রাজনীতি

খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ: হতাশ বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে এলডিপি সভাপতি ড. অলি আহমদ গঠন করেছেন ‘মুক্তি মঞ্চ’। যে মুক্তি মঞ্চ গঠন করার কথা বিএনপি’র, তা গঠন করেছে এলডিপি। অবশ্য কর্নেল (অব.) অলি আহমদের এই তৎপরতাকে ‘মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি’ বলে আখ্যায়িত করেছে বিএনপি।
প্রথমে অলির এই তৎপরতাকে স্বাগত জানালেও দিন যতই যাচ্ছে বিএনপি নেতাদের মধ্যে সন্দেহ ঘনীভূত হচ্ছে বলে জানা গেছে। সে কারণে অলির মুক্তি মঞ্চের সঙ্গে যারা আছেন এবং নতুন যারা যাওয়ার চেষ্টা করছেন তাদের থামিয়ে দিতে পাল্টা তৎপরতা শুরু করেছে বিএনপি।
যদিও অলি আহমদসহ মুক্তি মঞ্চে যাওয়া নেতারা বিএনপির সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাইছেন না। ২০ দলীয় জোটে থেকেই তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নতুন নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখতে চাইছেন।
এ বিষয়ে অলি আহমদ বলেন, কিছুতেই আমার দল বা মুক্তি মঞ্চের তৎপরতা বিএনপির বিরুদ্ধে নয়। কারণ নতুন নির্বাচন এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আমি আন্দোলন করছি। তাছাড়া বিএনপির বিরুদ্ধে কোনো কথা আমি বলছি না। তাই আমাকে নিয়ে সন্দেহের কিছু নেই। পৃথক মঞ্চ আমি কেন করেছি, এটি বিএনপি সময় হলে বুঝতে সম হবে।
গত ২৭ জুন এক সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে আলাদা প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা দেন কর্নেল অলি আহমদ (অব.)। ওই সময় ২০ দলীয় জোটের শরিক দল কল্যাণ পার্টি, জাগপা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এর বাইরেও ছিলেন ন্যাশনাল মুভমেন্টের চেয়ারম্যান মুফতি আল্লামা মুহিব খান, বাংলাদেশ ইন্টেলেকচুয়াল মুভমেন্টের সেক্রেটারি মাওলানা সৈয়দ শামসুল হুদা এবং উলামা-মাশায়েখ ইউনিটি নেতা হাফেজ মুফতি আবদুল্লাহ। তবে এই তিনজনের সঙ্গেই বিএনপির প থেকে কথা বলে তাদের যেতে নিরুৎসাহ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এদের কয়েকজনকে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ডেকে কথা বলেছেন বিএনপি নেতারা। তারা তাদের কোথাও না গিয়ে অপো করতে বলেছেন।
জানা যায়, ২০ দলীয় জোটের শরিক দু-একটি দলের পাশাপাশি মধ্যপন্থি ও ধর্মভিত্তিক হিসেবে পরিচিত কিছু দল ও ব্যক্তিকে মুক্তি মঞ্চে নেয়ার জন্য তৎপরতা চালাচ্ছেন অলি আহমদ। কিন্তু অলির এই তৎপরতাকে মোটেও ভালো চোখে দেখছেন না বিএনপির নেতারা। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকে তারা তাদের নিজস্ব বিষয় বলে মনে করছেন।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য অলি আহমেদ তবুও ‘মুক্তি মঞ্চ’ নামে কিছু একটা গঠন করেছেন, বিএনপি নেতারা তা-ও পারেননি। আসলে বিএনপি নেতাদের কারণেই খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন না।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে প্রায় দুই বছর ধরে কারাগারে থাকলেও তার মুক্তির বিষয়ে কোনো আন্দোলনই জমাতে পারেনি দলটি। জামিনের বিষয়েও কোনো জোরালো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। দলটির মহানগর কমিটির নেতারা খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে দ্বৈত নীতি গ্রহণ করেছেন। বিএনপির অধিকাংশ নেতাই নতুন করে আবার যেন জেলে যেতে না হয়, সে চেষ্টায়ই আছেন সর্বক্ষণ। সরকারি দলের নেতাদের পোঁ ধরে তারা রিলাক্স মুডেই দিন পার করছেন। নতুন বিএনপি গঠনের চিন্তায় আছেন মোরশেদ খান, জেনারেল মাহবুবরা। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয়টি ক্রমেই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে উঠছে, যা নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি ইস্যুটি সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছে দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপিসহ অনেকেই ভেবেছিলেন খুবই অল্প সময়ের জন্য খালেদা জিয়া কারাগারে গেছেন এবং জামিনে বের হয়ে আসবেন। কিন্তু সব আশায় গুড়েবালি। আর এতে হতাশ দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী। নানা কারণে হতাশ তারা Ñ নির্বাচনে আশাতীত পরাজয়, খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা ীণ, অজানা কারণে দলের নির্বাচিতরা সরকারের সাথে সংসদে। সব মিলিয়ে দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা রয়েছেন অন্ধকারে। তারা দলের কর্মকা-ে বেশ অখুশি ও হতাশ।
সূত্রমতে, সরকার বলছে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদেশ চলে যেতে হবে। সেখানে তিনি চিকিৎসা করাতে পারবেন, কিন্তু রাজনৈতিক বিষয়ে কোনো কথাবার্তা বলতে পারবেন না।
অন্যদিকে বিএনপির প থেকে বলা হচ্ছে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। সরকার তাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার বর্তমান শারীরিক অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিত অবস্থা বিবেচনায় খালেদা জিয়াকে জামিনে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। মুক্তি পেয়ে তিনি যেখানে খুশি চিকিৎসা নিতে পারবেন। সুস্থ হয়ে রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হতে পারবেন।
বিএনপি নেতারা দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি দাবি করলেও প্যারোল চাওয়ার বিষয়ে কিছুই বলছেন না। প্যারোলে মুক্তি চাওয়ার আবেদন একান্তই খালেদা জিয়ার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বলেও দলটির শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই জানিয়েছেন।
তবে সরকারসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, খালেদা জিয়া প্যারোল চাইলে তার কারামুক্তির বিষয়টি হয়ে যাবে সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু খালেদা জিয়া প্যারোল চাইতে রাজি নন। তিনি চাচ্ছেন জামিনে মুক্তি নিয়ে বিদেশ যেতে। তবে খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তি বা প্যারোলে মুক্তি অথবা নিঃশর্ত মুক্তি Ñ কোনো ইস্যুতেই বিএনপি নেতারা কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে মনে করছেন না তৃণমূল নেতাকর্মীরা। তারা মনে করছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা কেবল নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত আছেন। এ নিয়ে চরম হতাশ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী।