আন্তর্জাতিক

লাদেনের পর বাগদাদি হত্যা: ওবামার পথে হাঁটলেন ট্রাম্প

নিজস্ব প্রতিবেদক
২৭ অক্টোবর ২০১৯ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ‘পৃথিবীর এক নম্বর সন্ত্রাসী বাগদাদি এখন মৃত’।
২০১১ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অনুরূপ একটি ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, ‘পৃথিবীর শীর্ষ সন্ত্রাসী ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।’
আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে তার লাশ সমুদ্রে ফেলে দেয়ার আদেশ দিয়েছিলেন ওবামা। অপরদিকে আইএস প্রধান আবু বকর আল বাগদাদিকে হত্যার পর তার লাশও সমুদ্রে ফেলে দেয়ার আদেশ দেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলীয় প্রেসিডেন্ট, অপরদিকে ওবামা ছিলেন ডেমোক্রেট দলীয়। দু’দলের মধ্যে প্রায় সাপে-নেউলে সম্পর্ক। কিন্তু সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে মানুষ হত্যা করে লাশ স্বজনদের না দিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেয়ার ক্ষেত্রে ওবামার পথেই হাঁটলেন ট্রাম্প।
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে মার্কিন বাহিনীর রাত্রিকালীন অভিযানের বর্ণনা দিয়ে ট্রাম্প জানান, অভিযানের তীব্রতায় কোণঠাসা হয়ে যাওয়ার পর আইএস নেতা বাগদাদি এক আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিজেকে উড়িয়ে দেন।
ট্রাম্প বলেন, ২৬ অক্টোবর রাতটি যুক্তরাষ্ট্র এবং পৃথিবীর জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত। একজন কুখ্যাত খুনি, যিনি বহু ভোগান্তি এবং মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মোস্ট ওয়ান্টেড এই সন্ত্রাসীকে খুঁজে বের করার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সমাপ্ত হয়েছে। ২০১৪ সালে সে ইরাক ও সিরিয়ায় তথাকথিত ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছিল।
২০১১ সালের মে মাসে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আল-কায়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৮ বছরেরও বেশি সময় পর এ ধরনের আরেকটি সাফল্যের কথা ঘোষণা করলেন ট্রাম্প।
বাগদাদির মৃত্যু সম্পর্কে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক অ্যাসপার বলেন, আইএস-এর ওপর এটি একটি বিধ্বংসী আঘাত। তিনি শুধু এই দলটির নেতাই নন, প্রতিষ্ঠাতাও বটে। বহুভাবেই তিনি আইএস-এর অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন। ২০১৪ সালে তিনি আইএসআইএস প্রতিষ্ঠা করেন। তাই বাগদাদির মৃত্যু নিঃসন্দেহে আইএস-এর ওপর একটি মারাত্মক আঘাত।
ট্রাম্পের বর্ণনা অনুযায়ী, বাগদাদি হত্যার গুপ্ত অভিযানটি শুরু হয় আমেরিকার সময় ২৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৫টার দিকে। অভিযানে অংশ নেয়া ৮টি হেলিকপ্টারে ছিল মার্কিন সেনাদের একটি এলিট ফোর্স। এই দলের সঙ্গে মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের অপারেটররাও ছিলেন। একটি বন্ধুর বিপজ্জনক এলাকার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টারগুলো ঠিক ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট ধরে উড়ে যাওয়ার পর কাক্সিক্ষত স্থানটির দেখা পায়। এই অভিযানে সহযোগীর ভূমিকায় ছিল আরও বেশ কয়েকটি বিমান।
ট্রাম্প বলেন, আমাদের দলটি খুব নিচু এলাকা দিয়ে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে যায়। এটা ছিল অভিযানের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মুহূর্ত। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোর আগে কয়েকটি জায়গা থেকে বহরটিকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হয়। মার্কিন বিমানগুলো পাল্টা গুলি ছুড়ে তাদের প্রতিহত করে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে দেখা মেলে বাগদাদির বাসস্থানের। এক্ষেত্রে কোনো ফাঁদে যেন না পড়তে হয়, সেজন্য সরাসরি গেট দিয়ে প্রবেশ না করে কম্পাউন্ডটির দেয়াল টপকে প্রবেশ করে মার্কিন সৈন্যরা। কম্পাউন্ডের ভেতরে বেশ কিছু আইএস যোদ্ধার মুখোমুখি হতে হয় তাদের। ওই যোদ্ধাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করে একে একে প্রায় সবাইকে হত্যা করে এলিট ফোর্স। কম্পাউন্ডের ভেতর থেকে ২ জন আইএস যোদ্ধা এবং ১১টি শিশুকে আটক করা হয়। অপারেশনে বাগদাদির দু’জন স্ত্রী নিহত হয়। তাদের শরীরে আত্মঘাতী বোমা বাঁধা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত এগুলো অবিস্ফোরিতই থাকে।
অভিযান চলার সময় বাগদাদি একটি গর্তের শেষ প্রান্তে গিয়ে আশ্রয় নেন। তার শরীরে আত্মঘাতী বোমা বাঁধা ছিল। সঙ্গে ছিল তার তিন সন্তান।
বাগদাদির অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, আমাদের বাহিনীভুক্ত কুকুরগুলোর তাড়া খেয়ে গর্তটির শেষ প্রান্তে গিয়ে অবস্থান নেন তিনি। এ সময় তিনি তার গায়ে থাকা আত্মঘাতী বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটান। এতে তিন সন্তানসহ তিনি প্রাণ হারান। তার শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় বিস্ফোরণে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেন, বাগদাদি হত্যার মিশন থেকে অনেক স্পর্শকাতর বস্তু ও তথ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো আইএস-এর অনেক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এসবের মধ্যে আছে তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং অস্তিত্ব বিষয়ক নানা তথ্য। যেগুলো আমরা হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম।
বাগদাদি হত্যার অভিযানটি পরিচালনা করতে গিয়ে পর্দার আড়ালেও নানা ঘটনা ঘটেছে। হোয়াইট হাউজে বসে অভিযানটি সরাসরি দেখেছেন ট্রাম্প। অভিযান শুরুর প্রাক্কালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাসপার, জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান মার্ক মিলি এবং অন্য সামরিক কর্মকর্তারা হোয়াইট হাউজের সিচুয়েশন রুম বা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে হাজির হন। ওখানে বসেই তারা অভিযানের প্রতি মুহূর্তের অবস্থা জানতে পারছিলেন।
ট্রাম্প বলেন, এটি ছিল সিনেমা দেখার মতোই একটি ঘটনা। বাগদাদির জীবনের শেষ মুহূর্তের ভিডিওটি প্রকাশ করা হবে বলেও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
হোয়াইট হাউজ থেকে প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, উৎকণ্ঠিত প্রেসিডেন্টের চারপাশ ঘিরে আছেন কয়েকজন প্রথম সারির সামরিক কর্মকর্তা। সিচুয়েশন রুমে অবস্থান না করলেও অন্য জায়গা থেকে অপারেশনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন সিআইএ পরিচালক জিনা হ্যাসপেল এবং ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জো ম্যাগুইর। অভিযানের পরিকল্পনা জিনা ও ম্যাগুইরের দিকনির্দেশনায়ই করা হয়।
২০১১ সালে যখন আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করা হয়, সে সময়ের সিআইএ পরিচালক লিও প্যানেট্টাও একই কাজ করেছিলেন।
রাজনৈতিকভাবে ওবামা ও ট্রাম্পের মধ্যে অনেক মতপার্থক্য থাকলেও মানুষ হত্যা করে লাশ সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সিআইএ-র পরিকল্পনা অভিন্ন। লাদেনকে হত্যার জন্য ওবামা যেভাবে সিআইএকে ব্যবহার করেছিলেন, বাগদাদিকে হত্যার জন্য ট্রাম্প একই কায়দায় সিআইএকে ব্যবহার করলেন। আমেরিকার স্বার্থে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটরা যে এক রাস্তায়ই হাঁটে, লাদেন ও বাগদাদির হত্যা তা-ই স্মরণ করিয়ে দেয়।