ফিচার

সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়ে কিছু প্রাথমিক সাধারণ কথা

অ্যাডভোকেট মোমিন শেখ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ওমরিয়াতান নীতি: সুরা নিসার ১১ আয়াতে উল্লেখ রয়েছে যে, একজন পুরুষের অংশ দুই মহিলার সমান। তাই মাতা কোনো অবস্থাতেই পিতা অপেক্ষা বেশি সম্পত্তি পেতে পারে না। এমতাবস্থায় জনৈক ব্যক্তি হযরত ওমর (রা.)-এর নিকট এরূপ সমস্যার কথা জানালে হযরত ওমর (রা.) চিন্তভাবনা করে কোরআন শরীফের ব্যবহৃত শব্দের সাথে সামঞ্জস্য রক্ষা করে, এরূপ সমস্যার যে সমাধান প্রদান করেন তাকেই ওমরিয়াতান নীতি বলে।
হিমারিয়াতান নীতি: গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে এ নীতিটির আগমন ঘটে। যেখানে মৃত ব্যক্তির স্বামী, মাতা, ২ বৈপিত্রেয় ভাই ও ২ আপন ভাই জীবিত থাকে। কোরআনিক অংশীদার হিসেবে ২ বৈপিত্রেয় ভাই সম্পত্তির অংশ পেল, কিন্তু একই পিতার ঔরসজাত এবং একই মাতার গর্ভজাত আপন দুই ভাই সম্পত্তির অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হলো। যেমন স্বামী = ১/২ অংশ, অংশীদার হিসেবে (সন্তান না থাকায়) মাতা = ১/৬ অংশ অংশীদার হিসেবে ২ বৈপিত্রেয় ভাই = ১/৩ অংশ অংশীদার হিসেবে ২ আপন ভাই = বঞ্চিত, কারণ অবশিষ্ট কোনো সম্পত্তি নাই। মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয় হলো আপন ২ ভাই। সে হিসেবে বিষয়টি উত্তরাধিকারের সাধারণ নিয়মের বিপরীত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর নিকট আপন ভাই তাঁদের সম্পত্তি বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা একাধিকবার বর্ণনা করলেও কোনো সমাধান পায়নি। শেষবার যখন খলিফার নিকট গিয়ে তাদের অধিকারের কথা বললেন তখন হযরত ওমর (রা.) স্বামী এবং মাতার অংশ ঠিক রেখে অবশিষ্ট সম্পত্তি বৈপিত্রেয় ভাই এবং আপন ভাইদের মধ্যে সমহারে বণ্টন করার নির্দেশ প্রদান করেন। তখন থেকে উত্তরাধিকার আইনে এ নিয়মটি আল হিমারিয়াতান নীতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
আলোচ্য সমস্যাটির সমাধান নিচে দেয়া হলো। স্বামী = ১/২ অংশ, অংশীদার হিসেবে (সন্তান না থাকায়) মাতা = ১/৬ অংশ, অংশীদার হিসেবে স্বামী এবং মাতার মোট অংশ = ১/২+১/৬ = ৪/৬ অংশ। অবশিষ্ট থাকে = ১- ৪/৬ = ২/৬ অংশ। এখন অবশিষ্ট ২/৬ অংশ ২ বৈপিত্রেয় ভাই এবং ২ আপন ভাইয়ের মধ্যে সমহারে বণ্টন করতে হবে। সুতরাং ২/৬ কে ২ দ্বারা ভাগ করতে হবে। তাহলে ২ বৈপিত্রেয় ভাই = ২/১২ অংশ, প্রত্যেকের অংশ = ২/২৪ এবং ২ আপন ভাই =২/১২ অংশ, প্রত্যেকের অংশ = ২/২৪। এখন বণ্টিত মোট অংশের পরিমাণ = ১। কখনও কখনও নিকটবর্তী আত্মীয় সম্পত্তির অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। সাধারণ নিয়মে অংশীদার হিসেবে স্ত্রী, ২ কন্যা উপস্থিত থাকলে পুত্রের কন্যা অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু স্ত্রী, ২ কন্যা থাকা সত্ত্বেও পুত্রের কন্যা অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় না যদি পুত্রের কন্যার সাথে পুত্রের পুত্র উপস্থিত থাকে। আবার যদি স্ত্রী, ২ আপন বোনের সাথে ১ জন বৈমাত্রেয় বোন থাকে তখন আপন ২ বোন দ্বারা বৈমাত্রেয় বোন সম্পত্তির অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় কিন্তু আপন ২ বোনের যদি ১ জন বৈমাত্রেয় বোন এবং ১ জন বৈমাত্রেয় ভাই থাকে তখন বৈমাত্রেয় বোন সম্পত্তির অংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় না।

ফারায়েজ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দের ব্যাখ্যা
ফারায়েজ আরবি শব্দ। অনেকেই ফারায়েজকে ‘ফারাজ’ও বলে থাকেন। ফারায়েজ শব্দটি শোনার সাথে সাথেই আমরা ধরে নিই এটি মুসলমানদের সম্পত্তি ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়।
আরবি মূল শব্দ ফারজুন থেকে ফারিজাতুন। ফারিজাতুন এক বচন আর বহুবচন হলো ফারায়েজ। আভিধানিক অর্থ হলো নির্ধারণ করা বা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত অংশ বণ্টন করা।
ইসলামি শরিয়তের বিধানমতে, কোনো মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তাঁর উত্তরাধিকারদের মধ্যে নির্ধারিত অংশ সঠিকভাবে বিলিবণ্টন করার পদ্ধতিকে আরবি ভাষায় ফারায়েজ বলে।
১. মৃত ব্যক্তি: মৃত ব্যক্তি বলতে বোঝায় যে ব্যক্তির সম্পত্তি তাঁর বৈধ ওয়ারিশগণ উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হয়েছেন বা লাভ করেছেন সেই ব্যক্তিকে মৃত ব্যক্তি বা প্রপোজিটাস বলে। অর্থাৎ যার সম্পত্তি উত্তরাধিকারের অধিকারে চলে গেছে।
২. ঊর্ধ্বগামী ওয়ারিশ: মৃত ব্যক্তির উপরের দিকের অর্থাৎ ঊর্ধ্বগামী ব্যক্তিরা মৃত ব্যক্তির ঊর্ধ্বগামী ওয়ারিশ যারা পিতার দিকেও হতে পারে আবার মাতার দিকেও হতে পারে। যেমন পিতা বা পিতার পিতা বা পিতার পিতার পিতা এঁরা পিতার দিকের বা পিতৃকুলের ঊর্ধ্বগামী ওয়ারিশ এবং মাতা বা মাতার মাতা বা তাঁর মাতা এঁরা মাতার দিকের ঊর্ধ্বগামী ওয়ারিশ।
৩. নিম্নগামী ওয়ারিশ: মৃত ব্যক্তির নিচের দিকে ধারাবাহিক সকল ওয়ারিশকে নিম্নগামী ওয়ারিশ বলে। এক্ষেত্রে পুরুষ বা মহিলা উভয়েই হতে পারে যেমন পুত্র, কন্যা, পুত্রের পুত্র বা কন্যা, কন্যার পুত্র বা কন্যা ইত্যাদি নিম্নগামী ওয়ারিশ।
৪. এগনেট: সেই সকল ব্যক্তিকে এগনেট বলা হয় যারা মৃত ব্যক্তির সাথে শুধু পুরুষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সম্পর্কিত হয় যেমন পুত্র, পুত্রের পুত্র, পুত্রের কন্যা, পিতা, পিতার পিতা, পিতার মাতা এরা সকলেই মৃত ব্যক্তির এগেনেট।
৫.কগনেট: সেই সকল ব্যক্তিকে কগনেট বলে যারা মৃত ব্যক্তির সাথে এক বা একাধিক মহিলার মাধ্যমে সম্পর্কিত হয়। যেমন কন্যা, কন্যার পুত্র, মাতার মাতা, মাতার পিতা ইত্যাদি।
