির কি দায়মুক্তির সুযোগ আছে?
শেখ রাসেলের শত্রু কে? একটি নিষ্পাপ শিশুর শত্রু কে – এ প্রশ্নটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রোপটে খুবই যৌক্তিক ও গুরুত্বপূর্ণ। ৪০ বছর পূর্ণ হয়েছে বিএনপি নামের দলটির। একটি বারের জন্য তারা ১৫ আগস্টের নারকীয় তা-বের নিন্দা জানিয়েছে? কখনো শোকবার্তা দিয়েছে? শিশু রাসেলের স্মরণে সামান্যতম সহানুভূতি প্রকাশ করেছে? আমরা যারা রাজনৈতিক বৈরিতা নিরসনের কথা বলি, তাদের কাছে কি এ প্রশ্নগুলোর জবাব আছে? নাকি এ বিষয়টি উপো করার সুযোগ আছে!
বিএনপি যদি ১৫ আগস্ট সংশ্লিষ্ট ঘটনায় জিয়ার অপকর্মের দায় গ্রহণ না করতে চায় অথবা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব যদি জাতির পিতা ও রাসেল হত্যার কলঙ্ক বহন করতে না চায়, তাহলে কি তাদের মা চাওয়া উচিত নয়?
শেখ রাসেলের জন্মদিন উপলে একজন নাগরিক হিসেবে আশা করবো, বিএনপি এ ইস্যুতে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করবে! এটি আবদার বা অনুরোধ নয়, বরং দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক