প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

বাংলাদেশ কৃষক লীগের ১০ম সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : কৃষি ও কৃষকের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে শিল্পায়ন পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষক লীগের দশম জাতীয় সম্মেলনে দীর্ঘদিন নেতৃত্বে থাকা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক দু’জনই বাদ পড়েছেন। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন কৃষক লীগের নতুন সভাপতি হয়েছেন কৃষিবিদ সমীর চন্দ্র চন্দ আর সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন সংরতি আসনের সাবেক সংসদ সদস্য উম্মে কুলসুম স্মৃতি। নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে আগামী ৭ দিনের মধ্যে কৃষক লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি কেন্দ্রে জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
সম্মেলন উদ্বোধন করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান সরকার কৃষি ও কৃষকদের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েই শিল্পায়ন পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে। আমরা উন্নত হব, শিল্পায়নে যাব; কিন্তু কৃষি ও কৃষককে অবজ্ঞা করে নয়। কারণ কৃষিই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। খাদ্য দেয়, পুষ্টি দেয়, সবকিছু করে।
এর আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্মেলনস্থলে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। পরে জাতীয় সঙ্গীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা এবং কৃষক লীগের দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন তিনি। শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি। সম্মেলনস্থলে দেশাত্মবোধক ও কৃষক লীগের দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। এছাড়া সংগঠনের সাময়িকী ‘কৃষকের কণ্ঠ’-এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ করা হয়। এছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সকল গণআন্দোলনের শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
কৃষক লীগের সভাপতি মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার সামসুল হক রেজা, সর্বভারতীয় কিষাণসভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার অঞ্জন উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬ নভেম্বর বাংলাদেশ কৃষক লীগের ১০ম সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, একটি দেশের জন্য, একটি সমাজের জন্য কৃষি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের উন্নয়ন এখনো কৃষির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই কৃষি জমি নষ্ট করে কোনো স্থাপনা, শিল্প-কারখানা করা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী প্রাতিষ্ঠানিক শিার পর অনেকের কৃষিকাজ করতে না চাওয়ার প্রবণতার সমালোচনা করে বলেন, অনেকে লেখাপড়া শিখলেই আর মাঠে যেতে চায় না। কৃষক বাবা ছেলেকে কৃষিকাজ করে লেখাপড়া শিখিয়েছে। তার ছেলেমেয়ের অবশ্যই মাঠে যাওয়া উচিত। নিজের কাজ নিজে করায় লজ্জার কিছু থাকে না।
এ বিষয়ে কৃষক লীগের একটা ভূমিকা থাকা দরকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি আমাদের স্কুলজীবন থেকে এটা অভ্যাস করা দরকার।’
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে ১৮ জন কৃষককে গুলি করে হত্যার ঘটনা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখনই সরকারে এসেছে সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রথম কেবিনেট মিটিংয়ে সারের দাম কমিয়ে দিলাম। প্রায় চার দফা আমরা কমিয়েছি। আমরা ভর্তুকি দিচ্ছি।’
কৃষিতে ভর্তুকির েেত্র বিশ্বব্যাংকসহ বিদেশি দাতা সংস্থার বাধা দেয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি তাদের বলেছি, আপনাদের টাকা লাগবে না, নিজের টাকায় কৃষিতে ভর্তুকি দেব।
কৃষকের ন্যায্যমূল্যে উন্নত মানের বীজ পাওয়া নিশ্চিতে জাতির পিতা প্রতিষ্ঠিত বিএডিসি লাভজনক না বলে বন্ধ করে দেয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সব সময় সব কিছুতে লাভ লোকসান দেখলে চলে না। আমার দেশের মানুষ কতটুকু উপকার পাবে সেটাই আমাদের চিন্তার বিষয় হতে হবে।’
যত্রতত্র শিল্প-কারখানা স্থাপন না করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১০০টা অর্থনৈতিক অঞ্চল করে দিচ্ছি। এটার অর্থ হলো কোনো কৃষিজমি যেন নষ্ট না হয়। যেখানে সেখানে যত্রতত্র কেউ ইন্ডাস্ট্রি করতে পারবে না।’
রপ্তানিতে কৃষিপণ্যের প্রাধান্য নিশ্চিত করার পরিকল্পনার পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও প্রতিটি মানুষের কাছে বিদ্যুৎসেবা পৌঁছে দিতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধান কাটা, ধানের চারা রোপণ করা, জমি চাষ-কৃষির সবকিছুকে যান্ত্রিকীকরণ করতে চাই। তবে তা অবশ্যই কৃষিজমি রা করে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করায় এখন পুষ্টির দিকে নজর দিয়েছি।
