ফিচার

ইলিশের শহর চাঁদপুরে একদিন

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
সরাসরি পদ্মা-মেঘনা নদী থেকে টাটকা ইলিশ কিনে আনা কিংবা ইলিশের স্বাদে বুঁদ হওয়ার জন্য ঢাকা থেকে ডে লং ট্যুর হিসাবে পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল চাঁদপুর ভ্রমণ বেশ জনপ্রিয়। ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে চেপে চাঁদপুর যেতে সাড়ে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই খুব সকালে রওনা হয়ে রূপালি ইলিশের শহর দেখে রাতে ঢাকা ফিরে আসতে পারবেন। সবচেয়ে ভালো হয়, রাত ১২টার দিকে লঞ্চে যাত্রা করে সারা দিন ঘুরে আবার রাত ১২টার লঞ্চে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় ফিরে আসা। এক্ষেত্রে দুই রাত লঞ্চে থাকার কারণে আপনাকে হোটেলে রাত্রিযাপন করতে হবে না। রাতের ঘুম আপনি লঞ্চের কেবিনেই সম্পন্ন করতে পারবেন। কেবিন ভাড়া হোটেল ভাড়ার মতোই, ৪০০ থেকে ৭৫০ টাকা। যদি আপনার ভ্রমণ হয় কোনো জ্যোৎস্না রাতে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। বড় বড় নদীর রাতের সৌন্দর্য আপনার ভ্রমণে যোগ করবে বাড়তি আনন্দ।

চাঁদপুরে যা দেখবেন
চাঁদপুরে লঞ্চ ভিড়লেই শুনতে পাবেন নৌকামাঝিদের হাঁকডাক Ñ বড়স্টেশন, পুরানবাজার!
১০ টাকা নৌকা ভাড়া দিয়ে ৫ মিনিটেই চলে আসতে পারবেন বড় স্টেশন। এখানে এসে আপনি একসঙ্গে অনেকগুলো বিষয় দেখতে পাবেন Ñ ৩ নদীর মোহনা, স্টিমার ঘাট, রেল স্টেশন, ইলিশ মাছের আড়ৎ এবং পদ্মা-মেঘনা থেকে ইলিশ মাছ ধরে আনা শত শত নৌকার কোলাহল।
বড় স্টেশনে আছে বেশ কয়েকটি ছাপড়া হোটেল। হোটেলের সামনে তাওয়ায় থরে থরে সাজানো ইলিশ ভাজা। গরম ভাত আর ইলিশ ভাজা খেয়ে বড় স্টেশন এলাকা ত্যাগ করে চাঁদপুর শহর ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দেখতে বেরিয়ে পড়–ন।
ডাকাতিয়া নদী দ্বারা বিভক্ত চাঁদপুর একটি ছোট্ট শহর। নদীর এক পারের নাম পুরানবাজার, আরেক পারে নতুনবাজার। দুই বাজারের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য আগে ছিল ডিঙি নৌকা, এখন আছে সেতু। নৌকা পারাপারের জন্য ডাকাতিয়া নদীতে ছিল ১ ডজনের বেশি ঘাট। এখন অবশ্য সেসব ঘাটের দু’একটি চাঁদপুরে ডিঙি নৌকার অস্তিত্ব বজায় রেখেছে।
চাঁদপুরে আরো দেখতে পারেন ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে খ্যাত হাইমচর, চাঁদপুরের ঐতিহ্যের প্রতীক ইলিশ চত্বর, অঙ্গীকার ভাষ্কর্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, মুক্তিযুদ্ধের স্মারক, রূপসা জমিদার বাড়ি ইত্যাদি।
চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন স্থাপনা দেখে ঢাকায় ফিরে আসার আগে ইলিশ কিনতে আপনাকে আবার ঢুঁ মারতে হবে বড় স্টেশনের ইলিশ মোকামে। পাইকারি দরে মোকাম থেকে কিনতে পারবেন ইলিশ। পাইকারি দরে কিনতে হলে আপনাকে কমপক্ষে ১০ কেজি কিনতে হবে। পছন্দমতো ইলিশ কিনে সাথে নিয়ে আসার সুব্যবস্থা আছে। মোকামে বরফ দিয়ে এমনভাবে প্যাকিং করে দেবে, যা আপনাকে ঢাকায় ফেরার পথে কোনো বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে না।
এখানে সামুদ্রিক ইলিশও পাওয়া যায়। তবে আপনি যদি চাঁদপুরের ইলিশ চান তবে ঘাড় মোটা চকচকে রূপালি রঙ দেখে কিনবেন। সমুদ্রের ইলিশে রূপালি রঙের সাথে এক ধরনের লালচে আভা থাকে।
বড় স্টেশনের ইলিশভাজা খেতে না চাইলে ট্রলার অথবা নৌকায় চেপে রাজরাজেশ্বর চরে চলে যেতে পারেন। বড় স্টেশন হতে এই চরে আসতে ৩০ মিনিট সময় লাগে। এই চর থেকে আরো ভালোভাবে দেখতে পারবেন পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থল। চরের ঘাট থেকে অল্প দূরে অবস্থিত মনু মিয়ার হোটেলের ইলিশ ভাজা, ইলিশ মাছের ডিম কিংবা ইলিশের তরকারির সুনাম পুরো চাঁদপুরজুড়েই।

চাঁদপুর যাবেন যেভাবে
ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাওয়া যায় বাসে, ট্রেনে ও লঞ্চে। বাসে ৬ এবং ট্রেনে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। তাই সবাই লঞ্চেই চাঁদপুর ভ্রমণ করে। ঢাকা-চাঁদপুর রুটে চলাচলকারী লঞ্চের মধ্যে এমভি সোনার তরী, এমভি তাকওয়া, এমভি বোগদাদীয়া, এমভি মেঘনা রাণী, এমভি আল বোরাক, এমভি ঈগল, এমভি রফরফ, এমভি তুতুল প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। প্রতিদিন সদরঘাট থেকে ৪৫ মিনিট পরপর চাঁদপুরগামী লঞ্চ ছেড়ে যায়। ভাড়া ডেক ১০০ টাকা, চেয়ার ১৫০ টাকা, নন এসি কেবিন ৫০০ টাকা, এসি কেবিন ৭৫০ টাকা।

কোথায় থাকবেন
ইলিশ খাওয়া কিংবা এক দিনের ভ্রমণে ঢাকা হতে চাঁদপুর গিয়ে রাতের মধ্যে ফিরে আসা যায়। আর এই ডে লং ট্যুরই চাঁদপুর ভ্রমণে সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবুও পর্যটকদের রাত্রি যাপনের কথা বিবেচনা করে এখানে হোটেল তাজমহল, হোটেল শ্যামলী, হোটেল জোনাকী ছাড়াও বেশকিছু আবাসিক হোটেল গড়ে উঠেছে।
চাঁদপুর থেকে ফেরার সময় ইলিশের পাশাপাশি ‘ওয়ান মিনিট’-এর মিষ্টি কিনে আনতে ভুলবেন না।