প্রতিবেদন

জোনাস ঢাকী-মালেক চক্রের কমিশন বাণিজ্যে কালব রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
দি কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লীগ অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (কালব) রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণে ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। বিনিয়োগ অলাভজনক জানা সত্ত্বেও কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য কালব-এর কুচিলাবাড়ী রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণে পূর্বের বোর্ডের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান বোর্ডও বিনিয়োগ করেছে। বিনিময়ে চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী, সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক ও অ্যাকাউন্টস ম্যানেজার ফিরোজ আলম কমিশন পেয়েছেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
জানা গেছে, ভিন্ন নামে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মূলত ঠিকাদার জাহাঙ্গীর আলম। তিনি নিম্নমানের কাজ করে মালেক-ঢাকী-ফিরোজকে ম্যানেজ করে বিল তুলে নিচ্ছেন। ভবন বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত কমিটি অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিল পরিশোধ না করার পরামর্শ দিলেও তা আমলে নেয়া হয়নি। এই প্রকল্পে ভূমি ক্রয় ও ভবন নির্মাণে চরম দুর্নীতির অভিযোগ ছিল মালেক গংয়ের বিরুদ্ধে। এখন তারাই কমিশন ভাগাভাগির জন্য রিসোর্ট স্থাপনে আরো ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।
কুচিলাবাড়ী ভবন নির্মাণে আরো বিনিয়োগের বিষয়ে বোর্ড সভায় ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও কয়েকজন বোর্ড সদস্য বিরোধিতা করলেও ঢাকী-মালেক তার তোয়াক্কা করেননি; বরং দায়িত্ব গ্রহণের পরই বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া কুচিলাবাড়ীতে নতুন রিসোর্ট প্রকল্প শুরু করেন।
এ বিষয়ে ইন্টারনাল অডিট কমিটির রিপোর্টেও আপত্তি করা হয়। এমনকি নতুন-পুরনো কোনো বিনিয়োগের বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদন দেয়নি। নিশ্চিত লোকসানি প্রকল্প জানা সত্ত্বেও কেবল টাকা কামানোর জন্য রিসোর্ট করা হয়েছে। কুচিলাবাড়ী রিসোর্ট নির্মাণে প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যয় এবং নিম্নমানের কাজের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বোর্ড কর্তৃক ঠিকাদারদের বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।
সূত্রমতে, কালব রিসোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণের বিষয়ে পর্যালোচনায় দেখা যায়, এজিএম-এ অনুমোদিত বাজেট ১৪ কোটি টাকা। ওই কার্যক্রমের ডিটেইল ডিজাইন, প্ল্যান প্রভৃতি খাতের প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণে ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম তালিকাভুক্তির জন্য গত বছরের ১৩ আগস্ট তারিখে দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। মোট ৬টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করে। ২টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়। ০৩-০৯-২০১৮ তারিখে দরপত্র আহ্বান করে নোটিশ প্রদান করা হয়। ০৪-০৯-১৮ থেকে ০৯-০৯-২০১৮ তারিখ পর্যন্ত ২টি দরপত্র জমা হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে অ্যাক্যুমিন আর্কিটেক্টস অ্যান্ড প্ল্যানার্স লিমিটেডকে ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার টাকার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
অডিটরিয়াম ও মূল ভবনের ইন্টেরিয়র কাজ সম্পাদনের জন্য ৩১-১০-২০১৮ তারিখে ২টি দৈনিক পত্রিকায় ঠিকাদার তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। ৭টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির আবেদন করে। ৪টি প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করা হয়।
