প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে কাজ করছে বিআইডব্লিউটিএ : কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলাম চেয়ারম্যান, বিআইডব্লিউটিএ

মো. শহীদ উল্যাহ
নদীকে একটি দেশের প্রাণ বলা হয়। আর বাংলাদেশকে বলা হয় ‘নদীমাতৃক দেশ’। অথচ দখল আর দূষণে এই নদীমাতৃক দেশের অনেক নদীই আজ মৃতপ্রায়। নদ-নদীর এই ভগ্নদশা অবসানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নদীদখল ও দূষণ রোধ করে দেশের সব নদীর প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। বর্তমান সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করলে নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই ঢাকার চারপাশের নদীগুলো অবৈধ দখল প্রতিরোধে মাঠে নামে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএ।
শেখ হাসিনা সরকারের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা ও সমর্থনে গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদী দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বিআইডব্লিউটিএ যে নির্ভীক কার্যক্রম পরিচালনা করে, স্বাধীনতার পর থেকে সংস্থার ইতিহাসে কোনো সময়েই এমন কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা যায়নি। এটা সম্ভব হয়েছে নদীর অবৈধ দখল ও দূষণ প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর অব্যাহত সমর্থন ও সহযোগিতার কারণে।
নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে বিআইডব্লিউটিএ’র এই সাহসী ভূমিকায় নামার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে সাপ্তাহিক স্বদেশ খবর পত্রিকাকে এসব কথা বলেন বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলাম, (এন) বিএসপি, এনডিসি, পিএসসি, বিএন।
চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলামের নেতৃত্বে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদী দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে টানা অভিযান পরিচালনা শুরু করে বিআইডব্লিউটিএ। বুড়িগঙ্গার কামরাঙ্গীরচর থেকে শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। নদী দখলমুক্ত করার এ অভিযানে বুড়িগঙ্গার দুই পাড়ে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিআইডব্লিউটিএ। অভিযানে অবৈধ টিনের স্থাপনা থেকে শুরু করে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় নদীর জায়গায় গড়ে তোলা অসংখ্য বহুতল ভবন ও স্থাপনা। উচ্ছেদ থেকে রেহাই পায়নি স্থানীয় প্রভাবশালীদের অবৈধভাবে দখল করা কোটি টাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও।
এছাড়া তুরাগ নদ দখল করে গড়ে তোলা মোহাম্মদপুরের আলোচিত আমিন মোমিন হাউজিংসহ কমপক্ষে ১৫টি অবৈধ আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দখল থেকে মুক্ত করা হয় নদীর জায়গা। উচ্ছেদ চলাকালে তুরাগের দুই পাড় টঙ্গী ও আশুলিয়া, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা দখল করে গড়ে তোলা অসংখ্য অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গুঁড়িয়ে দেয় বিআইডব্লিউটিএ।