ডিম, মাংস, মিঠা পানির মাছ, তরিতরকারি ও ধান উৎপাদনে সরকারের সাফল্যও এ সময় তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ‘আমার বাড়ি আমার খামার’ কর্মসূচির উল্লেখ করে যার যার বাড়িকে তার তার খামারে পরিণত করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কেউ বসে থাকবে কেন, সবাই কাজ করবে। যে যেভাবে উৎপাদন করতে চায়, যা উৎপাদন করতে চায়, আমরা সেই সুযোগ করে দেব; এক টুকরো জমিও অনাবাদী থাকবে না।’
সরকারের পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক করে দেয়ায় তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী উৎপাদিত পণ্য সমবায়ের মাধ্যমে বাজারজাতকরণের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর ৬ নভেম্বর বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে কৃষক লীগের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়। সেখানে নতুন কমিটির নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। সম্মেলনে সভাপতি পদে ১৩ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১১ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়। পরে নিজেদের মধ্যে সমঝোতার প্রস্তাব করা হলে তারা কেউই ছাড় দেননি। পরে সাংগঠনিক নেত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।
নতুন সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ্র চন্দ বিদায়ী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি সংগঠনটির সাংগঠনিক ও কৃষি উপকরণ সম্পাদকও ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও সমীর চন্দ্র চন্দ সনাতন সমাজকল্যাণ সংঘের সভাপতি, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের কার্যনির্বাহী সদস্য, বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
সভাপতি হিসেবে নাম ঘোষণার পর নতুন সভাপতি সমীর চন্দ্র তার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘আমি যে দায়িত্ব পেয়েছি তা সুচারুরূপে পালন করার চেষ্টা করব। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, এই এগিয়ে যাওয়ার পথে কৃষি ও কৃষকবান্ধব রাজনীতির মাধ্যমে কৃষক লীগ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা রাখি।’
নতুন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়া উম্মে কুলসুম স্মৃতি বিগত সংসদের সংরতি আসনের সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি কৃষক লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পেশায় তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা মুক্তি আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার জন্ম গাইবান্ধার পলাশবাড়ি এলাকায়।
অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে উম্মে কুলসুম স্মৃতি বলেন, ‘আমাকে যে আমানত দেয়া হলো তা আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা করব।’
দ্বিতীয় অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কৃষক লীগের সম্মেলনে অনেকেই প্রার্থী হয়েছেন। প্রত্যেকেরই যোগ্যতা আছে। যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের জনপ্রিয়তাও আছে। সভাপতি প্রার্থী ১৩ জন, সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী ১১ জন। বানাতে হবে একজন সভাপতি ও একজন সাধারণ সম্পাদক। তাদের সমঝোতা করার জন্য ২০ মিনিট সময় দিয়েছিলাম। কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে রাজি নন। আমি কেন্দ্রীয় নেতাদের পরামর্শক্রমে, আমাদের অভিভাবক, দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছি। পদপ্রার্থী সবার নামই তাকে জানিয়েছি। তিনি আমাদের একটা সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

এ সময় ওবায়দুল কাদের কাউন্সিলরদের উদ্দেশে বলেন, নেত্রী যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন আপনারা তা মানবেন কি না? জবাবে সবাই তাতে সম্মতি জানান। এ সময় কাদের আরও বলেন, আওয়ামী লীগ থেকে কেউ বাদ যায় না, দায়িত্বের পরিবর্তন হয়। আজকে আমি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করব। আগামী ৭ দিনের মধ্যে নতুন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পূর্ণাঙ্গ কমিটি করে আমার কাছেও জমা দিতে পারেন অথবা সরাসরি দলীয় সভাপতির কাছেও জমা দিতে পারেন।
এ সময় তিনি সভাপতি পদে কৃষিবিদ সমীর চন্দ্র চন্দ ও সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতির নাম ঘোষণা করলে সারাদেশ থেকে আসা কৃষক লীগের কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা সমির ও স্মৃতির নামে স্লোগান দেন।
এর আগে কৃষক লীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ২০১২ সালের ১৯ জুলাই। সম্মেলনে মোতাহার হোসেন মোল্লাকে সভাপতি ও খোন্দকার শামসুল হক রেজাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির কার্যক্রমে কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কাজ করতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন ১৫ আগস্টে শহীদ কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত।
এবারের সম্মেলনে একমাত্র বিদেশি অতিথি ছিলেন ভারতের সর্বভারতীয় কৃষাণ সভার সাধারণ সম্পাদক অতুল কুমার অঞ্জন। তিনি বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজিতে আবেগঘন বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী শক্তি। এরা কৃষকদের কানে কানে ভাইরাস ছড়াচ্ছে। দু’দেশের এই অভিন্ন শত্রুদের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ের আহ্বান জানান তিনি।