রাজনীতি

খালেদা জিয়ার চিকিৎসাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিতর্কের শেষ কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক
কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শরীরিক অবস্থা সম্পর্কে দলটির শীর্ষ নেতা ও পরিবারের সদস্যরা বলছেন এক ধরনের কথা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন ভিন্ন কথা।
বিএনপির নেতারা এবং খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক। এর বিপরীতে বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসনকে নিয়ে তার দল ও স্বজনরা যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আমরা সেরকম আশঙ্কা দেখছি না। বরং হাসপাতালে ভর্তির পর থেকে গত ৭ মাসে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ‘স্থিতিশীল’ রয়েছে এবং ‘কোনো কোনো ক্ষেত্রে উন্নতি’ হয়েছে।
এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিএনপি নেতারা ও খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যরা, অপর পক্ষটি হচ্ছে বিএসএমএমইউ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই বিতর্ক কখনোই শেষ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না খালেদা জিয়া বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন, অথবা প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছেন।
খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলান মিঞা সরকার বলেন, ‘আমি গত পরশু দিনও (২৬ অক্টোবর) বোর্ডের সদস্যদের নিয়ে পৌনে এক ঘণ্টা ম্যাডামকে দেখেছি। ম্যাডাম খুশি, খুব ইম্প্রেসিভ, উনি সব সময় হাসিখুশিতে কথা বলেন। আমরা অবশ্যই সন্তুষ্ট। ম্যাডাম নিজেও সন্তুষ্ট। ২৮ বছর ধরে তাঁর বাতজ্বর। এটা ইনকিউরেবল। চিকিৎসায় রোগ নিয়ন্ত্রণে থাকবে, স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবেন। দ্বিতীয় একটা বোর্ড করেছি বাত বিশেষজ্ঞদের নিয়ে। উনার প্রেসার, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, ইনসুলিন নিচ্ছেন। এখন উনাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেও চিকিৎসা সম্ভব, যেখান থেকে এসেছেন সেখানেও সম্ভব।’
বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে স্বজনদের বক্তব্য সম্পর্কে অধ্যাপক জিলান বলেন, ‘আমরা বিদেশে প্রেফার করি না। আপনারা বলছেন কিংবা ম্যাডামের স্বজনরাও বলছেন, বলতে পারেন। মনে হয় না আমরা চিকিৎসা করতে ব্যর্থ হচ্ছি। ম্যাডামও দাবি করেন নাইÑ আমাকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন।’
খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলান মিঞা সরকারের বক্তব্যের বিপরীতে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন, বিএসএমএমইউ পরিচালক সরকারের শেখানো কথা বলছেন। তার বক্তব্যে এটি সুস্পষ্ট, ৭৫ বছর বয়সী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে কারাবন্দি রেখে বিনা চিকিৎসায় তিলে তিলে নিঃশেষ করার মহা আয়োজন চলছে। প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবই পরিচালকের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যান বিএনপি চেয়ারপারসন। এরপর গত ১ এপ্রিল তাঁকে বিএসএমএমইউতে আনা হয়। তাঁকে হাসপাতালের ৬২১ নম্বর কেবিনে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় গত ২৫ অক্টোবর খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার বড় বোন সেলিমা রহমান দাবি করেন, ‘খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। এখন উঠে বসতে পর্যন্ত পারছেন না। কারও সাহায্য ছাড়া বসতে পারেন না। তার হাত বেঁকে গেছে, কথা বলতেও তার কষ্ট হচ্ছে। ওজন কমে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে তার পঙ্গু হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে।’
এরপর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার অবস্থা সংকটাপন্ন। তিনি সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসবেন কি না, তা নিয়েই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।’
খালেদা জিয়ার দল ও পরিবারের এমন বক্তব্যের পর বিএসএমএমইউর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে মাহবুবুল হক পাল্টা দাবি করে বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন হাসপাতালে ভর্তি হন তখন তার শারীরিক সমস্যার মধ্যে ছিল আনকন্ট্রোলড ডায়াবেটিস, ক্রনিক রিউমেটিক আর্থ্রাইটিস, দুর্বলতা এবং দাঁতের সমস্যা। তখন উনাকে ভর্তির সঙ্গে সঙ্গেই একটা মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। উনার শারীরিক অবস্থা প্রতিনিয়ত তদারকি করা হয়। এ কারণে গত ৭ মাসে তার অবস্থার কিছু কিছু উন্নতি হয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থিতিশীল রয়েছে। কোনো অবস্থাতেই খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়নি।’
তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার ক্ষেত্রে বরং অসহযোগিতা করছেন। হাসপাতালের অধ্যাপকরা স্বাভাবিক সময়ে গিয়ে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা তার সঙ্গে কথা বলার অনুমতি পান না। আমাদের হাসপাতালের অফিস সময় ২টা পর্যন্ত। প্রায় সময়ই খালেদা জিয়া অনুমতি দেন দেড়টার পর। নির্ধারিত সময়ে তার দেখা পাওয়া যায় না। এমনকি অনেকবার চিকিৎসক সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ফিরে এসেছেন। আর্থ্রারাইটিসের চিকিৎসার একটি ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য খালেদা জিয়ার সম্মতি না পাওয়ায় আগের নিয়মে চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে বলেও দাবি করেন হাসপাতালের পরিচালক।
মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক জিলন মিয়া সরকার সাংবাদিকদের বলেন, আমরা তাকে তিনটি ভ্যাকসিন দিতে চাচ্ছি। তা হলোÑ ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া এবং ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য একটি করে। কিন্তু খালেদা জিয়া তা নিতে চাচ্ছেন না। তবে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে তাঁকে রাজি করানোর জন্য।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শাহানা আক্তার বলেন, খালেদা জিয়া ২৮ বছর ধরে বাতজ¦রে ভুগছেন। এ রোগের অত্যাধুনিক চিকিৎসা এ দেশেও সম্ভব। তিনি যদি ভ্যাকসিনে সম্মতি না দেন তাহলে আগের যে ব্যবস্থাপত্র আছে তাতে এর চেয়ে বেশি উন্নতির আশা চিকিৎসকরা করেন না।
তবে এ চিকিৎসক আশা করছেন, ইনসুলিন নেয়ার ব্যাপারে খালেদা জিয়া যেমন রাজি হয়েছেন, তেমনি ভ্যাকসিন নিতেও রাজি হবেন। তার চিকিৎসার কোনো ত্রুটি হচ্ছে না।
হাসপাতালে থেকে আর কতদিন খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা নিতে হবেÑ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মেডিকেল বোর্ডের এ সদস্য জানান, খালেদা জিয়া ভ্যাকসিন নিতে সম্মতি দিলে হাসপাতালে থাকার দরকার আছে। যদি না দেন তাহলে বর্তমান চিকিৎসা বাড়িতে বা অন্য জায়গায় বসেও সম্ভব। তাছাড়া খালেদা জিয়ার হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ আইনি ব্যাপার।