ফিচার

সুন্দর চরিত্র গঠনে নৈতিক শিক্ষা

স্বদেশ খবর ডেস্ক
সৃষ্টিকর্তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হলো মানবজাতি। আর এই মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান অলংকার হলো তার চরিত্র। মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে ব্যক্তি উত্তম চরিত্রের অধিকারী। একজন চরিত্রবান মানুষই পারে তার স্বচ্ছ, নির্মল, সৎ চিন্তাধারা দিয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র চারিদিকেই শান্তির ডানা ছড়িয়ে দিতে।
এই সুন্দর চরিত্র গঠনের জন্য যে শিক্ষার প্রয়োজন তার মূল শিক্ষাই হলো নৈতিক শিক্ষা। এই শিক্ষা আমাদেরকে শিষ্টাচার, ভদ্রতা, শালীনতা, মায়া-মমতা, ভালোবাসা, সৎ, মানবতার শিক্ষা দেয়, যা কী না একজন আদর্শবান মানুষ এবং একজন সফল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে।
জীবনে সফলতার মুখ দেখার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অন্তহীন। নৈতিক শিক্ষা ছাড়া তা সম্ভব নয়। এককথায় মানবজীবনকে সুশৃঙ্খল করতে যে শিক্ষার প্রয়োজন সেটাই হলো নৈতিক শিক্ষা।
প্রতিটি ধর্মেই মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। একটি মানব সন্তান কখনোই কোনো পাপ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। কিন্তু বড় হয়ে যদি সে কোনো অপরাধমূলক কর্মকা- করে থাকে তবে নৈতিক শিক্ষার অভাবেই তা হয় এবং এর জন্য সম্পূর্ণ দায়ী হলো তার পরিবার ও সমাজ।
জন্ম দিলেই বাবা-মা হওয়া যায় না। শিশুর জন্মের পর বাবা-মায়ের দায়িত্ব অনেক বেশি বেড়ে যায়। একটি গাছের চারাকে যেভাবে যতœ করে বড় করা হবে, সে গাছটি তেমন সুন্দর ফল দেবে। জন্মলগ্ন থেকে একটি শিশুকে সুস্থ, সুন্দর, মুক্ত মনমানসিকতায় গড়ে তোলার দায়িত্ব সম্পূর্ণই বাবা-মায়ের ওপর বার্তায়। সন্তান আর বাবা-মায়ের সম্পর্ক যতো মধুর হবে তাদের মধ্যে ভালোবাসাও ততো মজবুত হবে।
আবার শিশুটির দিনের অনেকটা সময় কাটে শিক্ষাঙ্গনে। শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। তাই শিক্ষকদের দায়িত্বও কম নয়। এই ছাত্রদের উত্তম মানুষ গড়ার ক্ষেত্রে তাদেরও অবশ্যই একটি বিশেষ বড় ভূমিকা রয়েছে। ভয় নয়, বরং বন্ধুসুলভ আচরণই হবে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। শিক্ষা মানে শুধু সার্টিফিকেট অর্জন করা না। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, বিবেকবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করতে হবে। যদি কারোর মধ্যে নৈতিক শিক্ষা না থাকে তবে কিভাবে সে সঠিক ও ভুল এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয় করবে?
আমাদের শিশুরা এই শিক্ষাগুলো কতটুকু পাচ্ছে? বর্তমানে এ নৈতিক শিক্ষা একটি বিরাট প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর যাদের কাছ থেকে এই নৈতিক শিক্ষাগুলো পাবার কথা তারাই বা কতটুকু এই শিক্ষায় শিক্ষিত? যে শিক্ষা মানুষকে সৎ, বিশ্বাসী, চরিত্রবান, আদর্শবান, ভালো মানুষ করতে পারে না, সে শিক্ষার কী-ই বা মূল্য আছ?
একটি শিশু কখনোই ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা রাখে না। সন্তান যদি নিজ পরিবারে দেখে বাবা-মায়ের সম্পর্কে ফাটল, বাবা দুর্নীতিগ্রস্ত, নেশাগ্রস্ত, অমানবিক কর্মকা-ে জড়িত, মা পরকীয়া, অসামাজিক কাজে লিপ্ত, শিক্ষক রক্ষক না হয়ে যদি হয় ভক্ষক, অশালীন আচরণ করে, তাহলে তো এমন অসুস্থ পরিবেশে বেড়ে ওঠা একটি শিশুর ভেতরের মনুষ্যত্ব প্রতিদিনই একটু একটু করে হরণ হয়ে সেও একদিন অসৎ চরিত্রের মানুষে পরিণত হবে। এই সন্তানেরা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে বিভিন্ন রকমের বিশৃঙ্খলা, যেকোনো অনৈতিক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়বে।
এসবের ফলস্বরূপ ঘটছে একটার পর একটা অপরাধ। বেড়েই চলেছে দুর্নীতি, ঘুষ, ছিনতাই, প্রতারণা, ধর্ষণ, হত্যা। সন্তানের হাতে পিতামাতা, পিতামাতার হাতে সন্তান খুন। এই অপরাধগুলো শুধু যে অশিক্ষিতরাই করছে তা কিন্তু নয়, শিক্ষিত উচ্চশিক্ষিতদের দ্বারাও সংঘটিত হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রী, ছাত্র কর্তৃক শিক্ষিকার শ্লীলতাহানির মতো নিকৃষ্ট ঘটনাও ঘটছে অহরহ। এই বর্বরতা থেকে আমাদের শিশুরাও নিরাপদ নেই। ছাত্র দ্বারা শিক্ষককে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও কম নয়। অথচ অভিভাবক হিসেবে পিতামাতার পরই শিক্ষকের স্থান। এই সবকিছুর পেছনে ঐ একটাই কারণ, তা হলো মনুষ্যত্বের অভাব আর এই অভাব এসেছে তার নৈতিক শিক্ষা না-পাওয়া থেকে।
এখন সবাই যুগের সাথে তাল মিলিয়ে, পাপ-পূণ্যের বিচার না করে কে কাকে টেক্কা দিয়ে উপরে উঠবে এই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে। চাহিদা বাড়ছে দিনের পর দিন। যান্ত্রিক জীবনে ব্যস্ততার অজুহাতে পরিবারের একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে মায়া-মমতা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। অস্থিরতা বাড়ছে, ফলে আমাদের সোনার সন্তানেরা সহজেই পথভ্রষ্ট হয়ে অনৈতিক কাজ এমনকি আত্মহুতির মতো মহাপাপেও লিপ্ত হচ্ছে।
আর দেরি নয়, আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনতে হবে এই অভিশপ্ত জীবন থেকে। তাই প্রথম পদক্ষেপই নিতে হবে নিজ পরিবার থেকে। অভিভাবকদের সৎ থাকতে হবে। নিজেকে ভালোবাসা, পরিবারে একে অপরের প্রতি সম্মান, স্নেহ, ভালোবাসা শেখাতে হবে। সন্তানদের বাহিরমুখী থেকে ঘরমুখী করাতে হবে। সঠিক রীতিনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মীয় শিক্ষায় লালন করে শিশুদের গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাঙ্গন, সমাজ সর্বস্তরে সুশিক্ষার বীজ রোপণ করতে হবে। তবেই আমাদের সন্তানেরা পরিবার, সমাজ, দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে পারবে। ভালোমন্দ বিচার করে নিজেরাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।