খেলা

যে কারণে আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় সাকিব আল হাসান

ক্রীড়া প্রতিবেদক
ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়ে তা না জানানোয় বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে ২ বছরের জন্য (১ বছর স্থগিত) নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে আইসিসি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি তাদের ওয়েবসাইটে অভিযুক্ত বুকি ভারতের দীপক আগরওয়ালের সঙ্গে সাকিবের হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটও শেয়ার করেছে।
আইসিসির ৭ পৃষ্ঠার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৯ জানুয়ারি সাকিব সেদিনের খেলায় (বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ) ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ হওয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপে শুভেচ্ছাবার্তা পান আগরওয়ালের কাছ থেকে। ওই মেসেজের সঙ্গে আগারওয়াল আরো একটি মেসেজ করেন, ‘আমরা কি এখনই কাজ শুরু করব নাকি আমি আইপিএল পর্যন্ত অপেক্ষা করব?’
ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, স্পষ্টতই বোঝা যায়, ওই মেসেজে ‘কাজ’ করা বলতে আগরওয়ালকে তথ্য সরবরাহ করা বোঝাচ্ছে।
আগরওয়ালের সঙ্গে এই যোগাযোগের কথা সাকিব আইসিসির দুর্নীতি দমন শাখা বা অন্য কোনো দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের কাছে জানাননি। সাকিবের সঙ্গে ওই একই বুকি ২০১৮ সালের আইপিএলে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ বনাম কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের ম্যাচের সময় যোগাযোগ করেন । ওই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সেই সময় অভিযুক্ত বুকি জানতে চেয়েছিলেন, একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড় সেদিনের ম্যাচে খেলবেন কি-না।
এসবের কিছুই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাননি সাকিব, ফলে শাস্তিও এড়াতে পারেননি।
এদিকে আইসিসির নিষেধাজ্ঞায় সাকিবের পক্ষে ও বিপক্ষে আলোচনার ঝড় বইছে। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়ে তা গোপন করায় দুই বছরের নিষেধাজ্ঞায় পড়া সাকিব আল হাসানের শাস্তিটা কম হয়ে গেছে বলে মনে করেন মাইকেল ভন। ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়কের মতে, এই শাস্তিটা আরও বড় হওয়া উচিত ছিল।
২২ অক্টোবর এক বিবৃতিতে সাকিবকে ২ বছরের শাস্তি দেয় আইসিসি। বিবৃতিতে তারা জানায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৪ মাসের মধ্যে ৩ বার সাকিবের কাছে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব আসে। কোনোবারই এ বিষয়ে আইসিসিকে কিছু জানাননি সাকিব।
নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচ পাতানোর প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গে আইসিসি বা সংশ্লিষ্ট বোর্ডকে জানাতে হয়। তা না হলে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী পড়তে হয় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের নিষেধাজ্ঞায়। আইসিসির নিয়মের বরখেলাপ করায় ২ বছরের নিষেধাজ্ঞায় পড়তে হলো সাকিবকে। দোষ স্বীকার করায় এর মধ্যে ১ বছরের শাস্তি স্থগিত থাকবে।
এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ২০২০ সালে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ টি-টোয়েন্টি ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে পারবেন না সাকিব।
বাংলাদেশের তারকা ক্রিকেটারের এমন শাস্তিতে মোটেও বিচলিত হচ্ছেন না ভন, বরং শাস্তিটা আরও কড়া হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি। টুইটারে ইংল্যান্ডের সাবেক তারকা ক্রিকেটার ভন লিখেন- ‘সাকিব আল হাসানের জন্য একটুও সমবেদনা নেই, কোনো সমবেদনা নেই। বর্তমান যুগে খেলোয়াড়রা কী করতে পারবে, কী করতে পারবে না এসব ব্যাপারে সব সময় বলা হয়। কোন কোন বিষয় সরাসরি জানাতে হবে সেসবও বলা হয়। দুই বছর পর্যাপ্ত না, আরো বড় শাস্তি হওয়া উচিত ছিল।’
এদিকে, নিষেধাজ্ঞা পাওয়ার পর মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটি থেকেও পদত্যাগ করেছেন সাকিব। এই কমিটির চেয়ারম্যান মাইক গ্যাটিং এক বিবৃতিতে এ খবর নিশ্চিত করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘এই কমিটি থেকে সাকিবকে হারানো দুঃখজনক। গত কয়েক বছরে এখানে তিনি অনেক অবদান রেখেছেন। ক্রিকেটের চেতনার অভিভাবক হিসেবে আমরা তার পদত্যাগকে সমর্থন করি। বিশ্বাস করি, এটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল।’
২০১৭ সালের অক্টোবরে এমসিসি-র ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটিতে যোগদান করেন সাকিব। সিডনি ও ব্যাঙ্গালুরুতে অনুষ্ঠিত এই কমিটির দুটি সভাতেই উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের তারকা এই অলরাউন্ডার।
ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট কমিটি একটি স্বাধীন কমিটি; সারা বিশ্বের বর্তমান ও সাবেক ক্রিকেটার ও আম্পায়াররা এর সদস্য। ক্রিকেটে নিয়ম সম্পর্কিত নানা ইস্যু নিয়ে বছরে দুইবার সভায় মিলিত হয় এই কমিটি।
সাকিব আল হাসানের সমালোচনা করেছেন পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার রমিজ রাজাও। তার মতে, এই শাস্তি ক্রীড়াপ্রেমী ও ক্রীড়াবিদদের জন্য ভালো একটি শিক্ষা। বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারের এই শাস্তিটাকে যথার্থই বলছেন তিনি।
এ ব্যাপারে রমিজ রাজা টুইটারে লিখেছেন, ‘সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞা সকল ক্রীড়াপ্রেমী ও ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি শিক্ষা। আপনি যদি খেলাটাকে অবজ্ঞা করেন, নিয়মকানুন পাশ কাটিয়ে খেলার চেয়ে বড় হওয়ার চেষ্টা করেন সেক্ষেত্রে অসাধারণ একটি পতনের জন্য আপনি প্রস্তুত থাকুন! এমনটা দুঃখজনক।’
অপরদিকে সাকিবের শাস্তিকে ‘লঘু পাপে গুরু দ-’ বলে অভিহিত করেছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক রাহুল দ্রাবিড়। শাস্তি কমাতে আইসিসির প্রতি আহ্বানও জানিয়েছেন রাহুল।
এই অপরাধে সাকিবের শাস্তি কিছুটা কঠোর হয়ে গেছে বলে মনে করেন দ্রাবিড়। এ ব্যাপারে টুইটে তিনি লিখেছেন, ‘অবিশ্বাস্য! সাকিবের শাস্তিটা কি কঠিন হয়ে গেল না? সে কি ফিক্সিংয়ে জড়িত ছিল? আমি মনে করি, তার একটাই ভুল সে আইসিসি ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রস্তাবটি জানায়নি। এ জন্য দুই বছরের শাস্তি অনেকটা কঠোর। আমি আশা করি, আইসিসি এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে।’