ফিচার

স্ট্রোক প্রতিরোধই সর্বোত্তম

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ
গত ২৯ অক্টোবর পালিত হলো বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। এবারের সচেতনতার বিষয় ছিল ‘সারা বিশ্বে প্রতি চার জনের মধ্যে এক জন স্ট্রোকের ঝুঁকিতে থাকেন, সেই এক জন যেন আপনি না হন।’
আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ধারণা আছে যে, স্ট্রোক হৃদপি-ের একটি রোগ। এটি মোটেই সত্য নয়। স্ট্রোক মস্তিষ্কের রোগ। মস্তিষ্কের রক্তবাহী নালির দুর্ঘটনাকেই স্ট্রোক বলা যায়। এই দুর্ঘটনায় রক্তনালি বন্ধও হতে পারে, আবার ফেটেও যেতে পারে। এ কারণে মস্তিষ্কের কার্যমতা নষ্ট হয়ে যায়।

যেসব কারণ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়
ক্স অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণ। রক্তচাপের রোগী যারা নিয়মিত ওষুধ ব্যবহার করেন না বা কয়েক দিন খেয়ে প্রেশার কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেন বা মনে করেন উচ্চ রক্তচাপে তার শারীরিক কোনো সমস্যা হচ্ছে না, তাই রক্তচাপের ওষুধ সেবন করেন না।
ক্স ধূমপান, তামাকপাতা, গুল, জর্দা, মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবন।
ক্স অতিরিক্ত টেনশন, হৃদরোগ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে বেশি মাত্রায় চর্বি বা অতিমাত্রায় কোলেস্টেরলের উপস্থিতি।
ক্স অনিয়ন্ত্রিত অলস জীবনযাপন করা, চর্বিজাতীয় খাবার বেশি বেশি খাওয়া, স্থুলতা বা অতিরিক্ত মোটা হওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় কোমল পানীয় গ্রহণ এবং অধিক পরিমাণে লবণ খাওয়া।
ক্স কিছু কিছু ওষুধ যা রক্ত জমাট বাঁধার মতা কমিয়ে দেয় যেমন অ্যাসপিরিন, কপিডগ্রেল প্রভৃতি ব্যবহারে মস্তিষ্কে রক্তরণ হতে পারে।
ক্স যেকোনো ধরনের প্রদাহ অথবা ইনফেকশন এবং জন্মগতভাবে ব্রেনে কিংবা মস্তিষ্কে সরু রক্তনালি থাকা।
ক্স অনেক সময় বংশানুক্রমে বা পূর্বের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও দূরবর্তী রক্তনালি বন্ধ হওয়ার কারণেও স্ট্রোক হতে পারে।

স্ট্রোকের লণসমূহ
ক্স শরীরের কোথাও বা একাংশ অবশ লাগা কিংবা দুর্বল বোধ করা বা প্যারালাইসিস। পা, হাত, মুখ অথবা শরীরের ডান বা বাম অংশ অবশ হয়ে যাওয়া, পা দুটিতে দুর্বল বোধ করা।
ক্স চলাফেরা করতে না পারা, চলাফেরায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রমে অসামঞ্জস্য দেখা দেয়া।
ক্স কথা বলতে সমস্যা হওয়া, বিভ্রান্তিকর অবস্থায় পতিত হওয়া, কথা জড়িয়ে আসা, অস্পষ্ট হওয়া এবং একেবারে কথা বলতে বা বুঝতে না পারা।
ক্স এক চোখ বা দুই চোখেই ণস্থায়ী ঝাপসা দেখা বা দৃষ্টি ঘোলা লাগা বা একেবারেই না দেখা।
ক্স হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঝিমঝিম করা, মাথা ঘোরা, হঠাৎ করে কিছুণের জন্য হতবিহ্বল হয়ে পড়া, বমি বমি বোধ অথবা বমি করা।
ক্স স্ট্রোকের মারাত্মক উপসর্গ হচ্ছে অজ্ঞান হওয়া, খিঁচুনি, তিব্র মাথাব্যথা ও বমি।

