প্রতিবেদন

দ্রুতই পিঁয়াজের দর কমে আসার আশাবাদ সরকারের

নিজস্ব প্রতিবেদক
ধর্মীয় কারণে ভারতীয়রা গরুর মাংস ও পিঁয়াজ কম খায়। এই দুটি পণ্য বিক্রির জন্য তাদের বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। ভারতীয় কৃষকদের কথা চিন্তা না করে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার গত ২৯ সেপ্টেম্বর হঠাৎ এক আদেশে পিঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে ভারতে পিঁয়াজের বাজারে ধস নামে। ৩১ অক্টোবর ভারতের লাসাগাঁও অনলাইন মার্কেটে কেজিপ্রতি পিঁয়াজ ৬-১০ রুপি দরে বিক্রি হয়। এতে ভারতীয় পিঁয়াজ চাষিদের মাথায় যেমন হাত পড়ে, উল্টোদিকে বাংলাদেশে পিঁয়াজের কেজি ১৬৫ টাকায় গিয়ে ঠেকে।
ন্যায্যমূল্য না পেয়ে ভারতীয় কৃষকরাই এখন বাংলাদেশে পিঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা তুলে দিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে কৃষকের চাপে কর্নাটকে উৎপাদিত পিঁয়াজের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে ভারত। প্রতি চালানে সর্বোচ্চ ৯ হাজার টন রপ্তানি করা যাবে ব্যাঙ্গালুরুর পিঁয়াজ। দেশটির হর্টিকালচার কমিশনারের অনুমতি নিয়ে চেন্নাই সমুদ্রবন্দর দিয়ে এই পিঁয়াজ রপ্তানি করা যাবে।
মূলত ব্যাঙ্গালুরুর পিঁয়াজের পুরোটাই বাংলাদেশে রপ্তানি করে ভারত। এখন সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় বাংলাদেশ আশা করছে পিঁয়াজের দর দ্রুতই কমে যাবে।
জানা গেছে, কর্নাটকের গোলাপি জাতের ব্যাঙ্গালুরু পিঁয়াজ বাজারে চলে আসায় স্থানীয়ভাবে পণ্যটির দাম কমতে শুরু করেছে। ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের রাজ্য সরকারকে চাপ দিচ্ছে, যাতে করে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়া হয়। এছাড়া মহারাষ্ট্রে নির্বাচনও শেষ হয়ে গেছে। ফলে এ মুহূর্তে পিঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা রাখার আর কোনো যৌক্তিক কারণ দেখছেন না ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। শেষে ২৮ অক্টোবর ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বৈদেশিক বাণিজ্য শাখা এক আদেশে শুধু কর্নাটক রাজ্যে উৎপাদিত ‘ব্যাঙ্গালুরু গোলাপি পিঁয়াজ’ রপ্তানির অনুমতি দেয়। এর আগে ২৯ সেপ্টেম্বর এক আদেশে পিঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত। এরপর থেকেই বাংলাদেশে পণ্যটির দাম বাড়তে থাকে দফায় দফায়। শেষ পর্যন্ত ৩১ অক্টোবর পাইকারি বাজারে পণ্যটির দাম কেজিপ্রতি ১১০-১১৫ এবং খুচরা বাজারে ১৩০-১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
কর্নাটকের পাশাপাশি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের কৃষক ও ব্যবসায়ীরাও পিঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে কেন্দ্রকে চাপ দিচ্ছে। তারা শুধু একটি রাজ্য থেকে পিঁয়াজ রপ্তানির এই আদেশে ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে এশিয়ার পিঁয়াজের সবচেয়ে বড় বাজার লাসাগাঁওয়ের চাষিরা পিঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার জন্য কেন্দ্রের কাছে আবেদন করেছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, লাসাগাঁও বাজারের ৬০ শতাংশ পিঁয়াজের ক্রেতা বাংলাদেশ।
সাম্প্রতিক রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতীয় পিঁয়াজ চাষিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। লাসাগাঁও অ্যাগ্রিকালচার প্রডিউস মার্কেট কমিটি বলছে, বিভিন্ন রাজ্য থেকে পিঁয়াজ আসা শুরু হওয়ায় পাইকারি বাজারে পিঁয়াজের দাম দ্রুত কমছে। ফলে পিঁয়াজের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। এখনই রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং গুদামজাতের পরিমাণের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে কৃষকরা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এদিকে বাংলাদেশের বাজারবিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত পিঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। এতে কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে সত্য, তাই বলে ১ কেজি পিঁয়াজের মূল্য ১৫০-১৬০ টাকা হতে পারে না। মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের কারণেই পিঁয়াজের বাজার অস্থির হয়েছে।
অন্যদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, পিঁয়াজের দাম না কমার পেছনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দায়ী। তবে বাজার পর্যবেক্ষণে সরকারের ১০টি মনিটরিং টিম কাজ করছে, মনিটরিং করে পিঁয়াজের দাম শতভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব নয়। কারণ তাদের এত জনবল নেই। তাই আমদানি বাড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে, যেন সহসাই কমে আসে পিঁয়াজের দাম।
প্রায় দুই মাসে ধরে অস্থিতিশীল হয়ে আছে দেশের পিঁয়াজের বাজার। কখন কত দামে বিক্রি হচ্ছে তা বলা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকালের দাম পাল্টে যাচ্ছে বিকেলেই। আর দাম পরিবর্তনের ঝোঁকটা বরাবরই ঊর্ধ্বমুখী।
এক বাজারের সঙ্গে অন্য বাজার, এমনকি পাশাপাশি দোকানেও পিঁয়াজের দামে হেরফের চলছে। যে যেভাবে পারছে ক্রেতার পকেট কেটে নিচ্ছে। আর দামে এই সমন্বয়হীনতার কথা খোদ ব্যবসায়ীরাও স্বীকার করছেন।
জানা গেছে, পিঁয়াজের বাজারের এই অরাজকতা রোধ করে বাজার স্থিতিশীল করতে প্রশাসনিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। টিসিবির মাধ্যমেও পিঁয়াজ বিক্রি করা হচ্ছে। অন্য রাষ্ট্র থেকে পিঁয়াজ আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। মিয়ানমার থেকে প্রচুর পিঁয়াজ আনা হচ্ছে। বাংলাদেশের বাজারে দেখা যাচ্ছে মিয়ানমার ও মিশরের পিঁয়াজ।
সরকার আশা করছে, ভারত শিগগিরই পিঁয়াজ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং সেটা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই হতে পারে। তাছাড়া নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশে উৎপাদিত পিঁয়াজও বাজারে আসতে শুরু করবে। সেক্ষেত্রে নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে বাংলাদেশের বাজারে পিঁয়াজের দর ৩০-৪০ টাকার মধ্যে নেমে আসবে।