কলাম

টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন সুষম বণ্টন

ড. আনু মাহমুদ
বিশ্বে সর্বাধিক এবং ধারাবাহিকভাবে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশগুলোর কাতারে নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ। এখন ল্য সর্বাধিক প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশে পরিণত হওয়ার।
মূলত এই এগিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতার শুরু ২০০৯ সাল থেকে। বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় প্রবৃদ্ধির হার ৬-তে ওঠে। তারপর ৭-এর ওপরে ওঠে। তখন থেকে প্রতি বছর প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে। অতি অল্প সময়ে বাংলাদেশ এটা অর্জন করতে পেরেছে। সরকার বলছে, বৃত্ত ভেঙে রেকর্ড গড়ছে প্রবৃদ্ধি। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রেকর্ড প্রবৃদ্ধি হলেও আশানুরূপ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গুণগত মান কমছে। এ প্রবৃদ্ধি যে পরিমাণ গরিব মানুষকে নিচ থেকে তুলে আনার কথা, তা পারেনি। এটি নিয়ে চিন্তার কারণ হচ্ছে একটি দেশে ক্রমে আয় ও সম্পদবৈষম্য বাড়লে আগে বা পরে প্রবৃদ্ধির হারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থাৎ বৈষম্য বেশি হলে প্রবৃদ্ধির হার উচ্চ দিকে যাওয়ার েেত্র অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এর মধ্যে প্রথমটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন। দ্বিতীয়টি মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানো এবং তৃতীয়টি হচ্ছে দারিদ্র্যের হার কমানো।
প্রকট বৈষম্যের এ সমাজে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির সুফল সবাই পাচ্ছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকদের মতে, জিডিপি বাড়লেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করছে। তাই ধনীরা সম্পদের পাহাড় গড়লেও সুযোগ-সুবিধার অভাবে দরিদ্ররা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে। সামাজিক বৈষম্যের এ দুষ্টচক্র ভাঙতে না পারলে সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
একদিকে দারিদ্র্য কমছে, অন্যদিকে ধনী-গরিবের মধ্যে আয়ের েেত্র বৈষম্য বাড়ছে Ñ এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়। মূলত সম্পদের অসম বণ্টন এবং অবৈধ আয়ের উৎসের কারণে আয়বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। জিডিপির ঊর্ধ্বগতির সুফল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেয়ার জন্য ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে। এজন্য ঘুষ, দুর্নীতি কর ফাঁকির বিষয়টি কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে হবে।
অর্থনীতির নির্ণায়ক হিসেবে এ প্রবৃদ্ধির হার যে বিপজ্জনক হতে পারে, তারও অনেক উদাহরণ আছে। এেেত্র আফগানিস্তানের কথাই ধরা যাক। কয়েক বছর ধরেই দেশটির প্রবৃদ্ধির হার অনেক বেশি। অর্থনীতির সাদামাটা বিচারে দেশটির অর্থনীতি খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। সত্যিই কি তাই! দেশটিতে মানুষের নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। তথাকথিত জঙ্গি সামলাতেই তাদের অবস্থা সঙ্গিন।
পাকিস্তানের েেত্র একই কথা প্রযোজ্য। পাকিস্তানে নিরাপত্তার জন্য যে ব্যয় করা হচ্ছে, তাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে যে চাহিদা তৈরি হচ্ছে, তা দিয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই বৃদ্ধি পাকিস্তানের জনগণের ভালোর জন্য কতটুকু অবদান রাখছে, তা দেখার দায়িত্ব কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধির নয়।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির আরেকটি নেতিবাচক দিক দেখা দিয়েছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোয়। চীন তিন দশক ধরে গড়ে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ভারতও দুই দশক ধরে প্রায় ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোতে পারেনি দেশ দু’টির দারিদ্র্যপীড়িত ও নিম্ন আয়ের বিশাল জনগোষ্ঠী। ফলে ধনী-গরিবের বৈষম্য বেড়েছে।
জিডিপি প্রবৃদ্ধির আড়ালে আমাদের অর্থনীতির বড় বড় দুর্বলতা ঢাকা পড়ে আছে। অর্থনীতির এসব দুর্বলতার মধ্যে একটি হচ্ছে আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা। রাষ্ট্রীয় খাতের ব্যাংকগুলোয় যেসব সমস্যা রয়েছে, তা ধীরে ধীরে সংক্রমিত হচ্ছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোয়ও। অথচ ব্যাংক হচ্ছে কোনো দেশের আর্থিক খাতের হৃদপি-। হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ অন্যান্য কোম্পানি কত টাকা নিয়ে গেল এবং এই টাকা জিডিপির তুলনায় কত কম বা বেশি, সেটা বড় বিষয় নয়, বড় বিষয় হচ্ছে এসবের মাধ্যমে পুরো আর্থিক খাতই আজ তিগ্রস্ত।
অর্থনীতির দ্বিতীয় দুর্বলতা হচ্ছে বাছবিচার বা মূল্যায়নহীন বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ। বড় অবকাঠামো আমাদের বেশ প্রয়োজন রয়েছে। তবে এগুলো মূল্যায়নের কাজটিও থাকা দরকার। বাস্তবায়নের একটা পরিকল্পনা থাকা দরকার, যার খুব অভাব আমরা দেখতে পাচ্ছি।
বিনিয়োগ পরিবেশ ভালো না থাকাটা আমাদের অর্থনীতির তৃতীয় বড় দুর্বলতা। এগুলোর মধ্যে বড় ব্যাপার হচ্ছে আস্থার অভাব। এেেত্র ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের উদাহরণ আমরা দিতে পারি। ফিলিপাইন অনেক সম্ভাবনার দেশ হওয়ার পরও তেমন উন্নতি করতে পারেনি। কারণ, দেশটির লোকেরা নিজেদের সম্পদ জমা রাখত যুক্তরাষ্ট্রে। আর থাইল্যান্ডের শিল্পপতিরা কখনোই তাদের সম্পদ বিদেশে নিয়ে যাননি। দেশটি এগিয়েছে নিজের শক্তিতেই। সম্পদ পাচার রোধে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা না নিলে বাংলদেশকেও এর খেসারত দিতে হবে।
বর্তমান সরকার যে দারিদ্র্য বিমোচনে তৎপর সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। নানা বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও অর্থনীতির ত্রেগুলোয় উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে। জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধিসহ কৃষি, শিা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, বাণিজ্য, বৈদেশিক আয় ইত্যাদি খাতেও ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। মানুষের সচেতনতাও বেড়েছে আগের তুলনায়।