প্রতিবেদন

ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে বেশকিছু সাংবাদিকও আতঙ্কিত!

নিজস্ব প্রতিবেদক
চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে। ৩০ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি দিয়ে জব্দকৃত ব্যক্তিদের লেনদেনের তথ্য চেয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু সাংবাদিকও রয়েছেন।
জানা গেছে, ব্যাংক হিসাব জব্দ করা ছাড়াও গোয়েন্দা নজরদারিতে রয়েছেন বেশকিছু সাংবাদিক। এদের মধ্যে সম্পাদকসহ অনেক সাংবাদিক নেতা রয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতও আছেন এক শ্রেণির সাংবাদিক। নজরদারিতে থাকা এসব সাংবাদিক কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তারকৃতরা জিজ্ঞাসাবাদে অনেক সাংবাদিকের নাম প্রকাশ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে বা শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফোন করে বিজ্ঞাপনের নামে মোটা অঙ্কের চাঁদাও চেয়েছেন এসব ‘সাংবাদিক’ Ñ এ ধরনের কথোপকথনের রেকর্ডও গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে।
জানা গেছে, ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে জড়িত সাংবাদিকরা নিয়মিত বিভিন্ন ক্লাব থেকে টাকা নিয়ে আসতেন। অনেকে তাদের পক্ষে রিপোর্টও করেছে। আবার কারো কারো বিরুদ্ধে টাকা না পেয়ে রিপোর্ট করার তথ্য-প্রমাণ গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, ক্যাসিনো খেলছেন অনেক সাংবাদিক Ñ এমন ছবিও তাদের কাছে রয়েছে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর ‘শুদ্ধি’ অভিযান শুরুর পর দুদক প্রথমে ৪৩ জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরুর কথা জানালেও এই তালিকা দিনে দিনে বড় হচ্ছে। এ পর্যন্ত ২৩ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলেও আরো নিষেধাজ্ঞা আসছে বলে দুদক সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া অভিযুক্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে দুদক।
অভিযান শুরুর প্রথম দিনই রাজধানীর ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাব থেকে গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর বিভিন্ন অভিযানে একে একে গ্রেপ্তার হন জি কে শামীম, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ইসমাইল হোসেন সম্রাট, আরমান, শফিকুল আলম ফিরোজ, সেলিম প্রধান এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান ও তারেকুজ্জামান রাজীব। তাদের রিমান্ডে আনা হলে তারা প্রত্যেকেই ক্যাসিনো ব্যবসার ভাগ কোন কোন ব্যক্তির কাছে যেত তা অপকটে বলে দেন। গোয়েন্দারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন, অন্য অনেকের পাশাপাশি একশ্রেণির সাংবাদিকও এই অবৈধ ব্যবসার ভাগ পেতেন।
গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া সবচেয়ে বেশি সাংবাদিকের নাম বলেন, যাদের প্রতিদিন বেলা ৩টার সময় ক্যাসিনো খেলার টাকা দিয়ে দিতে হতো। খালেদ নাকি এমনও বলেছেন, অন্য সবার ভাগ রাতে দিলেও সমস্যা ছিল না, কিন্তু সাংবাদিকদের ভাগ দিয়ে দিতে হতো ৩টার সময়। কারণ তারা এই বলে হুমকি দিত যে, দিনের টাকা দিনে ৩টার মধ্যে না দিলে তারা নিজ নিজ কার্যালয়ে গিয়ে এ সংক্রান্ত রিপোর্ট জমা দিয়ে দেবে।