সব মিলিয়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের চারপাশের নদী দখলকারী ৪ হাজার ১৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে বিআইডব্লিউটিএ। নদীর জায়গা অবমুক্ত হয়েছে প্রায় ১১৩ একর। আর নিলামের মাধ্যমে রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ২৬ লাখ টাকা। আর ৬টি মামলায় আসামি করা হয়েছে ২২ জন দখলদারকে।
বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলাম জানান, স্বাধীনতার পর সবচেয়ে জোরালো এই অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে নানা রকম অভিজ্ঞতা হয় তাঁর সংস্থার। কোথাও কোথাও দেখা যায় দখলদাররা নকল কাগজপত্র তৈরি করে আর নিজেদের ইচ্ছেমতো সীমানা পিলার বসিয়ে উচ্ছেদ ঠেকানোর চেষ্টা করে। তবে উচ্ছেদ অভিযানে এসব কোনো অপকৌশলই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
কমোডর ইসলাম জানান, উদ্ধারকৃত জায়গা সুরক্ষাকল্পে ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষে থেকে প্রায় সাড়ে ৮০০ কোটি টাকায় বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যার আওতায় এসব নদীর তীরে ৫২ কিলোমিটার দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। ওয়াকওয়ের আওতায় থাকবে ৪৫ দশমিক ৮ কিলোমিটারে তীর রক্ষা স্লোপ, ৫ দশমিক ৯২ কিলোমিটার জুড়ে অন-পাইল ওয়াকওয়ে এবং বাকি ১ কিলোমিটারে কি-ওয়াল ওয়াকওয়ে। তীরভূমি সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করা হবে ৩টি পরিবেশবান্ধব ইকো পার্ক।
এছাড়া নগরবাসীর ব্যবহারের জন্য নদীর বিভিন্ন স্থানে করা হবে ১০০টি আরসিসি সিঁড়ি ও ৪০৯টি বসার স্থান। পণ্য ওঠানো-নামানোর জন্য হবে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ১৯টি আরসিসি জেটি। সীমানা জটিলতার স্থায়ী সমাধানে ঢাকার চারপাশের নদীতে বসানো হবে ১০হাজার ৮২০টি বিশেষ সীমানা পিলার।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা যায়, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের চারপাশের নদীর তীর আরো টেকসইভাবে সুরক্ষাকল্পে এ প্রকল্পটিতে সংশোধনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। সংশোধনীগুলো হলোÑ
ষ চলমান প্রকল্পের সংশোধিত প্রকল্পে ৪৫ কিলোমিটার স্লোপ ব্যাঙ্ক প্রটেকশনের পরিবর্তে ৩৯ কিলোমিটার কি-ওয়ালের পাশাপাশি প্রায় ১৩ কিলোমিটার অন-পাইল ওয়াকওয়ে নির্মাণ।
ষ সদরঘাট হতে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত ১ কিলোমিটার এলাকা পরিবেশ ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা।
ষ দৃষ্টিনন্দন দোকান, আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন পাবলিক টয়লেট ও উন্নত বিশ্বের আদলে এম্ফিথিয়েটার স্থাপন করা।
ষ সংশোধিত প্রকল্পে কামরাঙ্গীরচর থেকে খোলামোড়া পর্যন্ত ১ কিলোমিটার এলাকায় পর্যটনবান্ধব পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বিআইডব্লিউটিএ’র, যেখানে উন্নত মানের পাবলিক টয়লেটের পাশাপাশি তৈরি করা হবে বিশাল সবুজ বাগান; যার মধ্যে পার্কিংয়ের পাশাপাশি থাকবে দর্শনার্থীদের বসার জায়গা। শিশুদের জন্য করা হবে খেলার মাঠও।
এছাড়া নদী দূষণমুক্ত করতে ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে সদরঘাট থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত নদীপথে ১ কোটি ৭০ লক্ষ ঘনমিটার খনন ও ৭ লক্ষ ঘনমিটার বর্জ্য অপসারণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
কাজের পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় সংশোধিত প্রকল্পের স্থলে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা পূর্বের চেয়ে ১ হাজার ৪১০ কোটি টাকা বেশি।
স্বদেশ খবর-এর এক প্রশ্নের জবাবে কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলাম বলেন, আমরা দৃঢ় কণ্ঠে বলতে চাই, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই নদীকে ঘিরে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে এবং প্রকৃতির জীবন্ত সত্ত্বা ফিরে পাবে তার আসল রূপ। আগের মতো নদীই হয়ে উঠবে চলাচলের প্রধান মাধ্যম। তখনই উন্নয়নের পথে আরেক ধাপ এগোবে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ।
বিআইডব্লিউটিএ’র সূত্রে জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ’র কার্যাবলি মোটামুটিভাবে দু’ভাগে বিভক্ত Ñ ক. উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং খ. নিয়ন্ত্রণমূলক কার্যাবলি।
প্রথম শ্রেণির কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে নাব্যতা রক্ষার জন্য নৌপথ সংরক্ষণ ও নদীশাসন অর্থাৎ সংরক্ষণের কাজ, হাইড্রোগ্রাফি জরিপ, নাবিক প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও নৌচালনা সম্পর্কিত তথ্য প্রদান, পাইলটেজ ও হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভিস প্রদান, নতুন নৌপথ উন্নয়নসহ পুরাতন নৌপথের খননকাজ সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ণ ও বাস্তবায়ন, অভ্যন্তরীণ নদীবন্দর ও টার্মিনালগুলোর উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা, পল্লী অঞ্চলের নৌপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নৌযানের ডিজাইন, নৌপথে মালামাল ভাসিয়ে টেনে আনা, পণ্য নামানো ও টার্মিনাল সুবিধা এবং বন্দরের স্থাপনাসমূহ সম্পর্কে গবেষণা করা, সরকারের সাথে যোগসূত্র রক্ষা এবং সার্বিকভাবে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের উন্নয়ন করা।
বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ন্ত্রমূলক কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী নৌযানগুলোর যাত্রী ও মালপত্রের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ এবং ১৮৬ রুটে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চের সময়সূচি অনুমোদন করা।
সংস্থার চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলাম জানান, বিআইডব্লিউটিএ’র ব্যবস্থাপনায় বছরে প্রায় ১২০ মিলিয়ন যাত্রী এবং ৩০ মিলিয়ন টন পণ্য নৌপথে পরিবহন করা হয়। সংস্থাটি দেশের ২১টি নদীবন্দর এবং ৩৮০টি লঞ্চঘাট ও টার্মিনাল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনা করে থাকে। বিআইডব্লিউটিএ’র ব্যবস্থাপনায় ৯টি ফেরিঘাটও পরিচালিত হয়। এগুলো হচ্ছে পাটুরিয়া, দৌলতদিয়া. মাওয়া, চরজানাজাত, মঙ্গলমাঝি, চাঁদপুর, শরিয়তপুর, ভোলা ও লক্ষ্মীপুর।
বিআইডব্লিউটিএ’র কার্গো সংখ্যা ২ হাজার ৩৯১টি, লঞ্চ ৯২৩টি, স্টিমার ১০টি, ফেরি ৫০টি, অয়েল ট্যাংকার ২৯৬টি, বাল্কহেড ৪ হাজার ১৪১টি, ট্রলার ৫৯১টি, সি-ট্রাক ১৪টি, ড্রেজার- ৯৬০টি (সরকারি ও বেসরকারি)।
বিআইডব্লিউটিএ প্রতি বছর উপকূলে ১ হাজার কিলোমিটার এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৩ হাজার কিলোমিটার সার্ভে করে থাকে। এছাড়া এর বার্ষিক খননকাজের পরিমাণ প্রায় ৫০ লক্ষ ঘনমিটার। বর্তমানে মাওয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীর নাব্য রক্ষায় বিআইডব্লিউটিএ’র ১০টি ড্রেজার একযোগে রাত-দিন কাজ করছে।
বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান জানান, অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সেক্টরের সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র অধীনে ১৯৭১ সালে নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করা হয় দেশের একমাত্র মেরিন ইনস্টিটিউট। ডেক পারসোন্যাল ট্রেনিং সেন্টার নামের এই প্রতিষ্ঠানটিতে ৭টি কোর্স চালু রয়েছে। ১ বছর মেয়াদি শিক্ষানবিশ কোর্সের পাশাপাশি এই কেন্দ্রটি বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর ডেক কর্মীদের জন্য বাকি কোর্সগুলো পরিচালনা করে। কোর্সগুলোর মেয়াদ ৩ মাস করে।
বিআইডব্লিউটিএ’র মেরিন ওয়ার্কশপটি বরিশালে ১৯৬০ সালে স্থাপিত হয়। তৎকালীন পশ্চিম জার্মান সরকারের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিত এই ওয়ার্কশপে বিআইডব্লিউটিএ’র অধীন নৌযান ও পন্টুন নির্মাণ এবং ড্রেজারবহর ও পন্টুন মেরামত করা হয়ে থাকে। এছাড়া এখানে অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের নৌযান তৈরি ও মেরামতের কাজও হয়ে থাকে।
ঢাকার চারপাশে বৃত্তাকার নৌ-পথ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর এম মাহবুব-উল ইসলাম জানান, রাজধানী ঢাকার চারপাশে নৌপথ চালুকরণ ১ম পর্যায় ও ২য় পর্যায় নামে দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকল্প দুটি যথাক্রমে ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল মেয়াদে এবং ২০০৮ সাল থেকে ২০১৩ মেয়াদে শেষ করা হয়। এ প্রকল্প দুটির মাধ্যমে সদরঘাট হতে আশুলিয়া এবং আশুলিয়া হতে কাঁচপুর পর্যন্ত ১২০ ফুট প্রশস্ততা ও ৬ ফুট ড্রাফটবিশিষ্ট নৌপথ চালু করা হয়। বর্তমানে নৌপথটি উক্ত ড্রাফটে চালু আছে। নৌপথে প্রায় ১৫টি ল্যান্ডিং স্টেশন বা ঘাট দিয়ে বিভিন্ন নৌযানের মাধ্যমে মালামাল পরিবাহিত হয়। মালামাল ওঠানামার জন্য ইজারা প্রদান করা হয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই ১৫টি ল্যান্ডিং স্টেশন প্রায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। নৌপথটিতে কার্গো চলাচল করে।
ঢাকা শহরের চারদিকে নদীর তীরভূমি হতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের মাধ্যমে উদ্ধারকৃত তীরভূমিতে ইতোমধ্যে ২০ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, বনায়ন ও দুটি ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। তাছাড়া গত জানুয়ারি (২০১৯) হতে আগস্ট পর্যন্ত চলা উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে ঢাকার চারপাশের নদীর তীরভূমির প্রায় ১৩৫ দশমিক ৫০ একর ভূমি উদ্ধার করা হয়েছে । বর্তমানে ৮৪৮ দশমিক ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো ৫২ কিলোমিটার ওয়াকওয়ে, ১০ হাজার ৮২০টি সীমানা পিলার, বনায়ন, ৩টি ইকোপার্ক, ৬টি পন্টুন, ৪০ কিলোমিটার কি-ওয়াল, ১৯টি আরসিসি জেটি, ৪০টি স্পাড ও ৪০৯টি বসার বেঞ্চ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যা ২০২২ সালের মধ্যে সম্পন্ন হবে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে সম্পাদিত বিআইডব্লিউটিএ’র উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কার্যাবলির বিবরণ দিতে গিয়ে সংস্থার সূত্রে জানা যায়, এই সময়ে চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ যোগাযোগের সুবিধার্থে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ১ হাজার ৬৭ মিটার দীর্ঘ আরসিসি জেটি নির্মাণ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় ট্রানশিপমেন্ট পয়েন্ট হতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের গোল চত্বর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ, চাঁদপুরের হরিণা-আলুবাজার ফেরি রুটে আলুবাজার ফেরি টার্মিনাল হতে ফেরিঘাট অভিমুখী বিকল্প সংযোগ সড়ক নির্মাণ, বালাশী ও বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট নির্মাণ, মাদারীপুর শিপ পার্সোন্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন; বরিশাল ডিইপিটিসি-র এক তলা হোস্টেল ভবন দ্বিতলকরণ কাজ; খুলনা নদীবন্দরের কি এলাকায় ১৩০ ফুট পাইলিং পুনর্নির্মাণ; টেকনাফে নাফ নদীর পর্যটক ঘাটে আরসিসি পিলার দিয়ে ২২০ ফুট জেটি নির্মাণকাজ; কক্সবাজার ৬নং ঘাটে জেটি নির্মাণকাজ; চাঁদপুর ডিভিশনের আওতাধীন রামচন্দ্রপুর লঞ্চঘাটে স্টিল জেটি ও স্টিল স্পাড নির্মাণসহ স্থাপন কাজ; চাঁদপুর ডিভিশনের আওতাধীন এখলাছপুর লঞ্চঘাটে স্টিল জেটি ও স্টিল স্পাড নির্মাণসহ স্থাপনকাজ; নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের আওতাধীন খানপুর অফিসার্স কোয়ার্টারের ক্ষতিগ্রস্ত বাউন্ডারি ওয়াল পুনর্নির্মাণ কাজ; শিমুলিয়া (মাওয়া) স্পিডবোট ঘাট মাঝিকান্দি এবং নড়িয়া যাত্রীদের জন্য একটি জেটি নির্মাণ কাজ; শিমুলিয়া (মাওয়া) লঞ্চঘাটে ৪টি জেটি ও ৮টি স্পাড স্থাপন কাজ; ঢাকা সদরঘাটে ওয়াইজঘাট এলাকায় যাত্রী ও যানবাহন নির্বিঘেœ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণকাজ; কক্সবাজার জেলার টেকনাফ নদীবন্দরের জন্য এম এস স্পাড নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কাজ; বাঅনৌপক, বরিশাল ডিভিশনের আওতাধীন মিরেরহাট লঞ্চঘাটে জেটি নির্মাণ ও ২টি এম এস স্পাড স্থাপনসহ আনুষঙ্গিক কাজ; অভ্যন্তরীণ নৌপথে নিয়মিত সংরক্ষণ ড্রেজিং ১৩৯ দশমিক ৬৩ লক্ষ ঘন মিটার এবং উন্নয়ন ড্রেজিং ২৭৮ দশমিক ৮৪ লক্ষ ঘন মিটার এবং ১৭টি নৌ-পথে ও-ডি সার্ভে সম্পন্ন করা হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে আরো জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিআইডব্লিউটিএ’র বিভিন্ন ঘাটের ইজারামূল্য বাবদ ৭৫ কোটি ২৭ লক্ষ ৫২ হাজার টাকা রাজস্ব অর্জিত হয়েছে। একই অর্থবছরে বাংলাদেশি নৌ-যান দ্বারা ২৬ লক্ষ ২৩ হাজার ৭৭৭ মেট্রিক টন এবং ভারতীয় নৌ-যান দ্বারা ৭৮ হাজার ৭৯৪ মেট্রিক টন অর্থাৎ মোট ২৭ লক্ষ ২ হাজার ৫৭১ মেট্রিক টন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারত পরীক্ষামূলকভাবে নৌপথে যাত্রীবাহী জাহাজ চালু করেছে। বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এসওপি প্রস্তুত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
