প্রতিবেদন

আয়কর মেলায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ : রাজস্ব আহরণে আশার আলো দেখছে এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘কর প্রদানে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, নিশ্চিত হোক রূপকল্প বাস্তবায়ন’ Ñ এই প্রতিপাদ্যে ১৪ নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ৭ দিনব্যাপী আয়কর মেলা। চলবে আগামী ২০ নভেম্বর পর্যন্ত। এর মধ্যে রাজধানীসহ সব বিভাগীয় শহরে ৭ দিন, জেলা শহরে ৪ দিন, ৪৮ উপজেলায় ২ দিন এবং ৮ উপজেলায় ১ দিনব্যাপী করমেলা আয়োজন করেছে এনবিআর। সব মিলিয়ে এবার দেশের ১২০ স্থানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ মেলা।
রাজধানীর আয়কর মেলা হচ্ছে বেইলি রোডে অফিসার্স কাবে। মেলায় মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজস্ব আহরণে আশার আলো দেখছে এনবিআর। এ প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, বাঙালি জাতির উৎসবমুখী চিরায়ত সামাজিক জীবনের সঙ্গে মিশে আছে আয়কর মেলা। করদাতারা এই মেলায় এসে উৎসবের আমেজে আয়কর দেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
তার মতে, আয়কর মেলার অর্জন অনেক। এ মেলা চালুর ফলে প্রতি বছরই করদাতার সংখ্যা বাড়ছে। রিটার্ন জমার পরিমাণ বাড়ছে। আদায় বাড়ছে। নতুন টিআইএন ইস্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।
এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, এবারের মেলায় সেবা প্রদান, কর সংগ্রহ, রিটার্ন জমার েেত্র অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। রাজনৈতিক কোনো সংকট না থাকায় এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভালো থাকায় এবার কর আদায় বাড়বে।
এনবিআর জানায়, মেলায় ঝামেলাহীনভাবে কর দেয়া সংক্রান্ত সব ধরনের কাজগুলো এক ছাদের নিচ থেকে পেয়ে যান সবাই। তাই কর মেলার আবেদন দিন দিন বাড়ছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, করমেলায় রিটার্ন দাখিল করায় কাউকে নাজেহাল হতে হয় না। স্বচ্ছন্দেই সব কাজ সম্পন্ন করা যায়। বছরের অন্য সময় করাঞ্চলে গেলে নানান ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হয়। কিন্তু আয়কর মেলায় তেমন কোনো সমস্যা হয় না। মুহূর্তেই সব ধরনের কাজ করা সম্ভব।
ব্যবসায়ীরা আরো জানান, করমেলা রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস। তাই মেলায় সব ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে মেলার আয়োজন বেশি কার্যকর হবে। কারণ সারাদেশে ৯০ হাজার বাজার আছে; প্রতিটি বাজারে ২ জন করে করদাতা শনাক্ত করা গেলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৮০ হাজার। এই করদাতাদের চিহ্নিত করতে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত মেলার আয়োজন করা জরুরি। সেটা অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখবে।
তবে কিছু ব্যবসায়ী জানান, আয়কর মেলায় প্রচুর মানুষের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে রাজস্ব অফিসগুলোতে ভালো পরিবেশ নেই। করদাতাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত হলে মেলায় এত মানুষের আগ্রহ থাকত না। কর অফিসে সেবার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। করমেলায় যারা আয়কর জমা দেন পরবর্তীতে তাদের যেন আবার প্রশ্নের মুখোমুখি হতে না হয় তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় কর দেয়ার ধারণা মেলায় ভালোভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন, যাতে সহজ নিয়মে, স্বল্প সময়ে মানুষ কর দিতে পারে। পাশাপাশি কর মেলার আয়োজন সম্পূর্ণ সরকারি ব্যয়ে হওয়া উচিত। স্পন্সর নিয়ে মেলার আয়োজন হলে পরবর্তীতে ওই প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেয়ার বিষয় সামনে আসে। শুধু ঢাকায় নয়, এ ধরনের মেলা উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত চালু করা দরকার।
এনবিআরের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের আয়কর মেলায় রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ৩০ লাখ ৭৩ হাজার ৪৫১ টাকা। ২০১৫ সালের মেলায় তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৫ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। ২০১৬ সালের মেলায় রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকারও বেশি। বছরটিতে মেলায় রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০১৭ সালের আয়কর মেলায় ২ হাজার ২১৭ কোটি ৩৩ লাখ ১৪ হাজার ২২১ টাকার রাজস্ব আহরণ হয়। বছরটিতে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৮ সালের মেলা থেকে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৯৫ টাকা। এবারের মেলায় রাজস্ব আহরণের আগের সব রেকর্ড ভেঙে যাবে বলে আশা করছে এনবিআর।
