ফিচার

ঢাকা লিট ফেস্টে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার প্রয়াস

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল’ বা ঢাকা লিট ফেস্ট উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় উৎসবের আয়োজন করেছে যাত্রিক। এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে লিট ফেস্টের নবম আসর। ভেন্যু বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। ৭ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজন চলে ৯ নভেম্বর পর্যন্ত।
লিট ফেস্টের প্রথম দিনে সমকালীন সাহিত্যের দাবি, দায় ও প্রবণতাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। উদ্বোধনী মঞ্চে ছিল ধ্রুপদী নাচের পরিবেশনা। নৃত্যসংগঠন সাধনা-র শিল্পীদের পরিবেশনা উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দেয়। পরে ছিল আলোচনা পর্ব। এ পর্বের প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এ সময় আয়োজক প্রতিনিধি ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মনিকা আলী ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী।
উৎসব উদ্বোধন করে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী বলেন, লিট ফেস্ট-এর আগে ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ নামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেটির মাধ্যমে বহির্বিশ্বের সাহিত্যকে বাংলাদেশে পরিচিত করানোর চেষ্টা আমরা দেখেছি। আর এখন বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। আগামী বছর এ আয়োজনের শ্রী ও মান আরও বৃদ্ধি করতে মন্ত্রণালয় উদ্যোগী হবে বলে জানান তিনি।
সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারের ১১ লাখ নাগরিক বর্তমানে আমাদের আশ্রয়ে আছে। তাদের লালনপালন করা আমাদের জন্য এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত মানুষের চাপে আমাদের সমাজ-সংস্কৃতি তিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় উৎসবে যোগ দেয়া বিদেশি অতিথিদের নিয়ে সমস্যাটি আলোচনা করা ও আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরে প্রতিকার পাওয়ার পরামর্শ দেন প্রতিমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে ম্যানবুকারের জন্য সংপ্তি তালিকায় মনোনীত সাহিত্যিক মনিকা আলী বলেন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হলেও এবারই প্রথম বাংলাদেশে এসেছি আমি। এসে ভীষণ সম্মানিত বোধ করছি। উৎসবে বিভিন্ন দেশের মানুষ আসছেন। একটা আদান-প্রদান হচ্ছে। একে অন্যকে জানছে। এর ফলে ভালো কিছু হবে।
আয়োজকদের পে ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ বলেন, আমরা উৎসবটি আয়োজন করি চিন্তার উৎসব হিসেবে। দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এই উৎসবকে সরব ও সবল করে তোলে। আমাদের গভীর আশা, এই বিশাল বাংলা এবং তার গোটা জনবল একদিন মুক্তচিন্তার বিশাল, সুদৃঢ় পাটাতনে পরিণত হবে।
আয়োজকদের পে সাদাফ সায বলেন, বই ও কবিতা একজন মানুষের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আমরা তিন পরিচালক শব্দ ও আইডিয়ার শক্তিতে বিশ্বাস করি। এটি আমাদের উৎসব আয়োজনে অনুপ্রেরণা জোগায়।
লিট ফেস্টে দেশের সমকালীন লেখক-কবিদের বড় একটি অংশ যোগ দিয়েছে। বিদেশি অতিথিদের ঘিরেও কৌতূহলের শেষ নেই। স্ব স্ব েেত্র খ্যাতিমান ব্যক্তিত্বরা আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন।
জানা যায়, সব মিলিয়ে লিট ফেস্টে ৫ মহাদেশের ১৮ দেশ থেকে শতাধিক বিদেশি এবং ২ শতাধিক বাংলাদেশি সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক ও রাজনীতিক অংশগ্রহণ করছেন। বিভিন্ন সেশনে অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন তারা।
উৎসবের বিদেশি অতিথিদের তালিকায় আছেন পুলিৎজার বিজয়ী লেখক জেফরি গেটলম্যান, ডিএসসি পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক এইচএম নকভি, ইতিহাসভিত্তিক লেখক উইলিয়াম ডালরিম্পল, ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও লেখক শশী থারুর, কবি তিশানি দোশি, সাহিত্যিক স্বপ্নময় চক্রবর্তী, কবি ও সাংবাদিক মৃদুল দাশগুপ্ত প্রমুখ।
আয়োজক সূত্র জানায়, উৎসবে প্রায় ৯০টি সেশন ছিল। নানা বিষয়ে সরাসরি আলোচনা যেমন হয়, তেমনি ছিল পর্যালোচনার সুযোগ। দর্শক-শ্রোতারা সাহিত্যিকদের প্রশ্ন করেন। নিজের মন্তব্য তুলে ধরেন।
এবারের ঢাকা লিট ফেস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন ৮ নভেম্বর প্রদর্শিত হয় বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ওপর নির্মিত ডকু ফিল্ম ‘হাসিনা: অ্যা ডটার্স টেল’। চলচ্চিত্রটির নির্মাতা পিপলু খান তার নির্মাণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এদিন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা কৌশিক মুখার্জীও কথা বলেন তার চলচ্চিত্র নিয়ে।
উৎসবের সমাপনী দিন ৯ নভেম্বর পর্দা নামে ৩ দিনের এই আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলনের। আয়োজন শেষ হয় দণি ভারতীয় সাংবাদিক তিশানি দোশির আবৃত্তি ও নৃত্যনাট্য দিয়ে। এরপর বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী, সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান, উৎসব পরিচালক সাদাফ সায ও ব্রাজিলিয়ান লেখক মারিয়া ফিলোমেনা বইসো লেপেস্কি।
সমাপনী দিনের সকাল শুরু হয় ইসকনের সংগীতদলের ভজন-কীর্তন দিয়ে। সকালে নজরুল মঞ্চে ‘সাগর তীরে’ নামে একটি শিশুতোষ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। পরে লেখক নাজিয়া জেবীন বই থেকে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান। একই মঞ্চে ‘দ্য এলিফ্যান্ট ইন দ্য রুম’ বইয়ের লেখক নন্দিতা খান বইটি থেকে শিশুদের গল্প পড়ে শোনান। এসময় লনে রিভাইভিং দ্য আর্ট অব স্টোরি টেলিং শীর্ষক শিশুতোষ আলোচনায় মাদিহা মোরশেদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ চিত্রকর ও অ্যানিমেটর কার্টিস জবলিং, চাইল্ড স্পেশালিস্ট ফ্রান হুরলি, নিউরোসায়েন্টিস্ট নাইলা জামান খান ও সাজিয়া জামান। অপরদিকে বাংলা একাডেমির কসমিক টেন্টে ‘পাওয়ার অব পিকচার’ সেশনে উপস্থিত ছিলেন গ্রাফিক নভেলিস্ট ও কার্টুনিস্ট ফাহিম আঞ্জুম এবং চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপননির্মাতা আবরার আখতার। সঞ্চালক ছিলেন কার্টুনিস্ট সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময়।
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক জেফরি গেটেলম্যান তার বই ‘লাভ, আফ্রিকা: অ্যা মেমোয়ার অব রোমান্স, ওয়ার অ্যান্ড সারভাইভাল’ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন। ‘লাভ, আফ্রিকা’ শীর্ষক সেশনটি সঞ্চালনা করেন জাফর সোবহান।