২৮-১১-২০১৮ থেকে ০৪-১২-২০১৮ পর্যন্ত সময় দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৪টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে মূল ভবনের ইন্টেরিয়র কাজ সম্পাদনের জন্য ২৩-১২-২০১৮ তারিখে ‘ফাউন্টেক’-কে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৮ হাজার ১০০ টাকা এবং অডিটরিয়াম ইন্টেরিয়র কাজের জন্য ১৯-১২-২০১৮ তারিখে ‘রিট কনস্ট্রাকশন’-কে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৭২ হাজার ২২০ টাকার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
সিভিল (পুল, লেক, রাস্তা ও অন্যান্য) কাজের জন্য পূর্বে তালিকাভুক্তি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে ২৮-১১-২০১৮ থেকে ০৪-১২-২০১৮ পর্যন্ত সময় দিয়ে দরপত্র আহ্বান করা হয়। ৪টি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ১৯-১২-২০১৮ তারিখে মেসার্স জে এন ট্রেডার্সকে ২ কোটি ২৮ লাখ ৪৭ হাজার ১৪০ টাকার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
উল্লিখিত দরপত্রগুলো খোলা ও বাছাই কমিটির সদস্যরা হলেন ফ্রান্সিস পি রোজারিও আহ্বায়ক, উত্তম হালদার, সদস্য, ফিরোজ আলম সদস্য-সচিব। ০৮-১২-২০১৮ তারিখে দরপত্র খোলা হয় এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মূল্যায়ন কমিটিতে প্রেরণের সুপারিশ করা হয়। মূল্যায়ন কমিটির সদস্যরা হলেন হরিপদ চন্দ্র নাগ আহ্বায়ক, ফ্রান্সিস পি রোজারিও সদস্য, মো. সুলতান উদ্দিন সদস্য, ইঞ্জিনিয়র আবু তাহের সদস্য, ফিরোজ আলম সদস্য-সচিব। কমিটি ১০-১২-২০১৮ তারিখ মূল্যায়ন করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কার্যাদেশ প্রদানের সুপারিশ প্রদান করে।
১৩তম বোর্ড সভায় বোর্ড সদস্য অমূল্য চন্দ্র দাস উপ-কমিটির কাজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং ‘ফাউন্টেক’-এর কাগজপত্র ভুয়া এবং প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব নেই বলে অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান, জোনাস ঢাকী ‘ফাউন্টেক’-এর কাগজপত্র যাচাই করার জন্য ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেত্বত্বে ডিরেক্টর আব্দুর রাজ্জাক ও ট্রেজারার এম জয়নাল আবেদীনের সমন্বয়ে ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি যাচাই কমিটি গঠন করেন। উল্লেখ্য, ৩ জন ডিরেক্টর আলফ্রেড রায়, কুতুব উদ্দীন ও শারমিন জাহান মঞ্জু ওই প্রকল্পে কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তারা ওই নির্মাণকাজের কোনো দায়ভার নেবেন না বলে নির্মাণকাজ বন্ধ করার প্রস্তাব করেন।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, যাচাই কমিটির প্রতিবেদন জমা হওয়ার পূর্বেই ফাউন্টেকসহ সকল ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে। অডিটরিয়াম ইন্টেরিয়র কাজের জন্য ১৯-১২-২০১৮ তারিখে ‘রিট কনস্ট্রাকশন’-কে ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৭২ হাজার ২২০ টাকা, সিভিল (পুল, লেক, রাস্তা ও অন্যান্য) কাজের জন্য ১৯-১২-২০১৮ তারিখে মেসার্স জে এন ট্রেডার্স-কে ২ কোটি ২৮ লাখ ৪৭ হাজার ১৪০ টাকা এবং মূল ভবনের ইন্টেরিয়র কাজ সম্পাদনের জন্য ২৩-১২-২০১৮ তারিখে ‘ফাউন্টেক’-কে ৫ কোটি ২৬ লাখ ৭৮ হাজার ১০০ টাকার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
জানা যায়, উল্লিখিত কার্যাদি সম্পাদনের জন্য কোনো ডিজাইন ও প্রাক্কলন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে কি না তাও আজ পর্যন্ত কোনো বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়নি।
এ বিষয় নিয়ে ০৪-০২-২০১৯ তারিখে ১৪তম বোর্ড সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গঠিত যাচাই কমিটি অধিকতর স্বচ্ছতার জন্য উক্ত প্রকল্পের সকল কাজের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই করার সুপারিশ করে। অথচ রহস্যজনক কারণে যাচাই প্রতিবেদন জমা হওয়ার পূর্বেই সকল কাজের কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে এবং উক্ত কাজের যথাযথ প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। বিস্তারিত আলোচনায় ওই কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন থাকায় কয়েকজন বোর্ড সদস্য কাজ বন্ধ রাখার প্রস্তাব করেন এবং কাজের কোনো প্রকার দায়ভার বহন করবেন না মর্মে লিখিত আবেদন জানানোর কথাও বলেন।
জানা যায়, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি ০৪-০৪-২০১৯ তারিখে ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজারসহ কাজের অগ্রগতি জানার জন্য সরেজমিনে ওই প্রকল্প পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শন শেষে এ বিষয়ে চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করা হয়েছে। দেখা যায়, ইন্টেরিয়র কাজের ৫৫%, সিভিল (পুল, লেক, রাস্তা ও অন্যান্য) কাজের ২০% ও মূল ভবনের ইন্টেরিয়র কাজের ৬০% কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
পরিদর্শনকালে যে সকল বিষয় পরিলক্ষিত হয়েছে তা হলো মূল ভবনের ইন্টেরিয়র কাজের মধ্যে খাট, খাটের চালি, টেবিল, চেয়ার, কেবিনেট, টিভি ফ্রেম, মিরর ইত্যাদির ৫৫% কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কাঠের কাজের মধ্যে বিশেষ করে খাটে মেহগনি কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু কাঁচা কাঠসহ কাঠের গুণগত মান খুবই নিম্নমানের। কিছু ক্ষেত্রে কাঠের সাইজ খুবই পাতলা। খাটের চালির মানও নিম্ন। নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করায় টেকসই ও গুণগত মান কম হবে। প্রতিষ্ঠান যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থাপনা কমিটিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দেয়া হয়।
এ বিষয়ে কালবের অভিজ্ঞ ডেলিগেটগণ মনে করেন, পাশেই ঢাকা ক্রেডিটের রিসোর্ট লোকসান দিচ্ছে। সেখানে কালবের রিসোর্টের কোনো বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নেই। এরিয়ান কেমিক্যালের বিনিয়োগের মতো এটাও নিঃসন্দেহে অপবিনিয়োগ। বোর্ড সদস্যদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া কালবের কোনো লাভ দেখছেন না তারা। এ বিনিয়োগ থেকে রিটার্ন আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। ভবনসহ ভূমি বিক্রি করেও বিনিয়োগের অর্ধেক টাকা ফেরৎ পাওয়া যাবে কি না তা নিয়েও তারা সন্দিহান।

দুই.
জানা গেছে, বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান সাইমন এ পেরেরা এবং বর্তমান বোর্ডের চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারী এমদাদ হোসেন মালেকের পারস্পরিক যোগসাজসে লুটপাট, অর্থ আত্মসাৎ, অপচয়, মতার অপব্যবহার, অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়ে কালব আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। প্রতি মাসে ৮০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। নামসর্বস্ব এরিয়ান কেমিক্যাল কোম্পানিতে অপবিনিয়োগকৃত ৯৭ কোটি টাকা বর্তমান চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি এবং সাবেক বোর্ডের যোগসাজসে বেহাত হয়ে গেছে। কেবল অর্থ লোপাটের জন্য বিনা প্রয়োজনে সাবেক বোর্ড এবং বর্তমান বোর্ডের চেয়ারম্যান-সেক্রেটারি কুচিলাবাড়ীতে ভবন ও রিসোর্ট নির্মাণের নামে ৭৫ কোটি টাকা অপবিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে অর্ধেক টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
অব্যাহত লোকসান সত্ত্বেও বিনা প্রয়োজনে কেবল টাকা লোপাটের জন্য ঢাকী-মালেক ১ কোটি ৪০ লাখ টাকায় গাড়ি আমদানি করেছে। এখানেও অর্ধেক টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। নানা পন্থায় ঢাকী-মালেক সমবায়ীদের টাকা অপচয় ও আত্মসাৎ করে চলছে। বর্তমান বোর্ডের অন্য সদস্যদের মতামত নেয়া হয় না। সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন চেয়ারম্যান-সেক্রেটারি। প্রতিবাদী ২ জন বোর্ড সদস্যকে বিধিবহির্ভূতভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অন্য সদস্যদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। এভাবে ঢাকী-মালেক সকল েেত্র বেপরোয়া আচরণ করছে। এেেত্র তাদের সহযোগিতা করছে সমবায় অধিদপ্তরের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা। এ কারণে আমানতকারী সমবায়ী সদস্যদের মধ্যে আমানত ফেরত পাওয়া নিয়ে রয়েছে সংশয়।
এরকম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা দেখে সমবায় অধিদপ্তর কালব-এর অডিট রিপোর্টে দ্রুত একজন সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশাসক নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেছে।
বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটির বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি উদ্ঘাটন করে সমাধানের দায়িত্ব বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির ওপর বর্তায়। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক বোর্ডের অন্য ১০ সদস্যকে মতামত প্রকাশের সুযোগ না দিয়ে বা মতামত দিলেও তা আমলে না নিয়ে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অনেক েেত্রই শুধু চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি অন্য কারো মতামত না নিয়ে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম সম্পন্ন করছেন। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরবর্তী বোর্ড সভায় উপস্থাপন করে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, আবার অনেক সময় বোর্ড সভায় উপস্থাপন না-করে এবং বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই কাজ সম্পন্ন করা হচ্ছে। কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে গেলে তাকে ধমক দিয়ে বসিয়ে দেয়া হয় এবং তার বিরুদ্ধে নানারকম ষড়যন্ত্র করা হয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোর্ড সদস্যদের জানতেও দেয়া হচ্ছে না, যা সমবায় সমিতি আইন ও বিধির পরিপন্থি।
বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটি সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদন না নিয়ে অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে কালব ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণকাজ করেছে, যা নিয়ে সর্বমহলে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটিও একই পথ অনুসরণ করে চলেছে। চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক বোর্ডের অনুমোদন ব্যতীত বিল পরিশোধ করেছেন। ভবন বুঝে নেয়ার জন্য একটি উপ-কমিটি গঠন করা হলেও উপ-কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়াই চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি চূড়ান্ত বিল পরিশোধ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।
উল্লেখ্য, সাবেক নিবন্ধক ও মহাপরিচালক মো. মজিদ নিজে প্রকল্প পরিদর্শন করে মন্তব্য করেছেন এই প্রকল্প পরিচালনা করার মতা কালব-এর নেই, সেজন্য প্রকল্প বিক্রয় করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তা সত্ত্বেও বর্তমান বোর্ড ওই প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে ১০ কোটি টাকার অধিক ব্যয় করেছে। এর বেশিরভাগই বোর্ডে অনুমোদন হয়নি।
দ্বিতীয় পর্যায়ে এই প্রকল্পে সর্বশেষ নির্মাণব্যয়ের জন্য ১৪ কোটি টাকা ব্যয় বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। গঠিত উপকমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ সম্পাদনের প্রক্রিয়া করা হয়। চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী মতার অপব্যবহার করে উপকমিটিতে একক সিদ্ধান্তে শিশু ও নারী নির্যাতন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেন। বোর্ডের ১০ জন সদস্য প্রতিবাদ করে ওই আসামিকে কমিটি থেকে বাদ দেয়ার প্রস্তাব করলেও ঢাকী তাকে বাদ দেননি। নানা অভিযোগের কারণে সাব-কমিটি থেকে অধিকাংশ বোর্ড সদস্যই পদত্যাগ করেছেন।
বিগত ব্যবস্থাপনা কমিটি এরিয়ান কোম্পানিতে ২০ কোটি টাকার শেয়ার ক্রয়, ৭৭ কোটি টাকা অবৈধভাবে ঋণ প্রদান করেছে। চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক উক্ত টাকা উদ্ধারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা না রাখায় বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কথিত আছে, বর্তমান চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি প্রাক্তন চেয়ারম্যান সাইমন এ পেরেরার সাথে আঁতাত করে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা না করে তাকে দেশের বাইরে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করে। পালিয়ে যাওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
বাজেটের বাইরে বিদেশ থেকে বিলাসি গাড়ি আমদানি করা হয়েছে, যার মূল্য দেখানো হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৪০ ল টাকা, যা বাজারমূল্যের চেয়ে প্রায় ৫০ ল টাকা বেশি। প্রতি মাসে এই গাড়ির পেছনে প্রায় ৫ ল টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০ ল টাকা ব্যয় করে কালবকে আরো তির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এ গাড়ি ক্রয় নিয়ে বোর্ডে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে। গাড়ি ক্রয়ের বিষয়টি বোর্ডে অনুমোদনই হয়নি। বোর্ড সভায় উক্ত গাড়ি ক্রয়ের বিষয়টি অনুমোদন না হওয়ায় চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত প্রদান করেন ‘গাড়ি ক্রয়ের বিষয়ে ভবিষ্যতে কোনো প্রশ্ন উত্থাপিত হলে চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে উক্ত দায় বহন করবেন।’
