রাজনীতি

অনিশ্চিত গন্তব্যে হাঁটছে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থেকে একের পর এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে নানামুখী সংকটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে হাঁটছে। দলের নয়া পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নিয়মিত বৈকালিক প্রেস ব্রিফিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে বিএনপির রাজনীতি। অথচ দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রায় ২ বছর ধরে কারাগারে থাকলেও তার মুক্তির বিষয়ে কোনো আন্দোলনই জমাতে পারেনি দলটি। জামিনের বিষয়েও কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। উল্টো দলটির মহানগর কমিটির নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে দ্বৈত নীতি গ্রহণ করেছেন। তারা নিজেরা যেন জেলে যেতে না হয়, সে চেষ্টায়ই আছেন সর্বক্ষণ। সরকারি দলের নেতাদের পোঁ ধরে তারা রিলাক্সড মুডেই দিন পার করছেন।
মহানগর কমিটিসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা এখনো ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি মেনে নিতে পারেননি। ২০১৬ সালের জাতীয় কাউন্সিলের পর দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিএনপির হাইকমান্ড ‘এক নেতা এক পদ’ সিদ্ধান্ত দিলেও প্রভাবশালী নেতাদের কাছে তা পাত্তা পাচ্ছে না। কারাবন্দি হওয়ার আগে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এ বিষয়ে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও চেষ্টা চালাচ্ছেন। তিনিও দলের পুনর্গঠনে সফল হতে পারছেন না বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তারেক রহমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেয়ার পর কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা ও মহানগরসহ তৃণমূল কমিটি করার সিদ্ধান্ত দেন। শুধু বিএনপিই নয়, দলের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনকে ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে কৃষক দল, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দলের ৩ মাসের জন্য আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এর মধ্যে কাজ শেষ না হলেও অনেক কমিটির মেয়াদও ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। এ কারণে বেহাল শ্রমিক দল, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাংগঠনিক কাজে হাত দিতে পারছেন না দলের হাইকমান্ড। এ প্রসঙ্গে বিএনপির একটি পক্ষ বলছে, মহাসচিবসহ অনেকে সিদ্ধান্ত মেনে এক পদ রেখে অন্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তাই যারা দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মানছে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত।
বিএনপির গঠনতন্ত্রের ১৫ (খ) ধারায় বিশেষ বিধানে বলা আছে, দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি কিংবা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের কোনো সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটির কোনো কর্মকর্তা এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কোনো সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক দলের অন্য কোনো পর্যায়ের কমিটিতে কর্মকর্তা নির্বাচিত হতে পারবেন না।
এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চলছে। কোথাও কোনো অভিযোগ থাকলে তা দেখতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতৃত্বে একাধিক টিম কাজ করছে। আমরা কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদল, ড্যাবের কমিটি করেছি। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার কাজ চলছে। এছাড়া অন্যান্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে করার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
যুবদলের এক নেতা জানান, তারেক রহমান যুবদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ছাত্রদলের ৪০ শতাংশ সাবেক নেতাকে পদায়ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু যুবদলের একটি অংশ এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফলে যুবদলের কমিটি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
জানা যায়, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী একই সঙ্গে পটুয়াখালী জেলার সভাপতি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মশিউর রহমান ঝিনাইদহ জেলার আহ্বায়ক, যুগ্ম-মহাসচিব মুজিবুর রহমান সরোয়ার বরিশাল মহানগর সভাপতি, যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন নরসিংদী জেলার সভাপতি, যুগ্ম-মহাসচিব হাবিব-উন নবী খান সোহেল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি, যুগ্ম আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী চট্টগ্রাম উত্তরের সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু খুলনা মহানগরের সভাপতি, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন গাজীপুরের সভাপতি। এসব নেতাকে এক পদ রেখে অন্য পদ ছেড়ে দিতে খালেদা জিয়া বেশ কয়েকবার নির্দেশও দিয়েছেন। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একই ধরনের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কোনো নির্দেশই কাজে আসছে না।
এসব নেতার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হলো, তাদের ইচ্ছার বাইরে কেউ ওই এলাকায় স্বাধীনভাবে দলীয় কোনো কর্মকা- পরিচালনা করতে পারেন না। সম্প্রতি তারেক রহমানকে একটি চিঠি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মনির হোসেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘গত ১৯৮৬ সালে ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কেন্দ্রীয় কমিটি মিলিয়ে ২০০২ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। এরপর আর কোনো কমিটিতে স্থান হয়নি। কোনো পদ-পদবি ছাড়া জুনিয়রদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা কষ্টকর। আমাকে যেকোনো পদ্ধতিতে আটকাতে ফজলুল হক মিলন ভাই একাই বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, গাজীপুর জেলা সভাপতি, কালীগঞ্জ থানা বিএনপির সভাপতি পদে আছেন। কালীগঞ্জ পৌর বিএনপির কমিটি না থাকলেও পদাধিকারবলে তিনিই সভাপতি। কেন্দ্রীয় অথবা স্থানীয় কোথাও কাজ করার সুযোগ পাচ্ছি না। গাজীপুরের বিএনপি মিলনকেন্দ্রিক জিম্মি। আপনি ছাড়া আমার কোনো আশা নেই। কোনো দায়িত্ব দিলে ঈমানি দায়িত্ব মনে করব Ñ কথা দিলাম।’
বিএনপির একটি পক্ষ বলছে, তারেক রহমান সবার মতামত নিয়ে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত দিলেও তা মানা হচ্ছে না। এর মধ্যে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে এসব অভিযোগ জানানো হয়েছে। অঙ্গসংগঠনের মধ্যে জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দলের নতুন আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ পার করেছে। তিন মাসের মধ্যে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি করতে ২০ বছর পর চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি কৃষক দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মৎস্যজীবী দল ও ৬ এপ্রিল তাঁতি দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির নেতাদের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান খতিয়ে দেখতে একাধিক টিম গঠন করেছেন।
এসব সত্ত্বেও বিএনপির একেক জন নেতা চার-পাঁচটি পদ আঁকড়ে আছেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে থেকে জেলা কমিটির পদ ধরে রেখে তৃণমূল নেতাদের কোনো সুযোগই দেয়া হচ্ছে না। সব মিলিয়ে বলা যায়, একেবারে ছন্নছাড়া অবস্থায় পতিত হয়েছে বিএনপির তৃণমূল। একইসঙ্গে বিএনপির গন্তব্যও এক অনিশ্চিত অবস্থানের দিকে।