রাজনীতি

মেননের রাজনীতি : হতাশ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি’ বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের এমন বক্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ তোলপাড় চলছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মেনন নিজেও জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন এমপি। তাছাড়া ক্ষমতাসীন সরকারের বিশেষ মিত্র হিসেবেই মেননকে চেনে এদেশের সাধারণ মানুষ। তাই তার সাম্প্রতিক বক্তব্য ও বক্তব্য ফেরত নেয়ার ঘটনায় সারাদেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ বিস্মিত হয়েছেন।
এ নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠছে, মেনন যেহেতু ‘সাক্ষ্য দিয়ে’ বলছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি সেহেতু তিনিও নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের ভোট ছাড়াই। জনগণের ভোট ছাড়া তিনি নির্বাচিত হলেও কেন এমপি পদ আঁকড়ে আছেন Ñ সে প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। কেন এতদিন তিনি এ কথা চেপে গেছেন এবং কেনই বা এতদিন পর তা আবার জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন, আবার ব্যাপক সমালোচনার পর কেনই বা আবার অবস্থান পাল্টানোর চেষ্টা করছেন?
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও আইনজ্ঞরা বলছেন, আইনি প্রশ্ন এখানে মুখ্য নয়। কারণ আইন ও সংবিধান ধরলে নির্বাচন সংক্রান্ত এই ধরনের বক্তব্যের জন্য ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচিত রাশেদ খান মেননের সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রশ্নটি সম্পূর্ণ নৈতিকতার। জনগণ ভোট দিতে পারেনি Ñ তা প্রমাণের পক্ষে নিজেকে সাক্ষী হিসেবে দাঁড় করানোর কারণে নীতি-নৈতিকতার বিচারে তার সংসদ সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়ানো সমীচীন হবে।
গত ১৯ অক্টোবর বরিশাল নগরীতে ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা কমিটির সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ খান মেনন বলেছিলেন, ‘আমি নিজেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। তারপরও আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, এই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদেও ভোট দিতে পারে না, উপজেলায়ও পারে না।’
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান মেননের এই বিস্ফোরক বক্তব্য ঝড় তোলে রাজনৈতিক অঙ্গনে। প্রতিক্রিয়ায় পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মন্ত্রী হলে মেনন কি একথা বলতে পারতেন?’
১৪ দলের আরেক শীর্ষ নেতা ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে তার মন্তব্য সঠিক নয়। নির্বাচন হয়েছে, ভোটারও ছিল। কাজেই এ নির্বাচনকে অস্বীকারের কোনো উপায় নেই।’
মেননের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে ১৪ দলেও। ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম ইতোমধ্যে বক্তব্যের ব্যাখ্যা চেয়ে মেননকে চিঠি দিয়েছেন। মেনন বলেছেন, দলীয় ফোরামে আলোচনা করে তিনি এই চিঠির ব্যাখ্যা দেবেন।
এছাড়া মেননের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন পর্যন্ত তক্কাতক্কি চলছে। ফেসবুকে অনেকেই মন্তব্য করেছেন, এই বক্তব্য দেয়ার পর মেননের উচিত এমপি পদ থেকে ইস্তফা দেয়া।
সংসদ থেকে মেননের পদত্যাগ করা উচিত কি না কিংবা তিনি এমপি পদে বহাল থাকতে পারেন কি না, এব্যাপারে দেশের আইনজ্ঞরা বলছেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে রাশেদ খান মেননের এই বক্তব্যের কোনো লিগ্যাল দিক নেই। নির্বাচন হয়েছে কি হয়নি সেটা প্রমাণসাপেক্ষ বিষয়। একজন সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন নির্বাচন হয়নি বললেই তো নির্বাচন বাতিল হয়ে যাবে না। আবার উনি যদি বলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে সেটিও প্রমাণ হয়ে যাবে না। বিষয়টা হচ্ছে এখানে তার বক্তব্যের আইনি দিকটা মুখ্য নয়। কেননা কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির একটা মন্তব্যে নির্বাচন বেআইনি হবে না। একইভাবে একটি কারসাজির নির্বাচনকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সুষ্ঠু হয়েছে বলে দাবি করলে সেটি সুষ্ঠু নির্বাচন বলে বিবেচিত হবে না। তবে নীতি-নৈতিকতার বিচারে এই বক্তব্যের পর সংসদ সদস্য পদ থেকে মেননের ইস্তফা দেয়াটা একটা বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হতো। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, নীতি-নৈতিকতা মেনে চলা রাজনীতিকের আজকাল বড়ই আকাল।
বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হলে পরদিনই (২০ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আগের দিনের অবস্থান থেকে সরে মেনন দাবি করে বলেন, ‘আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশবিশেষ উপস্থাপন করায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। একাদশ সংসদের সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতাটি সুখকর নয়। আমার বক্তব্য সম্পর্কে গণমাধ্যম ভুল বার্তা দিয়েছে।’
মেনন এই দাবি করলেও তারা বক্তব্যের ভিডিও ইউটিউব ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এখনও রয়ে গেছে। এমনকি তিনি নিজেও পরবর্তীতে কখনও দুঃখপ্রকাশ করেছেন, কখনও বলেছেন, মুখ ফসকে এই মন্তব্য বের হয়ে গেছে।
রাশেদ খান মেননের এমন মন্তব্যের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতেও সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। দলটির পলিটব্যুরোর প্রবীণ সদস্য ও সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাসের দল থেকে পদত্যাগের পর এবার বিদ্রোহ করলেন দলটির ১১ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পুলিটব্যুরোর আরো ২ সদস্যসহ কেন্দ্রীয় ৬ নেতা। ‘দল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্রমান্বয়ে দক্ষিণপন্থি, বিলোপবাদী ধারায় অধঃপতিত সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতিগ্রস্ত’Ñ এমন অভিযোগ এনে এই ৬ নেতা ২৮ অক্টোবর দলের আসন্ন দশম কংগ্রেস বা জাতীয় সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে মেননের পার্টি আরেক দফা প্রায় নিশ্চিত ভাঙনের মুখে পড়লো।
এদিকে ক্যাসিনোকা-ের পর জুয়ার টাকার ভাগ পাওয়া নিয়ে রাশেদ খান মেননের নাম সামনে চলে আসে। তার গ্রেপ্তার হওয়ার সম্ভাবনার কথাটিও যখন শোনা যাচ্ছিল ঠিক তখনই রাশেদ খান মেনন এ বক্তব্য দিলেন।
জানা যায়, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের চেয়ারম্যান হয়ে রাশেদ খান মেনন ক্যাসিনো থেকে মাসোহারা হিসেবে প্রতি মাসে ৪ লক্ষ টাকা নিতেনÑ ফেসবুকে এমন কথাবার্তা বেশ জোরালোভাবে বলা শুরু হয়। একজন রাজনীতিক হয়ে দুর্নীতিতে নিজেকে এভাবে জড়িয়ে ফেলা সম্পর্কে মানুষ হতাশ হয়ে মন্তব্য করেন, মেনন বাম রাজনীতিকে অসম্মান করেছেন। নৈতিক স্খলনজনিত কারণে তার সংসদ সদস্যপদ ত্যাগ করা উচিত।