খালেদ আরো জানিয়েছেন, মূলত পত্রিকার ক্রাইম বিটের সাংবাদিকদেরই বেশি অর্থ দিতে হতো। কারণ ক্রাইম বিটের সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশের সখ্য থাকে বেশি। পুলিশকে ম্যানেজ করে যেহেতু ক্যাসিনো চালাতে হয়, সেহেতু পুলিশের ‘বস’ ক্রাইম রিপোর্টারদেরও নজরানা দিতে হতো। নইলে পরদিন থেকেই ক্যাসিনোর চাকা ঘোরানো কঠিন হয়ে পড়তো।
জানা গেছে, চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ৪ শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। এসব হিসাবে এখন লেনদেন হচ্ছে না। এগমন্ট গ্রুপের মাধ্যমে তাদের সম্পদ সম্পর্কে বিভিন্ন দেশ থেকে তথ্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেসব দেশে টাকা পাচার হয়েছে, সেসব দেশের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান চলছে। ক্যাসিনো থেকে টাকার ভাগ নিয়ে যেসব সাংবাদিক বিদেশে পাচার করেছেন, তারা এখন আতঙ্কের মধ্যে আছেন।
খালেদ যেসব সাংবাদিকের নাম বলেছেন, গোয়েন্দারা তাদের নাম প্রকাশ না করলেও দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, তালিকায় সংখ্যার দিক দিয়ে পুলিশের পরপরই সাংবাদিকদের অবস্থান।
সূত্রটি জানায়, ক্যাসিনো বিষয়ে সাংবাদিকরা ‘গাছেরটা খাওয়া ও তলারটা কুড়ানো’র ভূমিকায় নেমেছিল। অর্থাৎ তারা ক্যাসিনো যারা চালায় তাদের কাছ থেকে এক দফা টাকা নিত আবার ‘পুলিশের ছত্রচ্ছায়ায় ক্যাসিনো ব্যবসা চলছে’-এই হুমকি দিয়ে পুলিশের কাছ থেকে আরেক দফা টাকা নিত। ফলে ক্যাসিনো থেকে পুলিশের চেয়েও এসব সাংবাদিকের আয় ছিল বেশি।
সূত্রটি ইঙ্গিত দিয়ে জানায়, ক্যাসিনোর পয়সা খাওয়া ওই দুর্নীতিবাজ সাংবাদিক শ্রেণিটি ক্যাসিনোকা-ের আগে টকশোতে বেশ সক্রিয় ছিল। তাদের এখন টকশোতে কমই দেখা যায় এবং যাদের দেখা যায়, তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজই বলে দেয়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা আতঙ্কিত।
গ্রেপ্তার হওয়া কথিত যুবলীগ নেতা ও ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম সাংবাদিকদের সম্পর্কে গোয়েন্দাদের কাছে জানিয়েছে অভিনব তথ্য। শামীম নাকি গোয়েন্দাদের জানিয়েছে, কোনো সাংবাদিকই তার কাছ থেকে নগদ টাকা নিত না, নিত বিজ্ঞাপন। শামীম কোনো সিমেন্ট কোম্পানি বা ইস্পাত কোম্পানিকে বলে দিলেই ওই পত্রিকা বা টেলিভিশন পেয়ে যেত লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন। পণ্য বিক্রির জন্য শামীমের কোম্পানিকে হাতে রাখার জন্যই বিভিন্ন সিমেন্ট-রড কোম্পানি শামীমের কথাকে গুরুত্ব দিয়ে লাখ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন তুলে দিত কোনো কোনো সম্পাদক ও সাংবাদিক নেতার হাতে।
কথিত আছে, শুধু বিজ্ঞাপন ব্যবসা করেই একজন সম্পাদক (টকশোতে সব সময় সরব, এখন নিরব) কয়েক শ’ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। গণপূর্ত ভবনে শামীমের অফিসে তার ছিল রোজকার হাজিরা। শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর আতঙ্কে তার শরীর অর্ধেক হয়ে গেছে। যারা একাধিক সংবাদপত্র পড়ে অভ্যস্ত তারা বুঝবেন, ওই সম্পাদকের কাগজে খালিদ, সম্রাট, আরমানদের অপকর্মের খবর যে ট্রিটমেন্ট পেয়েছে, শামীমের অপকর্ম পায়নি তার শতভাগের একভাগও। কারণ ওই সম্পাদক শামীমের অপকর্ম আড়াল করতে চেয়েছিলেন, পাছে যদি তার অপকর্মটিও প্রকাশ পেয়ে যায়!
কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, গোয়েন্দাদের কাছে শামীম সেই উচ্চকণ্ঠ সম্পাদকটির নামটিও ফাঁস করে দিয়েছে।