কলাম

জনবান্ধব করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষায় আয়কর মেলা

কালিপদ হালদার
জাতীয় অর্থনীতিতে রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ খাত হচ্ছে আয়কর। রাষ্ট্রের ব্যয় নির্বাহসহ সম্পদের সুষম বণ্টন ও সামাজিক বৈষম্য নিরসনে আয়করের ভূমিকা বিকল্পহীন। আর করসেবা ও কর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর মাধ্যমে করদাতাদের আস্থা অর্জন ও স্বেচ্ছা পরিপালনের চর্চা বৃদ্ধি কর বিভাগের প্রধান ল্য।
করসেবার মান বৃদ্ধি ও করবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির ল্েয জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। করদাতা ও কর আহরণকারীদের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য। করদাতাগণ নিয়মিত কর প্রদান করে যাচ্ছেন, এ কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের চিত্র লণীয়ভাবে পাল্টে গেছে। জাতীয় রাজস্ব ল্যমাত্রা অর্জনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন করদাতাগণই।
কর প্রদানকে সহজতর করতে ও করসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ‘আয়কর মেলা’ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি অনন্য উদ্যোগ। প্রতি বছর এ মেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের যে বিপুল আগ্রহ তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডেকে অভিভূত করে। এ মেলাকে নিয়ে জনগণের উৎসবমুখরতা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করসেবার মানকে উন্নত ও যুগোপযোগী করতে রাজস্ব বোর্ডকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত করছে।
আধুনিক বিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। উন্নয়নের মহাসড়কে ধাবমান বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকার জনকল্যাণকর কর্মসূচির পাশাপাশি মেগা প্রকল্প, যেমন পদ্মাসেতু এখন দৃশ্যমান যা আর স্বপ্ন নয়- বাস্তবতা। পদ্মাসেতু চালু হওয়ার পর আর্থসামাজিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। সারা বিশ্বে বিস্ময় সৃষ্টি করে বাংলাদেশ বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য আদর্শ ও নিরাপদ েেত্র পরিণত হয়েছে। এ অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ জোগান দিয়ে উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে কর অবকাঠামো আরও সুদৃঢ় ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ইতোমধ্যে আয়কর মেলার মতো বিভিন্ন বাস্তবভিত্তিক পদপে গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে। সেই ধারাবাহিকতায় আয়কর মেলা আধুনিক ব্যবস্থাপনা এবং জনমুখী করসেবার সৃজনশীল এক আয়োজন। আয়করের মতো নিরস বিষয়কে নিয়ে মেলার আয়োজন করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর সংস্কৃতির েেত্র গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক তৈরি করেছে। ২০১০ সাল থেকে শুরু হওয়া আয়কর মেলার পরিধি এবং সেবার পরিসর উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বছরের আয়কর মেলার প্রতিপাদ্য হলো:
‘কর প্রদানে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ
নিশ্চিত হোক রূপকল্প বাস্তবায়ন’
সরকারের রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নের জন্য একদিকে যেমন পর্যাপ্ত রাজস্ব প্রয়োজন, অন্যদিকে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য হ্রাস করাও জরুরি। সরকারের নীতিমালার সাথে সঙ্গতি রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাজস্ব রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১ নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। রাষ্ট্রের রাজস্বভা-ারে পর্যাপ্ত রাজস্বের জোগান দিতে আয়কর বিভাগে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উদ্ভাবনীমূলক কর্মকা- চলমান রয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আধুনিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি।
কর পরিপালন বিশ্বব্যাপী একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আয়কর সম্পর্কিত ভীতি দূর, কর সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিবিড় করসেবা প্রদানের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগ ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো আয়কর মেলার মতো অভিনব এই কর্মসূচি উদ্ভাবন করে। মেলা, পালা-পার্বণ, উৎসব, অনুষ্ঠান ইত্যাদি বাঙালি সমাজচেতনার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বাঙালি জাতির উৎসবমুখী চিরায়ত সামাজিক জীবনাচারকে আয়কর আহরণের মতো জটিল বিষয়ের সাথে যুক্ত করে করদাতাগণকে উৎসবের আমেজে আয়কর প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। মেলা শুরুর প্রথম বছর হতেই আয়কর মেলা সম্মানিত করদাতাদের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছে। বিপুল জনআগ্রহের প্রেেিত ২০১০ সাল হতে শুরু হওয়া আয়কর মেলার পরিসর বর্ষক্রমিক বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আয়কর মেলার অর্জন
কর সংস্কৃতির বিকাশ, করসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মানিত করদাতাদের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন হচ্ছে আয়কর মেলার অনন্য প্রাপ্তি। আয়কর মেলা ইতোমধ্যে করদাতাদের বার্ষিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সম্মানিত করদাতাগণ কর মেলার জন্য প্রতি বছর অধীর আগ্রহে অপো করেন। কেবল কর আহরণ বা করসেবা প্রদানের কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং করদাতাবান্ধব ব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি হিসেবে আয়কর মেলা দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সম হয়েছে।

