প্রতিবেদন

প্রভাবশালীরাও এখন দুদক আতঙ্কে

নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্যাসিনোকা- দিয়ে শুরু হওয়া সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযান আরো বিস্তৃত করছে দুদক। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ৪ সংসদ সদস্যের পাশাপাশি উচ্চ পদে থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর এবার জাল ফেলেছে সংস্থাটি। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ১১ কর্মকর্তার বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এসবি পুলিশের ইমিগ্রেশন সুপারের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের দেশত্যাগ ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে বলেছে দুদক।
নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা হলেনÑ গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী উৎপল কুমার দে, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবদুল মোমেন চৌধুরী ও রোকনউদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী স্বপন চাকমা, শওকত উল্লাহ, ফজলুল হক, আবদুল কাদের চৌধুরী, আফসারউদ্দিন ও ইলিয়াস আহমেদ, কর্মকর্তা সাজ্জাদুল ইসলাম ও জ্যেষ্ঠ সহকারী মুমিতুর রহমান।
অভিযোগ অনুসন্ধান দলের প্রধান, দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের সই করা চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ অবস্থায় তারা দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে।
গত ২৭ অক্টোবর দুদক একটি চিঠিতে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে প্রায় ৮০ ব্যক্তির ব্যাংক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে, যাদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ নাথসহ ৪ এমপি ছাড়াও কর্মরত ১৪ জন এবং সাবেক ৩ বড় সরকারি কর্মকর্তা রয়েছেন।
বিএফআইইউর একটি সূত্র জানায়, দুদকের তালিকাটিতে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ১৪ কর্মকর্তা ছাড়াও সাবেক এক সংসদ সদস্যের নামও রয়েছে। ব্যবসায়ী, ঢাকার ২ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর, রাজধানীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা এবং ক্রীড়াসংগঠকদেরও নাম রয়েছে তালিকায়।
দুদকের তালিকায় থাকা ৪ সংসদ সদস্য হলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বরিশাল-৪ আসনের সংসদ সদস্য পংকজ নাথ, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ভোলা-৩ আসনের সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের মহাসচিব সামশুল হক চৌধুরী এবং সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন। সাতক্ষীরার সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মজিবুর রহমান এবং নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের স্ত্রী ফারজানা চৌধুরীও রয়েছেন তালিকায়।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তিন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নামও আছে তালিকায়। তারা হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজান ও ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজিব এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোমিনুল হক সাঈদ।
তালিকায় আছে ১১ যুবলীগ নেতার নামও। তারা হলেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমান, ইসমাইল হোসেন স¤্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, মোমিনুল হক সাঈদ, সোহরাব হোসেন স্বপন, এনামুল হক আরমান, সরোয়ার হোসেন মনা, জাকির হোসেন, গাজী সরোয়ার বাবু, তাবিবুল হক তামিম।
তালিকায় আছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওছার ও সাধারণ সম্পাদক পংকজ নাথ। সাবেক দুই ছাত্রলীগ নেতার হিসাবও চেয়েছে দুদক। তারা হলো, এস এম রবিউল হোসেন সোহেল ও মিজানুর রহমান।
রাজধানীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের ৫ নেতা আছেন তালিকায়। তারা হলেন এনামুল হক, রুপন মিয়া, রাশেদুল হক ভূঁইয়া বাতেনুল হক ভূঁইয়া ও হারুনুর রশীদ। কলাবাগান থানা কৃষক লীগের নেতা শফিকুল আলম ফিরোজের নামও আছে।
দেশের ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ৪ জনের নামও আছে তালিকায়। তারা হলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পরিচালক লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, চট্টগ্রাম আবাহনী ক্লাবের মহাসচিব শামছুল হক চৌধুরী, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজ ও ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী আবুল কালাম।
দুদকের তালিকায় আছেন বান্দরবানের সিলভান ওয়াই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা সেন্টারের চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন মন্টু, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল করিম চৌধুরী স্বপন, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জামিল উদ্দিন শুভ, পরিচালক এস এইচ এম মহসিন, পরিচালক উম্মে হাবিবা নাসিমা আক্তার, পরিচালক জিয়া উদ্দিন আবীর, পরিচালক জাওয়াদ উদ্দিন আবরার।
দুদকের তালিকায় আছেন গণপূর্তের ঠিকাদার জি কে শামীম, ব্যবসায়ী প্রশান্ত কুমার হালদার, আফসার উদ্দিন মাস্টার, আয়েশা আক্তার, শামীমা সুলতানা, শেখ মাহামুদ জোনায়েদ, মো. জহুর আলম, এস এম আজমল হোসেন, ব্রজ গোপাল সরকার, শরফুল আওয়াল, মগবাজার টিঅ্যান্ডটি কলোনির জাকির, নয়াটোলার সেন্টু ও শোভন, বাড্ডার নাসির, বনানী গোল্ড ক্লাবের আবদুল আওয়াল ও আবুল কাশেম, নোয়াখালীর মেসার্স জামাল অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী জামাল হোসেন, পদ্মা অ্যাসোসিয়েটস ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের মিনারুল চাকলাদার, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের রেজোয়ান মোস্তাফিজ, অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান, জি কে শামীমের দুই সহযোগী জিয়া ও নাঈম এবং শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও নাদিম (ওমানে পলাতক)। এ ছাড়া আরো বেশ কয়েকজন অবৈধ সম্পদ অর্জনকারীর নাম আছে এ তালিকায়।
দুদক জানায়, এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধ অর্থ উপার্জনের অনেক তথ্য দুদকের হাতে এসেছে। তাই তাদের ব্যাংক হিসাব চাওয়া হয়েছে। ব্যাংক হিসাব হাতে আসার পর ওই সব ব্যক্তির আয়কর ফাইলও সংগ্রহ করা হবে। অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার আবেদন এবং তদন্ত শেষে মামলা করা হবে।
তালিকার বিষয়ে বিএফআইইউ জানায়, তালিকা ক্রমেই বড় হচ্ছে। এ নিয়ে দুদকও কাজ করছে, বিএফআইইউও করছে। বিএফআইইউ এখন পর্যন্ত ৪০ জনের ব্যাংক হিসাব স্থগিত করেছে। দুদক যাদের তথ্য চেয়েছে সেগুলো নিয়েও বিএফআইইউ কাজ করছে।
দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সম্প্রতি বলেন, দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ অর্থ অর্জনের অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে উঠছে, তাদের প্রত্যেককেই অনুসন্ধানের আওতায় আনবে দুদক। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বড় হয়ে উঠবে না। তাদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেয়া হবে।