জানা গেছে, সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক কালবকে তার নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছেন। তার নিজের ক্রেডিট ইউনিয়ন থেকে প্রতি মাসে ‘সম্প্রীতি’ নামক সরকারি ডিকারেশন ছাড়া মাসিক পত্রিকা বের করেন। প্রতি সংখ্যার পেছনের কভারে কালব-এর বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে কালব থেকে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। উক্ত বিজ্ঞাপন ছাপানোর জন্য কালব বোর্ডের কোনো অনুমোদন নেই। চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী একক মতায় উক্ত বিজ্ঞাপন ছাপানোর বিল দিয়ে কালব-এর আর্থিক তি করছেন, যার দায়ভার জোনাস ঢাকী ও মালেকের ওপর বর্তায়।
এখানেই শেষ নয়, সম্প্রীতি পত্রিকা কালব-এর প্রত্যেক উপজেলা অফিসে পাঠিয়ে কালব কর্মীদের জোরপূর্বক বাধ্য করা হয় সদস্য ক্রেডিট ইউনিয়নের কাছে বিক্রি করার জন্য। কালব-এর কোনো প্রোডাক্ট না হওয়া সত্ত্বেও জোনাস ঢাকীর প্ররোচনায় মালেক সাহেব এই অবৈধ কাজ করে যাচ্ছেন। কালবকে তার ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে নিয়েছেন।
জানা গেছে, জুলাই ’১৮ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা তি হচ্ছে কালবের। কালব চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি মতার অপব্যবহার করে প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজর নিয়োগ করে তাকে প্রতি মাসে ১ ল ৫০ হাজার টাকা সম্মানী দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত ও দলীয় কাজে তাকে ব্যবহার করছেন। বোর্ড সভায় প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজরের নিয়োগ বাতিল প্রস্তাব দিলেও তারা বিভিন্ন কায়দা করে ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, যা অনেকেই বুঝে উঠতে পারেন না। অথচ প্রোগ্রাম অ্যাডভাইজরকে দিয়ে কালব-এর উন্নয়নমূলক কোনো কাজই হচ্ছে না, বরং দিন দিন প্রতিষ্ঠানের তির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কালব একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হলেও চেয়ারম্যান ও সেক্রেটারি কালবকে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি মনে করে বোর্ড সদস্যদের বাদ দিয়ে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বোর্ড সদস্যদের তোয়াক্কা না করে তাদের সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দিচ্ছেন। বোর্ড সদস্যগণ বহুবার প্রতিবাদ করলেও কোনো ফল হয় না।
বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি টাকা তি সত্ত্বেও জোনাস ঢাকী ও এমদাদ হোসেন মালেক বোর্ডের অনুমোদন ছাড়াই মতার অপব্যবহার করে কালব-এর টাকা তছরূপ করে বিভিন্ন স্থানে মতবিনিময় সভার নামে নিজ দলীয় নির্বাচনি সভা করে ল ল টাকা ব্যয় করে কালব-এর তির পরিমাণ বৃদ্ধি করেই চলেছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ।
এভাবে জোনাস ঢাকী ও এমদাদ হোসেন মালেক ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে আজ প্রচুর অর্থ বিত্তের মালিক। জোনাস ঢাকী কানাডাতে বাড়ি কিনেছেন বলেও জানা গেছে। কানাডায় তার ২ মেয়ে বসবাস করে। তিনিও নিয়মিত কানাডা যাতায়াত করেন। ‘বেকার সমবায়জীবী’ নামে চিহ্নিত মালেক নামে বেনামে ফ্যাট ও প্লটসহ প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন।
কালব-এর চেয়ারম্যান জোনাস ঢাকী ও সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক-এর বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির নানা অভিযোগের বিষয়ে টেলিফোনে জানতে চাইলে তারা উভয়েই এ বিষয়ে স্বদেশ খবর-এর সাথে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। এমনকি টেলিফোনে সেক্রেটারি এমদাদ হোসেন মালেক ক্ষীপ্ত হয়ে স্বদেশ খবর প্রতিবেদককে বলেন, ‘সাংবাদিকদের সঙ্গে এত কথা বলার টাইম আমার নাই।’