আলোচ্য সময়ে নৌপথে পর্যাপ্তসংখ্যক নৌসহায়ক বয়াবাতি স্থাপন, নৌপথের ২১৩টি পন্টুন মেরামত ও পুনঃস্থাপন এবং ৭টি নতুন পন্টুন স্থাপন করা হয়েছে। ১০টি ড্রেজার সংগৃহীত হয়েছে। ৪৫টি বিশেষ ধরনের পন্টুন সংগ্রহে আনন্দ শিপবিল্ডার্স অ্যান্ড স্লিপওয়েস লিমিটেডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
জানা যায়, বিআইডব্লিউটিএ শুধু নদী দখল ও দূষণ রোধেই কাজ করছে না, জলপথের মাধ্যমে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বিআইডব্লিউটিএ ঢাকার সদরঘাট নৌ টার্মিনাল ও নারায়ণগঞ্জ নৌ টার্মিনালকে উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক মানসম্পন্ন টার্মিনালে পরিণত করতে চায়। এর পাশাপাশি ঢাকাকে ঘিরে থাকা চার নদীর তীর থেকে যে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে, সেখানে যাতে অবৈধ দখলদাররা আবারো স্থাপনা তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সংস্থাটি সজাগ দৃষ্টি রাখছে। বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নৌ পরিবহন মন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর অব্যাহত সহযোগিতা ও সমর্থন পেলে রাজধানীকে ঘিরে থাকা চার নদী আবার ফিরে পাবে প্রাণ। প্রবল জোয়ার-ভাটা বইবে নদী চারটিতে। নদীগুলোর পানি হবে দূষণমুক্ত।

একনজরে ২০০৯-১০ হতে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএ’র গুরুত্বপূর্ণ অর্জন

ক্স নোয়াপাড়া, ভৈরব, আশুগঞ্জ ও বরগুনা নদীবন্দর স্থাপন।
ক্স ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার নৌ-পথ চালুকরণ এবং নতুন প্রকল্প গ্রহণ।
ক্স অভ্যন্তরীণ নৌ-পথের নাব্যতা রক্ষায় ৪টি এম্পিবিয়ান ড্রেজারসহ ১৮টি ড্রেজার ও ৯২টি সহায়ক জলযান (ক্রেনবোট, ক্রু-হাইজবোট, টাগবোট, সার্ভেবোটসহ আনুষাঙ্গিক) সংগ্রহ।
ক্স পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার নৌ-টার্মিনাল নির্মাণ।
ক্স বিভিন্ন নৌ-পথে ৩০০টি নতুন পন্টুন স্থাপন।
ক্স মাদারীপুর-চরমুগুরিয়া-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ নৌ-পথে ড্রেজিং।
ক্স ২টি উদ্ধারকারী জলযান (নির্ভীক ও প্রত্যয়) সংগ্রহ।
ক্স আশুগঞ্জ অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার নৌ-বন্দর স্থাপন।
ক্স ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও টঙ্গী নদীবন্দর এলাকায় উচ্ছেদকৃত স্থানে ভৌত সুবিধাদি নির্মাণ।
ক্স ঢাকা, বরিশাল, পটুয়াখালী নদীবন্দর টার্মিনাল আধুনিকায়ণ ও সম্প্রসারণ।
ক্স নৌ-পথের নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি সংগ্রহ।
ক্স চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ যোগাযোগের সুবিধার্থে সন্দ্বীপ চ্যানেলে ১ হাজার ৬৭ মিটার দীর্ঘ আরসিসি জেটি নির্মাণ।
ক্স ঢাকা জেলার শ্যামপুরে ও নারায়ণগঞ্জের খানপুরে ইকোপার্ক নির্মাণ।
ক্স অভ্যন্তরীণ নৌ-রুটসহ উত্তরাঞ্চলে পণ্য পরিবহনে ৫২ কিলোমিটার পাটুরিয়া-বাঘাবাড়ি নৌ-পথে নাইট নেভিগেশন চালুকরণ।
