কলাম

সাফল্যের নতুন উচ্চতায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন এনডিসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি, এমফিল
অগ্নিদুর্ঘটনাসহ সকল প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগে সর্বসাধারণের করণীয় বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির ল্েয এবং ঝুঁকি হ্রাসে জনসাধারণের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে ৬ থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত দেশব্যাপী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সপ্তাহ ২০১৯ উদযাপিত হয়েছে। এ উপলে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিভাগ, জেলা এবং সারাদেশে চালু থাকা ৪১১টি ফায়ার স্টেশনের মাধ্যমে নানা কর্মসূচি পালন করা হয়। দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণ দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা সৃষ্টির এই কার্যক্রমে সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সহযোগী হিসেবে কাজ করবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। সকলের সমন্বিত চেষ্টার মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে দেশে দুর্যোগ-ঝুঁকি যেমন কমে আসবে, তেমনি সংঘটিত দুর্ঘটনায় য়তির পরিমাণও হ্রাস পাবে।
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সকল দুর্যোগে প্রথম সাড়াদানকারী সরকারি সংস্থা হিসেবে কাজ করে থাকে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। বর্তমান সরকারের সময়োপযোগী পদেেপর ফলে প্রতিষ্ঠানটির সেবা প্রদানের সামর্থ্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধারকাজের জন্য নতুন গাড়ি-পাম্প ও আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, বিদ্যমান ফায়ার স্টেশনগুলোর মানোন্নয়ন করার পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের নানা সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে বর্তমান সরকার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরকে উন্নয়নের মূল স্রোতে তুলে এনেছে। সামর্থ্যরে সর্বোচ্চটুকু প্রয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এই উন্নয়নসুবিধার কার্যকর সুফল অর্জনে বদ্ধপরিকর।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে সমৃদ্ধ করতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই দেশের প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম একটি করে ফায়ার স্টেশন নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর ফায়ার সার্ভিস সপ্তাহের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে এসে তিনি বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে ঢেলে সাজিয়ে বিশ্বমানের একটি আধুনিক সেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার নির্দেশনা দেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সেবার মান আধুনিক ও গণমুখী এবং সেবা-সামর্থ্য বৃদ্ধি করার ল্েয নানা ধরনের বাস্তব পদপে গ্রহণ করা হয়েছে। এসব পদপে বাস্তবায়নের ফলে এই প্রতিষ্ঠানটির কাজের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা বিপুলভাবে বাড়ছে; পাশাপাশি এ বিভাগের কর্মীদের জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জীবন ও সম্পদ রায় এই প্রতিষ্ঠানটি এখন গণমানুষের কাছে হয়ে উঠেছে আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক।
বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্প প্রণয়ন, একনেকে অনুমোদন এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুত ‘প্রতিটি উপজেলায় একটি করে ফায়ার স্টেশন’ নির্মাণের কাজ পরিকল্পনামাফিক এগিয়ে চলেছে। এই সরকারের আমলে ইতোমধ্যে ২০৫টি নতুন ফায়ার স্টেশন চালু করা হয়েছে। এর ফলে চালু ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা ২০৬টি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪১১টিতে উন্নীত হয়েছে। প্রকল্পের কাজ শেষে ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা হবে ৫৬৭টি।
সরকারের সক্রিয় উদ্যোগে বিশ্বমানের আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তির উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণী সরঞ্জাম সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর সক্রিয় সহযোগিতায় চীন ও বিশ্ব ব্যাংক থেকে ইতোমধ্যে অনুদান হিসেবে পাওয়া গিয়েছে বিপুল পরিমাণ অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ও উদ্ধার সরঞ্জাম। অনুসন্ধানকাজের জন্য প্রযুক্তিগত সুবিধাসংবলিত সরঞ্জাম সংগ্রহের পাশাপাশি প্রশিতি ডগ স্কোয়াড সংযোজনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সম্প্রসারণ সেবার আওতায় বিদ্যমান অ্যাম্বুলেন্সের সংখ্যা ৬৩টি থেকে ১৮৫টিতে উন্নীত করা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং কমপ্লেক্সকে একাডেমিতে রূপান্তর এবং বড় কলেবরে ভিন্ন স্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচল প্রকল্পে মালটিপারপাস ট্রেনিং কমপ্লেক্স করার জন্য সরকার থেকে ১৭ একর জমি বরাদ্দ পাওয়া গিয়েছে। জাইকার সহযোগিতায় বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণ করে সদর দপ্তর ঢাকার মিরপুরে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। উন্নয়ন প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় পর্যায়ে সীমিত না রেখে একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সেবাসামর্থ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রশিণ সুবিধাদিসহ বিভাগীয় অফিস স্থাপনের জন্য প্রতিটি বিভাগে ৫ একর জমি সরকারিভাবে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় বিগত সময়ের ৩৮৫.