স্ট্রোক হলে কী চিকিৎসা দিতে হবে
আক্রান্ত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। স্ট্রোক হয়ে গেলে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল।
ক্স রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। যদি খেতে না পারে, তবে নাকে নল দিয়ে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রস্রাব ও পায়খানা যাতে নিয়মিত হয়, সেই ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রয়োজনে প্রস্রাবের রাস্তায় ক্যাথেটার দিতে হবে। চোখ, মুখ ও ত্বকের যতœ নিতে হবে। বেডসোর প্রতিরোধ করার জন্য নিয়মিত পাশ ফেরাতে হবে।
ক্স উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি অনেক স্ট্রোক রোগীর হার্টের রোগ থাকে। এসব েেত্র কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শের প্রয়োজন হয়।
ক্স অন্যান্য চিকিৎসা স্ট্রোকের ধরন অনুযায়ী করা হয়। যেমন ইশকেমিক স্ট্রোকের বেলায় এসপিরিন, কোপিডগ্রিলজাতীয় ওষুধ দেয়া হয়। রক্তরণের কারণে স্ট্রোক হলে অপারেশনের প্রয়োজন হতে পারে।
ক্স একজন স্ট্রোক রোগীর প্রয়োজন হয় নিউরোলজিস্ট ও নিউরোসার্জনের। অনেক স্ট্রোক রোগীর অপারেশন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
ক্স অনেক রোগীর শ্বাসকষ্ট, বেডসোর প্রভৃতি সমস্যা দেখা দেয়। সুতরাং রেসপিরেটরি মেডিসিন স্পেশালিস্ট, প্লাস্টিক সার্জনসহ সবার সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
ক্স রোগীর অঙ্গ সঞ্চালন করে জড়তা কাটিয়ে তুলতে রিহ্যাবিলিটেশন বা পুনর্বাসনের জন্য ফিজিওথেরাপিস্ট প্রয়োজন হয়।
ক্স রোগী কথা বলতে না পারলে প্রয়োজন স্পিচ থেরাপিস্টের।
ক্স স্ট্রোক কেয়ার ইউনিট, সমন্বিত স্ট্রোক কেয়ার টিমের ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসায় আসবে সুফল, রোগী ও রোগীর স্বজন হবে চিন্তামুক্ত, রোগী লাভ করবে আরোগ্য।

যেভাবে প্রতিরোধ সম্ভব
ক্স স্ট্রোক প্রতিরোধযোগ্য রোগ, চিকিৎসার চেয়ে এই রোগ প্রতিরোধই উত্তম। ব্রেনের কোষগুলো একবার নষ্ট হলে আর পুরোপুরি কার্যকর হয় না অথবা জন্মায় না। এর জন্য সুনির্দিষ্ট ও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন। গ্রামাঞ্চলে কিংবা শহরের যেকোনো হাসপাতালে এ রোগের চিকিৎসা সম্ভব। নিয়মিত ওষুধ সেবনের মাধ্যমে উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে এবং রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
ক্স ধূমপান, মদপান, মাদকদ্রব্য, তামাকপাতা ও জর্দা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
ক্স চর্বি ও শর্করাযুক্ত খাবার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, শারীরিক ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে ওজন কমানো, খাদ্যে পশুর চর্বি ও অধিক পরিমাণ লবণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ফাস্টফুড, বাদাম, সন্দেশ-রসগোল্লা, দুধ-ঘি-পোলাও-বিরিয়ানি, পাঙাশ-চিংড়ি-কাঁকড়া, গরু বা খাসির মাংস, নারিকেল বা নারিকেলযুক্ত খাবার ইত্যাদি কম খাওয়া উচিত।
শাকসবজি, অল্প ভাত, পাঙাশ-চিংড়ি-কাঁকড়া বাদে যেকোনো মাছ, বাচ্চা মুরগি ও ডিম খেলে কোনো তি হয় না। নিয়মিত ব্যায়াম এবং সকাল-বিকাল হাঁটাচলা করতে হবে। অলস জীবনযাপন পরিহার করতে হবে। দুশ্চিন্তা বা টেনশনমুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। নিয়মিত ধর্মচর্চা এ ব্যাপারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
স্ট্রোক অবশ্যই একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তবে একবার আক্রান্ত হয়ে গেলে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। যেহেতু রোগী নিজে মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে, পরিবারের জন্য অনেক সময় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, তাই প্রতিরোধ করাই সর্বোত্তম।
লেখক: ইউজিসি অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়