ক্স বরিশাল ও মাদারীপুর শিপ পার্সোন্যাল ট্রেনিং সেন্টার চালুকরণ।
ক্স অভ্যন্তরীণ নৌ-পথের ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্প।
ক্স ১২টি গুরুত্বপূর্ণ নৌ-পথ খনন কার্যক্রম।
ক্স হারিয়ে যাওয়া নৌপথ ড্রেজিং করে নতুন ১ হাজার ৭৪০ কিলোমিটার নৌপথ সৃষ্টি।
ক্স নৌ-পথে তদারকি জোরদার করার লক্ষ্যে ৬টি স্পিডবোট সংগ্রহ।
ক্স টঙ্গী নদীবন্দরের দ্বিতল টার্মিনাল নির্মাণ।
ক্স মাওয়া হতে শিমুলিয়ায় ঘাট স্থানান্তর।
ক্স খুলনা নদীবন্দর এলাকায় উন্নয়ন ও সংস্কার।
ক্স বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর বর্জ্য অপসারণ ও পানি দূষণমুক্তকরণ।
ক্স বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলে লঞ্চঘাট ও ওয়েসাইড ঘাট উন্নয়ন।
ক্স প্রটোকলের আওতাধীন বিভিন্ন নৌ-পথ ড্রেজিং।
ক্স মোংলা বন্দরের অদূরে পশুর নদী খনন।
ক্স মাওয়া-চরজানাজাত স্পিডবোট ঘাটে ২টি নতুন স্পিডবোট পন্টুন স্থাপন।
ক্স বিভিন্ন নদীবন্দরে সোলার প্যানেল স্থাপন।
ক্স দৌলতদিয়া ঘাটে পার্কিং ইয়ার্ড নির্মাণ।
ক্স মোংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথ খনন করে পুনরায় চালুকরণ।
ক্স মাদারীপুর-টেকেরহাট-গোপালগঞ্জ নৌ-পথ খনন।
ক্স নারায়ণগঞ্জ জেলার পাগলায় স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণ।
ক্স কাওড়াকান্দি হতে কাঁঠালবাড়ী ঘাট স্থানান্তর।
ক্স বিভিন্ন নদী বন্দরে পাইলট হাউজ নির্মাণ।
ক্স ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার আশুগঞ্জে ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট চালুকরণ।
ক্স সারাদেশের নৌ-পথে যাত্রীসেবা উন্নয়নে ঘাট নির্মাণ/পুনর্নির্মাণ।
ক্স বাংলাদেশ-ভারত নৌ-ট্রান্সশিপমেন্ট চালু করে কলকাতা-আশুগঞ্জ-ত্রিপুরা নৌ-পথ ও সড়কপথে মালামাল পরিবহন ব্যবস্থা প্রবর্তন।
ক্স নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ খনন।
ক্স দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন ল্যান্ডিং স্টেশনে বন্দর সুবিধাদির উন্নয়ন।
ক্স ঢাকা নদী বন্দরের আওতায় সদরঘাট হতে শ্মশানঘাট পর্যন্ত রাস্তা উন্নয়ন এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকাজ সম্পন্ন।
ক্স আলু বাজার ফেরিঘাট টার্মিনালের পার্কিং ইয়ার্ড হতে বিদ্যমান ফেরিঘাট পর্যন্ত সংযোগ সড়ক নির্মাণ।
ক্স কক্সবাজার নুনিয়াছড়ায় আরসিসি জেটি নির্মাণ।
ক্স আশুগঞ্জ ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হতে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ।
ক্স বরিশাল, মোংলা, রাঙ্গামাটি, আংটিহারায় পাইলট হাউজ নির্মাণ।
ক্স কক্সবাজার ও রাঙ্গামাটি পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ।
ক্স হরিণা-আলুবাজার ফেরি রুটে আলুবাজার ফেরি টার্মিনাল হতে ফেরিঘাট অভিমুখী বিকল্প সংযোগ সড়ক নির্মাণ।
ক্স বালাশী ও বাহাদুরাবাদ ফেরিঘাট নির্মাণ।
ক্স খুলনা নদীবন্দরের কী এলাকায় ১৩০ ফুট পাইলিং পুনর্নির্মাণ।
ক্স টেকনাফে নাফ নদীর পর্যটক ঘাটে আর সি সি পিলার দিয়ে ২২০ ফুট জেটি নির্মাণ।
ক্স শিমুলিয়া (মাওয়া) লঞ্চঘাটে ৪টি জেটি ও ৮টি স্পাড স্থাপন।
ক্স মুন্সিগঞ্জ-গজারিয়ায় ফেরিঘাট নির্মাণ।
ক্স বরগুনা জেলায় বন্যাতলী-চরশিবা ফেরিঘাট চালুকরণ।