প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

জেলহত্যা দিবসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : জাতির পিতা এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকা-ের পেছনে স্বাধীনতাবিরোধীরাই জড়িত

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
যথাযোগ্য মর্যাদায় ৩ নভেম্বর রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে জেলহত্যা দিবস পালিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীরসেনানী ও জাতীয় চার নেতাকে যথাযথ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত এই কালো অধ্যায়টিকে স্মরণ করেছে দেশবাসী।
পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যার পর দ্বিতীয় কলঙ্কজনক অধ্যায় জাতীয় চার নেতা হত্যার দিনটি। পনেরই আগস্টের ৩ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও এম মনসুর আলীকে এই দিনে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠনের উদ্যোগে সারাদেশে শোকাবহ এই দিবসটি পালিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু ভবন ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে দলের শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন ও কালো ব্যাজ ধারণের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মসূচি শুরু হয়।
এদিন রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
এছাড়া আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, আবদুল মতিন খসরু ও সাহারা খাতুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও আনোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমতউল্লাহ, মহানগর দেিণর সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
জাতির পিতা এবং জাতীয় চার নেতা হত্যাকা-ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় স্বাধীনতাবিরোধীদের অভিযুক্ত করে বলেন, বাংলার মাটিতে রাজাকার, খুনি এবং তাদের দোসরদের কোনো স্থান হবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষকে সেভাবেই চিন্তা করতে হবে, এই দেশ যেন আবারো ওই খুনিদের রাজত্ব না হয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিধারা যেন অব্যাহত থাকে। গণতান্ত্রিক ধারা যেন ব্যাহত না হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেছে, শহীদ হয়েছে, যাদের মহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতা কখনো ব্যর্থ হতে পারে না। ব্যর্থ হয় নাই এবং ভবিষ্যতেও কেউ তা ব্যর্থ করতে পারবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও খুনিদের এদেশে বিচার হয়েছে, সাজা হয়েছে। এদের যারা দোসর বা ষড়যন্ত্রকারী হয়ত আজকে আমরা তাদের বিচার করে যেতে পারলাম না বা হয়ত আমরা চেষ্টা করবো বা আগামীতে যারা আসবে, কোনো না কোনো দিন, এই ষড়যন্ত্রকারীরাও একসময় ধরা পড়বে। তাদের এই রহস্য অবশ্যই উদ্ঘাটন হবে। কারণ ইতিহাস কখনও মুছে ফেলা যায় না।
শেখ হাসিনা বলেন, কেউ না কেউ এই বিচার করবে। কারণ ঘাতক দল যখন বঙ্গবন্ধুর নাম এদেশ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল তখন তারা ভেবেছিল কোনোদিন আর এই নাম ফিরে আসবে না। কিন্তু তা হয়নি। ২১ বছর পর আবার ফিরে এসেছে। আবারও সময় আসবে আমাদের এবং এই দেশ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর হবে।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ থাকাকালীন তাঁর নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন তাঁরই ঘনিষ্ঠ সহচর এবং জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান। ১৯৭৫ এর ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাতের আঁধারে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তাঁদেরকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা অবস্থায় এমন নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাকা- বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই দেশের মানুষ সারাজীবন বঞ্চিত থাকবে, ুধার্ত থাকবে, অবহেলিত থাকবে Ñ সেটাই চেয়েছিল বিএনপি। একটা দল যার চেয়ারপারসন (খালেদা জিয়া) এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করে জেলে, আবার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান যাকে করলো (তারেক রহমান), সে আরেক সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।
প্রধানমন্ত্রী ােভের সঙ্গে এসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্তদের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তুলে, কঠোর ভাষায় তাদের সমালোচনা করে বলেন, আমি জানি না যারা বিএনপি করেন তাদের কোনো মেরুদ- আছে কি না সেটাই আমার সন্দেহ। তারা শুধু মায়াকান্না কাঁদে।
শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে আমরা বার বার মতায় এসেছি বলেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে তাদের ফাঁসির রায় কার্যকর করতে পেরেছি। জাতির পিতার হত্যাকা-ের বিচার করে তার রায়ও কার্যকর করতে পেরেছি।
৩ নভেম্বরের জেল হত্যার বিচার হয়েছে এবং এখনও যেসব খুনি এখানে-সেখানে পালিয়ে আছে তাদেরও খোঁজখবর করা হচ্ছে। ১৫ আগস্ট যখন বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করা হয়েছিল তখন অনেকে ভেবেছে পরিবারকে নিঃশেষ করার জন্যই এ হত্যাকা-। কিন্তু ৩ নভেম্বর যখন জেলখানায় চার নেতাকে হত্যা করা হলো তখন বাংলার মানুষ পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিল এটা সম্পূর্ণ স্বাধীনতাবিরোধীদের কাজ। তারা একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, খন্দকার মোশতাকের নির্দেশে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় কারাগারে অস্ত্র নিয়ে ঢোকা যায় না। কিন্তু তারা অস্ত্র নিয়ে ঢুকেছিল। গণভবন থেকে সেই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যেভাবে ঢুকতে চায়, সেভাবেই যেন ঢুকতে দেয়া হয়।
তিনি বলেন, জিয়া এই ষড়যন্ত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল বলেই মোশতাক যখন রাষ্ট্রপতি হলো, নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা দিয়েই জিয়াউর রহমানকে বানালো সেনাপ্রধান। কাজেই মোশতাকের পতনের সাথে সাথে জিয়ার হাতে সমস্ত মতা চলে গেল।
ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতা হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করা, খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করাসহ বহুদলীয় গণতন্ত্রের নামে জিয়ার কারফিউ দিয়ে দেশ শাসনের নামে চলা দুঃশাসনের বিভিন্ন ঘটনাবলিও এ সময় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এর আগে দিবসটি উপলে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে রতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের পর মহান জাতীয় নেতৃবৃন্দের সম্মানে তিনি সেখানে কিছুণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনা দলের কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করেন।
এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, সভাপতিম-লীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, ড.আবদুর রাজ্জাক ও আবদুল মতিন খসরু, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আব্দুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী এবং প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বাহাউদ্দিন নাছিম, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এনামুল হক শামীম ও মুহিবুল হাসান চৌধুলী নওফেল, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দীসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, যুব মহিলা লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি অন্যান্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
দলীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ রাজধানীর বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদ ও জাতীয় চার নেতার কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। বনানী কবরস্থানে পবিত্র ফাতেহা পাঠ, মিলাদ মাহফিল ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ছাড়াও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশগ্রহণ করেন।
জাতীয় চার নেতার মধ্যে এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে রাজশাহীর কাদিরগঞ্জে তার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। দিবসটি উপলে সেখানেও অনুরূপ কর্মসূচি পালিত হয়। এছাড়াও জেলহত্যার ঘটনায় নিহত ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীসহ অন্য শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনায় আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের ধানমন্ডি বাসভবনে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।