ফিচার

মুখের দুর্গন্ধ: কারণ ও প্রতিকার

অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী
মুখের দুর্গন্ধ কেন হয়, তা নিয়ে গবেষণা বহুকাল যাবত চলে আসছে। সে সব গবেষণা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। সেগুলোর অন্যতম হলো:
ক্স প্রতিবার খাবার গ্রহণে মুখের ভেতরে খাদ্য আবরণ দাঁতের ফাঁকে, মাড়ির ভেতর জমে থেকে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি এবং তা থেকে মাড়ির প্রদাহ (পেরিওডেন্টাল ডিজিজ)
ক্স মুখের যেকোনো ধরনের ঘা বা ক্ষত
ক্স আঁকাবাঁকা দাঁত থাকার কারণে খাদ্যকণা ও জীবাণুর অবস্থান
ক্স দেহে সাধারণ রোগের কারণে মুখের ভেতরে ছত্রাক ও ফাঙ্গাসজাতীয় ঘা (ক্যানডিজিস)
ক্স মুখের ক্যান্সার
ক্স ডেন্টাল সিস্ট বা টিউমার
ক্স দুর্ঘটনার কারণে ফ্রেকচার ও ক্ষত
তাছাড়া দেহের অন্যান্য রোগের কারণেও মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে, যেমনÑ
ক্স পেপটিক আলসার বা পরিপাকতন্ত্রের রোগ
ক্স লিভারের রোগ
ক্স গর্ভাবস্থা
ক্স কিডনি রোগ
ক্স রিউমেটিক বা বাতজনিত রোগ
ক্স ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র
ক্স হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্তচাপ
ক্স গলা বা পাকস্থলীর ক্যান্সার
ক্স এইডস রোগ
ক্স হৃদরোগ
ক্স মানসিক রোগ
ক্স নাক, কান, গলার রোগ
মুখের দুর্গন্ধ সম্পর্কে সবচেয়ে মজার তথ্যটি হলো যে, এটা ব্যক্তি নিজে বুঝতে পারেন না এবং অবলীলায় সবার সঙ্গে কথা বলে যান, কিন্তু অন্যরা বুঝতে পারেন যারা তার কাছাকাছি থাকেন, এটাই মুখের দুর্গন্ধের একটি বড় সমস্যা। এতে সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবও কাছে ঘেঁষতে চায় না। অনেকেই বন্ধু ও প্রিয়জনের সান্নিধ্য থেকে বঞ্চিত হন এবং অপ্রিয় হয়ে যান। এ রকম অবস্থায় লাজ-লজ্জা ভুলে নিকটজন কাউকে জিজ্ঞেস করা ভালো যে, তার মুখে কোনো দুর্গন্ধ আছে কিনা অথবা কী তার সমস্যা। সবার কাছে লজ্জা পাওয়ার চাইতে এক বন্ধুর কাছে একটু লজ্জা পাওয়া খারাপ নয় নিশ্চয় অথবা নিজের মুখের সামনে হাত রেখে জোরে হা করে বাতাস বের করে নাকের দিকে ফিরিয়ে নিলে নিজেই বুঝতে পারা যাবে মুখে দুর্গন্ধ আছে কিনা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বন্ধু স্ত্রী হলে স্বামী অথবা স্বামী হলে স্ত্রীর পরামর্শ নেয়া ভালো, সন্তান হলে তাকেও প্রশ্ন করা যায়।

মুখে দুর্গন্ধ হলে ঘরে বসে
আপনি যা করবেন
ক্স একটি পরিষ্কার উন্নত মানের দাঁতের ব্রাশ ও পেস্ট দিয়ে দাঁতের সব অংশ ভেতরে-বাইরে পরিষ্কার করুন (তিন বেলা খাবারের পর)।
ক্স জিহ্বা পরিষ্কারের জন্য জিবছুলা ব্যবহার করুন। বাজারে স্টেনলেস স্টিল অথবা প্লাস্টিকের জীবছুলা পাওয়া যায়।
ক্স যেকোনো ধরনের মাউথওয়াস (ক্লোরহেক্সিডিনজাতীয়) ২ চামচ মুখে ৩০ সেকেন্ড রেখে ফেলে দিয়ে আবার অল্প গরম লবণ পানিতে কুলি করুন। প্রতিদিন অন্তত দু’বার; সকালে ও রাতে আহারের পর।
ক্স অবসর সময়ে মুখের ভেতরে একটি লবঙ্গ বা এলাচির দানা রাখুন।
ক্স প্রতিবার আহারের পর (যা কিছু খাবেন যেমন বিস্কুট, ফলমূল ইত্যাদি) সম্ভব হলে দাঁত ব্রাশ করুন অথবা ভালোভাবে কুলি করে ফেলুন।
ক্স ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য জর্দা, পান ইত্যাদি বর্জন করুন।