এনবিআর আয়োজিত এবারের মেলায় পুরনো পদ্ধতিতে হাতে লিখে রিটার্ন জমা দেয়ার সঙ্গে অনলাইনেও রিটার্ন জমা দেয়া যাবে। মেলায় রিটার্ন দাখিল ও কর পরিশোধের সুযোগ থাকবে। রাজস্ব সংক্রান্ত কোনো বিষয় জানার প্রয়োজন হলে মেলায় উপস্থিত রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তা জেনে নেয়া যাবে। মেলায় কোনো করদাতাকে হয়রানি করা হলে দায়ী কর্মকর্তাকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে।
গত বছরের আয়কর মেলায় সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৩৬ হাজার ২৬৬, যা এর আগের বছরের তুলনায় ৩৯.৯০ শতাংশ বেশি। গতবারে রিটার্ন জমা হয়েছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ৫৭৩। এেেত্র প্রবৃদ্ধি হয় ৪৫.৩৩ শতাংশ। আয়কর আদায় হয় ২ হাজার ৪৬৮ কোটি ৯৪ লাখ ৪০ হাজার ৮৯৫ টাকা। এেেত্র প্রবৃদ্ধি হয় ১১.৩৫ শতাংশ। নতুন ই-টিআইএন গ্রহণ করে ৩৯ হাজার ৭৪৩ জন। এেেত্র প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৫.৮৫ শতাংশ।
কারো আয় বছরে আড়াই লাখ টাকার বেশি হলে রিটার্ন দেয়া বাধ্যতামূলক। নারীর েেত্র এ সীমা ৩ লাখ টাকা। ব্যক্তি শ্রেণির করদাতার রিটার্ন জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর। এ সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানার বিধান রয়েছে।
প্রতি বছরের মতো করদাতাদের জন্য এবারও আয়কর মেলায় কর বিবরণী থেকে শুরু করে কর পরিশোধের জন্য থাকছে ব্যাংক ও বুথ। একই ছাদের নিচে মিলবে সব সেবা। করদাতাকে শুধু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে নিতে হবে। মেলায় নতুন করদাতারা ইলেকট্রনিক কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) নিতে পারবেন। ই-পেমেন্টের জন্য থাকছে পৃথক বুথ। মেলায় মুক্তিযোদ্ধা, নারী, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ করদাতাসহ সেনাবাহিনীর সদস্যদের জন্যও আলাদা বুথ থাকছে।
আয়কর মেলার প্রথম দিনেই করদাতাদের বিপুল সাড়া পাওয়া গেছে। মেলা উদ্বোধনের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর পে রিটার্ন দাখিল করেন সাবেক অর্থসচিব সিদ্দিকুর রহমান। এছাড়া করদাতারা বিভিন্ন বুথে লাইন ধরে ফরম নিয়ে রিটার্ন দাখিল করেন। ব্যাংকগুলো কমিশন চার্জ ছাড়াই সেবা দিচ্ছে গ্রাহকদের।
রাজধানীর অফিসার্স কাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সপ্তাহব্যাপী আয়কর মেলা উদ্বোধন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়াসহ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরই মেলায় আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, এবার আমার করযোগ্য আয়ের পরিমাণ ২ কোটি ৬৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে আয়কর দিয়েছি ৯১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। আমার প্রকৃত সম্পদ ৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ সময় স্ত্রী ও দুই মেয়ের করযোগ্য আয়, সম্পদের পরিমাণ ও কর পরিশোধের তথ্যও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমার স্ত্রীর করযোগ্য আয়ের পরিমাণ ২ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তিনি কর দিয়েছেন ৭১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। আমার স্ত্রীর সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আমার বড় মেয়ের করযোগ্য আয় ৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তিনি কর দিয়েছেন ২ কোটি ৮২ লাখ টাকা। তার সম্পদের পরিমাণ ৪১ কোটি ১৩ লাখ টাকা। আর আমার ছোট মেয়ের করযোগ্য আয় ৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। সে কর দিয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তার সম্পদ ৬১ কোটি ৮২ লাখ টাকা।
এনবিআর চেয়ারম্যান জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রতিনিধির মাধ্যমে আয়কর দিয়েছেন। তিনি নিজে উপস্থিত নেই। আইন অনুযায়ী যার কর তিনি নিজে না জানালে তা প্রকাশ করা যায় না।
এবারের মেলায় প্রথমবারের মতো মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে রিটার্ন জমা দেয়া যাচ্ছে। রকেট, ইউপে, বিকাশ, নগদ এবং শিওর ক্যাশ এনবিআরের ই-পেমেন্ট পোর্টালের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের কর দিতে হবে। সরকার দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিয়ে যেতে আয়কর আদায় করে। তাই দেশের সার্বিক কল্যাণে আয়কর দিতে হবে। পিছিয়ে পড়া মানুষদেরকে আমাদের অবশ্যই অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসতে হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন অর্থের আর আয়করের মাধ্যমে সেই অর্থে সংস্থান করা হয়। আয়কর প্রদানের মাধ্যমে আমাদের ধর্মীয় দায়িত্বও পালিত হয়। কেননা আমাদের আয়ে রয়েছে পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার। রয়েছে তাদের অংশ দেয়ার বিষয় ধর্মীয় নির্দেশনা। তাই কর প্রদানের মাধ্যমে আমাদের সে দায়িত্বও পালিত হয়। এছাড়া সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে অবশ্যই আমরা সকলে কর প্রদান করব।