আয়কর মেলার সেবাসমূহ
যেকোনো মেলায় নানাবিধ পসরার সমাহার থাকে। আয়কর মেলাকেও সাজানো হয়েছে বাঙালি ঐতিহ্যের চিরন্তনী মেলার সাজে। প্রতিবারের মতো এবারের আয়কর মেলাতেও বিদ্যমান করদাতা, সম্ভাব্য করদাতা ও ভবিষ্যতের করদাতাদের জন্য টিআইএন রেজিস্ট্রেশন, আয়কর রিটার্ন ফরম পূরণ, রিটার্ন গ্রহণ ও কর পরিশোধে সহায়তা প্রদানসহ নানা আয়োজন থাকছে। এবারের আয়কর মেলায় যেসব সেবার সমাহার:
ক্স সম্মানিত করদাতাগণ মেলায় তাঁদের ২০১৯-২০ কর বর্ষের আয়কর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।
ক্স সহজে রিটার্ন দাখিলের জন্য আয়কর মেলায় প্রতিটি কর অঞ্চলের জন্য আলাদা বুথ থাকবে।
ক্স টিআইএন রেজিস্ট্রেশন বুথে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানসাপেে নতুন করদাতারা টিআইএন রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন।
ক্স মেলায় ই-ফাইলিং ও ই-পেমেন্টের সুবিধা থাকবে।
ক্স মুক্তিযোদ্ধা, সেনাসদস্য, মহিলা, প্রতিবন্দ্বী ও প্রবীণ করদাতাদের জন্য মেলায় পৃথক বুথ থাকবে।
ক্স মেলায় স্থাপিত ব্যাংকের বুথে আয়কর জমা দিতে পারবেন।
ক্স মেলা প্রাঙ্গনে আয়কর রিটার্ন, টিআইএন আবেদন ফরম এবং চালান ফরম সরবরাহ করা হবে।
ক্স মেলায় হেল্পডেস্ক, তথ্য কেন্দ্র ও আয়কর অধিত্রে সংক্রান্ত বুথ থাকবে।
ক্স করদাতাদের সেবা প্রদানের সুবিধার্থে একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে (িি.িধুশড়ৎসবষধ.মড়া.নফ) যার মাধ্যমে করদাতাগণ ভার্চুয়াল মেলায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
জনআগ্রহ ও জনগণের সুবিধার্থে দেশব্যাপী বিস্তৃত পরিসরে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে যার তথ্য নিম্নে উপস্থাপন করা হলো:
ক্স ৮টি বিভাগীয় শহরে ৭ দিনব্যাপী।
ক্স ৫৬টি জেলা শহরে ৪ দিনব্যাপী।
ক্স ৪৮টি উপজেলায় ২ দিনব্যাপী।
ক্স ৮টি উপজেলায় ১ দিনব্যাপী
আয়করের মতো অজনপ্রিয় একটি বিষয় মেলার উৎসবে কিভাবে রাঙিয়ে তোলা যায়, আয়কর মেলা তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মেলার বহুমুখী উদ্দেশ্যের মধ্যে একটি হচ্ছে করদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। ২০১০ সালে শুরু করে ক্রমাগত এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে কর পরিপালনের বাধ্যবাধকতা রূপান্তরিত হচ্ছে উৎসবমুখরতায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর করদাতাদের শর্তহীন আস্থা ও বিশ্বাসকে অবলম্বন করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
লেখক: সদস্য, গ্রেড-১
(কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা)
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও সমন্বয়ক
আয়কর মেলা-২০১৯