ফিচার

ভর্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে শিক্ষার্থী-অভিভাবক-স্কুল

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিসেম্বরজুড়ে স্কুলে স্কুলে চলবে ভর্তি কার্যক্রম। ভর্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ। কোনো কোনো বেসরকারি স্কুলে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ভর্তি ফরম বিতরণ কার্যক্রম। তবে বেশিরভাগই শুরু হবে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে, চলবে মাসজুড়ে।
প্রতি বছর এ সময় স্কুলে ভর্তিযোগ্য সন্তানদের অভিভাবকের চোখে ঘুম থাকে না। পছন্দের স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করানোই থাকে তাদের লক্ষ্য। এ কারণে ঠিকমতো হাঁটতে শেখার আগেই শিশুর পরিচয় ঘটে যায় প্রাইভেট-কোচিংয়ের সঙ্গে। আর এসব কোচিং সেন্টার শিশুদের স্কুলে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে রমরমা ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর নামি স্কুলগুলোর বিরুদ্ধেও ভর্তিবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে কিছু নামি বেসরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য রীতিমতো যুদ্ধ হলেও প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকার পরও শিক্ষার্থী পায় না অনেক সরকারি স্কুল। শিক্ষাবিদরা বলছেন, অভিভাবকদের পছন্দের স্কুলে ভর্তি হতেই শিশুদের নামিয়ে দেয়া হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে। এক শ্রেণির অভিভাবক এলিট রোগে ভোগে। তাদের মনে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সরকারি স্কুলে গরিবের সন্তানরা পড়াশোনা করে।
এবার মহানগরী ও জেলা সদরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের স্কুলগুলোর ভর্তি আবেদনও অনলাইনে গ্রহণ করতে হবে। এবারও প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হবে। আর দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই শিক্ষার্থী বাছাই করা হবে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য একজন শিশুর বয়স হতে হবে ৬ বছরের উপরে। এসব বিষয় উল্লেখ করে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিমালা-২০২০ চূড়ান্ত করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এবার দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এমসিকিউ পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সে বিষয়ে দ্বিমত থাকায় আগের মতোই লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
৩০ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরীর ৩৬টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে তিনটি গুচ্ছে ভাগ করে পরীক্ষা নেয়া হবে। একজন শিক্ষার্থী একটি গুচ্ছের একটি স্কুলেই আবেদন করতে পারবে। আগের মতোই বিদ্যালয় সংলগ্ন ক্যাচমেন্ট এরিয়ার জন্য ৪০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করা হবে। আর বাকি ৬০ শতাংশ সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। তবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এর অধীনস্থ দপ্তরসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা হবে।
২০২০ শিক্ষাবর্ষে ভর্তির জন্য সব মহানগরী, বিভাগীয় শহর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভর্তির আবেদন গ্রহণ, আবেদনের ফি গ্রহণ এবং ফলাফল প্রকাশ অনলাইনে করতে হবে। তবে কোনো কারণে অনলাইনে করা সম্ভব না হলে শুধু উপজেলা পর্যায়ের স্কুলগুলোর জন্য ম্যানুয়ালি আবেদনের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি স্কুলে আবেদন ফি ধরা হয়েছে ১৭০ টাকা।
জানা গেছে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির ক্ষেত্রে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বাংলায় ১৫, ইংরেজিতে ১৫ এবং গণিতে রাখা হয়েছে ২০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ১ ঘণ্টা। এছাড়া চতুর্থ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বাংলায় ৩০, ইংরেজিতে ৩০ এবং গণিতে রাখা হয়েছে ৪০ নম্বর। পরীক্ষার সময় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা সন্তানদের ছেলে-মেয়ে, প্রতিবন্ধীদের কোটা আগের মতো বহাল রাখা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তান এবং সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের কোটা ২ শতাংশের পরিবর্তে ৩ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল, কিন্তু আদালতে মামলা থাকায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
আর বেসরকারি স্কুলের ক্ষেত্রে কোন শ্রেণিতে কত আসন রয়েছে তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলা হয়েছে। কোনো স্কুলে যাতে নির্ধারিত আসনের বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করতে না পারে সে জন্য কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু থাকবে বলে সভা থেকে জানানো হয়।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভায় নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। আমরা প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে বসব। তাদের সঙ্গে আলোচনা করে অনলাইনে আবেদন, ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণসহ অন্যান্য সময়সূচি ঠিক করা হবে।’
দেখা যায়, প্রতি বছরই প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি নিয়েই সবার আগ্রহ বেশি। ঢাকার যে ১৪টি মাধ্যমিক স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে সেগুলো হলো আজিমপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধানমন্ডি গভ. ল্যাবরেটরি স্কুল, ধানমন্ডি গভ. বয়েজ স্কুল, তেজগাঁও বয়েজ স্কুল, তেজগাঁও গার্লস স্কুল, শেরেবাংলা নগর সরকারি বয়েজ স্কুল, শেরেবাংলা নগর সরকারি গার্লস স্কুল, মতিঝিল বয়েজ স্কুল, খিলগাঁও সরকারি স্কুল, নারিন্দা সরকারি স্কুল, বাংলাবাজার সরকারি গার্লস স্কুল, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ সংযুক্ত স্কুল, মোহাম্মদপুর সরকারি স্কুল ও গণভবন সরকারি স্কুল। এ স্কুলগুলোতে প্রথম শ্রেণিতে আসন প্রায় দেড় হাজার।
ভর্তিযুদ্ধ বিষয়ে শিক্ষকরা বলেন, আমাদের অভিভাবকদের মনে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সরকারি স্কুলে গরিবের সন্তানরা পড়াশোনা করে। তারা এক ধরনের এলিট রোগে ভুগছে। ফলে তারা কথিত নামি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন।
তারা আরো বলেন, দেশের পড়ালেখায় মফস্বল স্কুল প্রধান ভূমিকা রাখলেও কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারির অভাব এবং অবহেলায় শহরের স্কুলগুলো কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না। পক্ষান্তরে কথিত নামি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের রীতিমতো যুদ্ধে নামিয়ে দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিভাবকরা সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে চায়। এজন্য তারা রীতিমতো যুদ্ধে নামে। তবে ভালো স্কুলের মাপকাঠি কি, তা অভিভাবকদের আগে বুঝতে হবে। দক্ষ শিক্ষক ও সঠিক পরিচালনা পর্ষদ হলো একটি ভালো স্কুলের প্রধান মাপকাঠি। শুধু খ্যাতনামা স্কুলেই যে দক্ষ শিক্ষক আছে, এমন নয়। অনেক অখ্যাত স্কুলেও দক্ষ শিক্ষক আছেন, যারা নানা কারণে কোনো সময়েই খ্যাতনামা স্কুলে যেতে পারেন না।
ঢাকা শহরের নামি স্কুলগুলোতে ভর্তিবাণিজ্য হয় বলে অভিযোগ আছে। কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কত আসন রয়েছে তার কোনো হিসেব নেই সরকারের কাছে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০০ আসন থাকলে সেখানে ১৫০ আসন ঘোষণা দিয়ে বাকি আসনগুলো টাকার বিনিমিয়ে ভর্তি করিয়ে থাকে। এছাড়া নামি স্কুলে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে রাজধানীর কোচিং সেন্টারগুলোতেও চলছে রমরমা ব্যবসা।