৬. সগোত্রীয় ব্যক্তি: যে সকল ব্যক্তি একই বংশের বা একই গোত্রের কিন্তু পরিবার ভিন্ন তাদেরকে সগোত্রীয় ব্যক্তি বলে। এরা মৃত ব্যক্তির ঊর্ধ্বগামীও নয় নিম্নগামীও নয় এবং এঁরা মৃত ব্যক্তির একই পূর্ব পুরুষের মাধ্যমে সম্পর্কিত। যেমন ভাই, বোন, চাচা, ভাতিজা, ফুফু, চাচাতো ভাই ও মামাতো ভাই ইত্যাদি।
৭. প্রকৃত পিতামহ: পিতার পিতাকে বা দাদাকে প্রকৃত পিতামহ বা সত্য পিতামহ বলে। সত্য পিতামহ এমন একজন পূর্ববর্তী পুরুষ ব্যক্তি যে তাঁর ও মৃত ব্যক্তির মাঝখানে কোনো মহিলা থাকে না। যেমন পিতার পিতা, পিতার পিতার পিতা এবং তাঁর যত ঊর্ধ্বেই হোক।
৮. প্রকৃত মাতামহি: পিতার দিকের অর্থাৎ পিতার মাতা বা দাদিকে প্রকৃত বা সত্য মাতামহী বলে। প্রকৃত বা সত্য মাতামহি এমন একজন পূর্ববর্তী মহিলা ব্যক্তি যে তাঁর এবং মৃত ব্যক্তির মাঝখানে কোনো অপ্রকৃত পিতামহ নেই। যেমন পিতার মাতা, পিতার মাতার মাতা, মাতার মাতা, মাতার মাতার মাতা ইত্যাদি।
৯. অপ্রকৃত পিতামহ: অপ্রকৃত পিতামহ বলতে এমন একজন পূর্ববর্তী পুরুষকে বোঝায়, মৃত ব্যক্তি এবং তাঁর মধ্যবর্তী অবস্থানে কোনো নারী বা মহিলা থাকে অর্থাৎ মাতার দিকের মাতার পিতা মানে মৃত ব্যক্তির নানাকেই অপ্রকৃত পিতামহ বলে। যেমন মাতার মাতার পিতা, মাতার পিতার পিতা ইত্যাদি।
১০. অপ্রকৃত মাতামহি: অপ্রকৃত মাতামহি হলো এমন একজন পূর্ববর্তী নারী বা মহিলাকে বোঝায় মৃত ব্যক্তি এবং তাঁর মধ্যবর্তী অবস্থানে কোনো অপ্রকৃত পিতামহ বা নানা থাকে না অর্থাৎ মাতার দিকের মাতা মানে নানীকেই অপ্রকৃত মাতামহি বলে। যেমন মাতার মাতা, মাতার পিতার মাতা, মাতার মাতার মাতা ইত্যাদি।
১১. বৈপিত্রেয় ভাই বোন: যে সকল সন্তান একই মায়ের গর্ভজাত বা একই মায়ের পেটের সন্তান কিন্তু একই পিতার ঔরসজাত সন্তান নয় অর্থাৎ পিতা ভিন্ন ভিন্ন তাঁদেরকে বৈপিত্রেয় ভাই-বোন বলে। এঁরা সর্বদাই অংশীদার। কোনো অবস্থাতেই অবশিষ্টভোগী হবে না।
১২. বৈমাত্রেয় ভাই-বোন: বৈমাত্রেয় ভাই-বোন বলতে বুঝায় পিতা একজন এবং মাতা ভিন্ন ভিন্ন এবং এঁদের সংখ্যা সর্বোচ্চ চারজনও হতে পারে অর্থাৎ একই পিতার ঔরসজাত এবং ভিন্ন ভিন্ন মাতার গর্ভজাত সন্তানেরা পরস্পর বৈমাত্রেয় ভাই-বোন। এঁদেরকে সৎ ভাই-বোনও বলে।
১৩. আউল নীতি: মুসলিম উত্তরাধিকার বা ফারায়েজ আইনের বিধান অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি অংশীদারদের মধ্যে নির্দিষ্ট অংশ বণ্টন করার পর বণ্টনকৃত অংশের যোগফল যদি মোট সম্পত্তি থেকে বেশি হয় তখন এই বেশি অংশটুকু আবার বণ্টিত অংশীদারদের মধ্যে আনুপাতিক হারে কমিয়ে বা হ্রাস করে বণ্টন করার নিয়মকেই আউলনীতি বলা হয়। অর্থাৎ কোরআনিক অংশীদারদের বণ্টিত অংশসমূহের সমষ্টি বা যোগফল যখন এক থেকে বেশি হয় বা অধিক হয় তখন যে নীতির সাহায্যে এ সমস্যার সমাধান দেয়া হয় তাকেই আউল নীতি বলে। ১৪. রাদ্দ নীতি: মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকার বা ফারায়েজের নিয়ম মোতাবেক অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করার পর যদি কিছু সম্পত্তি বেঁচে যায় বা উদ্বৃত্ত থাকে, সেই উদ্বৃত্ত সম্পত্তি অংশীদারদের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করতে হয়। উদ্বৃত্ত সম্পত্তি এভাবে অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন করার নিয়মকেই রাদ্দ নীতি বলে।
১৫. জাবিল ফুরুজ বা অংশীদার: মুসলিম আইনে যে সকল ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে নির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার অধিকারী হয় অথবা যে সকল ব্যক্তি আসাবা বা জাবিল আরহাম নয় তাঁদেরকে জাবিল ফুরুজ বা অংশীদার (ঝযধৎবৎং) বলে।
১৬. আসাবা বা অবশিষ্টভোগী: মুসলিম আইনে মৃত ব্যক্তির সাথে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় কিন্তু অংশীদার নয় এবং যারা অংশীদারদের নির্দিষ্ট অংশ নেয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে তা পাওয়ার অধিকারী হয় এবং যাদের অংশ নির্ধারিত থাকে না তাদেরকে আসাবা বা অবশিষ্টভোগী বা জবংরফঁধৎরবং বলে।
১৭. জাবিল আরহাম বা দূরবর্তী আত্মীয় বা উরংঃধহঃ করহফৎবফ আরবি রিহোম থেকে আরহাম শব্দটি এসেছে। আরবি ভাষায় ব্যাকরণগত দিক থেকে রিহোম হচ্ছে একবচন আর বহুবচন হলো আরহাম। আভিধানিক অর্থ হলো মহিলাদের জরায়ু বা গর্ভাশয়। জরায়ু বা গর্ভাশয়কে আরবিতে বলে রিহোম। জাবিল আরহাম হলো মৃত ব্যক্তির নিকটতম আত্মীয়স্বজন।
জাবিল আরহাম সম্পর্কে বিভিন্ন ইসলামি চিন্তাবিদ বিভিন্ন অভিমত ব্যক্ত করেছেন। যেমন ফারায়েজবিশেষজ্ঞ সিরাজীর অভিমত হলো মৃত ব্যক্তির সাথে যাদের রক্তের সম্পর্ক আছে কিন্তু জাবিল ফুরুজ বা অংশীদার এবং আসাবা বা অবশিষ্টভোগীও নয় তাঁরা হচ্ছে দূরবর্তী আত্মীয়। এঁদেরকে জাবিল আরহাম বা দূরবর্তী আত্মীয় বা উরংঃধহঃ করহফৎবফ বলে।
হযরত যায়েদ ইবনে সাবেত (রা.) বলেন যে জাবিল আরহামগণ উত্তরাধিকার হবে না এবং সমস্ত সম্পদ ইসলামি রাষ্ট্রের তহবিলে বা কোষাগারে জমা হবে। এ মত সমর্থন করেন ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, যুহুরী এবং আওযায়ী (র.)। এঁদের যুক্তি হলো অকাট্য প্রমাণ ব্যতীত কেউ ওয়ারিশ হতে পারে না। তবে হানাফি মাযহাবের ইমামগণের মত হলো, জাবিল আরহামগণ সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবেন।
জাবিল আরহাম বা দূরবর্তী আত্মীয়দেরকে প্রধান ৪টি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এ ৪ শ্রেণির দূরবর্তী আত্মীয়দের অংশের বণ্টন বেশ ব্যাপক। সংক্ষেপে মৃত ব্যক্তির সাথে ৪ শ্রেণির আত্মীয়দের সম্পর্কে পরবর্তী সংখ্যায় আলোচনা করা হবে। (চলবে)
লেখক: আইনজীবী
সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