বিশেষভাবে যা করবেন
দাঁত ব্রাশ করলেই শুধু ময়লা বা খাদ্যকণা পরিষ্কার হয় না। কারণ, দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে বা মাড়ির ভেতরে অনেক সময় খাদ্যকণা জমা থেকে পচন শুরু হয়। তাই যাদের দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে খাদ্য জমা হয় বুঝতে হবে তাদের ডেন্টাল ফ্লস (এক ধরনের পিচ্ছিল সুতা) বা ডেন্টাল টুথ পিকসের (এক ধরনের জীবাণুমুক্ত শলাকা) সাহায্যে খাদ্যকণাগুলো বের করা প্রয়োজন। এই ডেন্টাল ফ্লস এবং জীবাণুমুক্ত শলাকা ব্যবহারবিধি ডেন্টাল সার্জনের কাছ থেকে জেনে নেয়া ভালো।
অনেক সময় এ ফাঁকগুলো ডেন্টাল ক্যারিজ বা মাড়ির রোগের কারণেও হতে পারে। তাই কোনো সিদ্ধান্তের আগে ডেন্টাল এক্স-রে করিয়ে নেয়ার পর নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।

কী ধরনের চিকিৎসা
ক্স মাড়ির প্রদাহ, ডেন্টাল ক্যারিজ, মুখের ক্ষত, কৃত্রিম দাঁতের ও ক্রাউনের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা ইত্যাদি চিকিৎসা একজন ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শে সারিয়ে তুলতে হবে।
ক্স মুখের স্থানীয় কারণের সঙ্গে অথবা স্থানীয় কারণ দূর হয়ে যাওয়ার পরও দুর্গন্ধ থেকে থাকলে দেহে অন্যান্য রোগ আছে কিনা জানতে হবে। এ জন্য যা যা পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন সেগুলো করিয়ে রোগ নির্ণয় হওয়ার পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শমতো চিকিৎসা নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের রিগলে কোম্পানির একদল বিজ্ঞানী সম্প্রতি দাঁত ও মুখের দুর্গন্ধে ভুগছেন এমন ৯ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর সমীক্ষা চালান। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে জার্নাল অব এগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড কেমিস্ট্রিতে তারা লেখেন একটি নিবন্ধ। এতে উল্লেখ করা হয়, পুদিনা মুখের দুর্গন্ধ বা দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস দূরীকরণে সহায়ক। তবে তার চেয়েও বেশি কার্যকর ম্যাগনোলিয়া গাছের বাকল। আংশিক হিসাবে তুলনা করলে বলা যায়, শুধু মিন্ট বা পুদিনা যেখানে ৩ দশমিক ৬ ভাগ কার্যকর ম্যাগনোলিয়ার সাফল্য সেখানে ৬০ ভাগ। গবেষকদের মতে, ম্যাগনোলিয়া শুধু মুখের দুর্গন্ধই দূর করে না একই সঙ্গে এক প্রকার ব্যাকটেরিয়াও বিনাশ করে, যা দন্তক্ষয়ের জন্য দায়ী। ম্যাগনোলিয়া গাছের বাকলকে পুদিনার সঙ্গে মিশিয়ে চুইংগাম তৈরি করে তা চিবুলে অনাকাক্সিক্ষত অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, ম্যাগনোলিয়া ব্যবহারে সন্ধিবাত ও অ্যাজমা থেকেও পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।
লেখক: বিভাগীয় প্রধান ডেন্টাল ইউনিট
বারডেম ১৫/এ, গ্রিন স্কয়ার
গ্রিন রোড, ঢাকা-১২০৫
ফোন: ০১৮১৯২১২৬৭৮