৭৭ কোটি টাকার বাজেট এই আর্থিক বছরে এসে ১০৪৮.২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বৈদেশিক প্রশিণের সুযোগ সৃষ্টি করে এই প্রতিষ্ঠানকে দ জনশক্তিসমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য খাকি পোশাকের পরিবর্তে মর্যাদাপূর্ণ নতুন কম্ব্যাট পোশাক প্রবর্তন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে আধুনিক সুবিধাসংবলিত ১১টি মডার্ন ফায়ার স্টেশন স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এ বিভাগের কর্মীদের জন্য একটি বার্ন ট্রিটমেন্ট হাসপাতালের প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টরের পদ ৫০টি হতে ২৬৮টিতে উন্নীত করা হয়েছে। ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর ও স্টেশন অফিসার পদের (সমমান পদসহ) পদমর্যাদা তৃতীয় শ্রেণি থেকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে। এ অধিদপ্তরের ফায়ারম্যান ও লিডার পদের বেতন গ্রেড বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিয়মিত পদ সৃজনের মাধ্যমে ফায়ার সার্ভিসের জনবলের সংখ্যা এই সরকারের আমলে ৪ হাজার ৩৩৫ জন থেকে বৃদ্ধি করে ১২ হাজার ২৮৯ জনে উন্নীত করা হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ২০ হাজার জনে উন্নীত করার ল্যমাত্রা রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের পাশাপাশি এ অধিদপ্তরের কর্মীদের জীবন-মান উন্নয়নের ল্েযও ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদপে গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মীদের জন্য নির্ধারিত হারে ঝুঁকিভাতা প্রবর্তন করা হয়েছে। সকলের জন্য পূর্ণাঙ্গ রেশন মঞ্জুর করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কল্যাণে মানবিক সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘ফায়ার সার্ভিস কল্যাণ ট্রাস্ট’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের নারী কর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবারের নারী সদস্যসহ সন্তানদের জীবন-মান উন্নয়ন ও কর্মমুখী কারিগরি শিাসুবিধা সৃষ্টিসহ সুস্থ ধারার সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে জাতির জনকের অভিপ্রায় অনুযায়ী নারীর মতায়নের অংশ হিসেবে ‘ফায়ার সার্ভিস নারীকল্যাণ সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সকে আধুনিকায়ন এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবন-মান উন্নয়নে বর্তমান সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেয়ায় এই প্রতিষ্ঠানের সেবাসামর্থ্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা বৃদ্ধি পাওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের সেবার ত্রেও অনেক বেড়েছে। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এখন বহুমাত্রিক সেবাকাজে নিয়োজিত। চলমান সেবা কাজের সাথে প্রতিনিয়ত যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ধারণা ও উদ্যোগ। এখন অগ্নি নির্বাপণ ও ভবনধস এবং সড়ক ও নৌযান দুর্ঘটনায় উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি জঙ্গি দমন অভিযানে অংশগ্রহণ, ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের অগ্নিনিরাপত্তা প্রদান, প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনায় সাড়া প্রদানের সময় (রেসপন্স টাইম) কমিয়ে আনতে সারাদেশের হাইওয়েসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ১০০টি স্থানে র‌্যাপিড রেসকিউ ইউনিট মোতায়েন, ভূমিকম্প বা এ ধরনের মেগা ডিজাস্টার মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে ৬২ হাজার প্রশিতি ভলান্টিয়ার তৈরির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বহুতল ভবনের অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অগ্নি প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা, জাতীয় প্রদর্শনী ও মেলাসমূহে নিরাপত্তা ইউনিট মোতায়েন, ঝড়ে বিপর্যস্ত রাস্তাঘাট যান-চলাচল উপযোগী করা; ওয়ার্কশপ, সেমিনার ও প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন; ঈদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবের সময় ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তায় টার্মিনাল ও স্টেশনগুলোতে ডিউটি মোতায়েন, পোশাকশিল্পের অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ল্েয নিয়মিত পরিদর্শন, গণসংযোগ, বহির্গমন মহড়া, প্রশিণ ও পরামর্শ প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে। বহুমুখী কার্যধারার সাথে ফায়ার সার্ভিসের সম্পৃক্ততা এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতি গণমানুষের প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন বলে আমরা মনে করি। সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা দেশের জান-মালের সুরা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সকল দুর্যোগে প্রথম সাড়াদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এখন গণমুখী একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আমরা পরিপূর্ণ পেশাদারি মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন এবং দেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যকর কর্মসূচিকে বাস্তবায়নের জন্য বদ্ধপরিকর। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম আর জনগণের সহযোগিতায় আমরা সকলের জীবন ও সম্পদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ।
লেখক: মহাপরিচালক
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর