প্রতিবেদন

ট্রেনসেবাকে অধিকতর আধুনিক ও নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্টদের আরো সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে

সাবিনা ইয়াছমিন
ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রীদের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য দু’টি গেট রয়েছে। গেট দু’টি ১ নম্বর ও ২ নম্বর গেট নামে পরিচিত। দু’টি গেটের ওপরই রয়েছে দু’টি সুদৃশ্য ইলেকট্রনিক ঘড়ি। দু’টি ঘড়ি দুই ধরনের সময় পরিবেশন করে। গত ১৪ নভেম্বর দেখা গেছে ১ নম্বর গেটের ঘড়িটি যখন ৮.৩০টা প্রদর্শন করছে, তখন ২ নম্বর গেটের ঘড়িটিতে বাজছে ৮.৪১টা। পাশাপাশি দু’টি গেটের দু’টি ঘড়িতে ১১ মিনিটের ব্যবধান। এই ব্যবধান এক দুই দিনের নয়, দীর্ঘ ১০ মাসের।
নতুন রেলমন্ত্রী হিসেবে নুরুল ইসলাম সুজন দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ঘড়ি দু’টিতে ১১ মিনিট ব্যবধানের এই অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। এই ১০ মাসে রেলমন্ত্রী, রেল সচিব বেশ কয়েকবারই কমলাপুরে অবস্থিত ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন পরিদর্শনে গিয়েছেন। তাদের চোখে এই অসঙ্গতিটি ধরা পড়েনি। স্টেশন ম্যানেজারসহ সারাদিন রেলের শত শত কর্মকর্তা-কর্মচারী স্টেশনে ঘোরাঘুরি করেন। সবার চোখ এড়িয়েই দিনের পর দিন ঘড়ি দু’টি দুই ধরনের সময় পরিবেশন করে যাচ্ছে।
নতুন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম দায়িত্বে আসার পর থেকেই ঘড়ির মতো অনেক অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়েতে। সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের দায়িত্বের সময় একটি বিষয় নিশ্চিত ছিল যে, নির্ধারিত সময়ের ১ মিনিট পরে গেলেও নির্ধারিত ট্রেন পাওয়া যেত না। অর্থাৎ ঘড়ি ধরে প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ঢাকা স্টেশন থেকে ছেড়ে যেত। নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছাড়ার বিষয়টি গত ৮/৯ মাস ধরে একেবারেই অনুপস্থিত। ‘নয়টার ট্রেন কয়টায় ছাড়ে’ বিষয়টি যখন যাত্রীরা এক প্রকার ভুলতে বসেছিল, তখনই নতুন রেলমন্ত্রী আসার পর থেকে বিষয়টি আবার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এখন আধা ঘণ্টা পরও ঢাকা স্টেশনে এসে এক ঘণ্টা আগে ‘ছেড়ে যাওয়া’ ট্রেন পাওয়া যায়। বলা যায়, ট্রেনের শিডিউলের ভয়াবহ বিপর্যয় চলছে এখন। গত ঈদুল আজহায় এই শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে একটি ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করতে হয়েছিল। কোনো রেলমন্ত্রীর আমলেই ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনে এমন ঘটনা ঘটেনি।
ঘড়ি ও রেলের টাইম-টেবিল বিপর্যয়ের মতো অনেক অসঙ্গতিই দেখা যাচ্ছে রেলওয়েতে। সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের কোনো অভিযোগ যেমন ওঠেনি, তেমনি তার সময়ে ট্রেন ছাড়ার টাইম-টেবিলে ছিল শৃঙ্খলা। কিন্তু এখন টাইম-টেবিলে যেমন শৃঙ্খলা নেই, তেমনি শোনা যাচ্ছে দুর্নীতি ও পরিবারতন্ত্রের কথাবার্তাও। কিছু রেল কর্মচারীর ভাষায়, ‘রেল চালায় আসলে রেলমন্ত্রীর ভাগিনায়’।
রেলে যে এক বা একাধিক বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে, তা গত কয়েক মাস ধরে যাত্রী ও রেল কর্মচারীদের মুখ থেকে শোনা যাচ্ছিল। ১২ নভেম্বর থেকে ১৪ নভেম্বর মাত্র ২ দিনের ব্যবধানে বড় দু’টি দুর্ঘটনায় তাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। অনেকে বলছেন, রেলে চরম অসঙ্গতি বিরাজ করছে। আগে থেকে বিরাজ করা দুর্নীতি এখন আরো পোক্ত হয়েছে। রেল ভ্রমণ আরামদায়ক ও আধুনিক করার চেয়ে, রেলের বেহাত হওয়া জমি উদ্ধারে বেশি ব্যস্ত রেল প্রশাসন।
কেউ কেউ বলছেন, রেল দুর্ঘটনার জন্য কুয়াশা, শীত মৌসুম, নাশকতা ইত্যাদিকে দায়ী না করে গোড়াতে হাত দিতে হবে। গত প্রায় ১ বছরে রেলে যে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি ডালপালা বিস্তার করেছে তার লাগাম টেনে ধরতে না পারলে ‘মন্দবাগ’ ও ‘উল্লাপাড়া’ দুর্ঘটনার মতো একের পর এক বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে।

মন্দবাগ দুর্ঘটনা
১২ নভেম্বর ভোর প্রায় ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেল স্টেশনে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেন তূর্ণা-নিশীথা সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেন উদয়ন এক্সপ্রেসের পেছনের ৩টি বগিতে প্রচ- গতিতে আঘাত হানে। এতে উদয়নের ২টি বগি কাগজের মতো দুমড়ে-মুচড়ে যায়। তিগ্রস্ত হয় আরেকটি বগি। তূর্ণা-নিশীথার ইঞ্জিনও তিগ্রস্ত হয়। আর এ ঘটনায় ঝরে পড়ে ৭ জন পুরুষ, ৬ জন নারী ও ৩টি শিশুসহ ১৬টি প্রাণ। আহত হয়ে পঙ্গুত্বের পথে পা বাড়ান শতাধিক যাত্রী।
এই দুর্ঘটনা সড়ক বা জলপথের মতো অনিরাপদ চলাচলের কারণে হয়নি। এ দুর্ঘটনার জন্য আন্তঃনগর ট্রেন তূর্ণা-নিশীথার চালকের সিগন্যাল অমান্য করাকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে এর গভীরে লুকিয়ে আছে আরো লোমহর্ষক তথ্য।
জানা গেছে, তূর্ণা-নিশীথার চালক তাহের উদ্দিন ও সহকারী চালক অপু দে দুজনই অটো ব্রেক সিস্টেম বা প্যাডেলে ইট চাপা দিয়ে ঘুমাচ্ছিল। আর ট্রেন চলছিল নিজস্ব গতিতে। এ অবস্থায় ট্রেন সিগন্যাল মানবে কি করে? ট্রেনের তো আর নিজস্ব চোখ নেই! যে চোখ ট্রেন চালানোর দায়িত্বে ছিল সেটি ছিল ঘুমের ঘোরে। যাকে বলা হয় দায়িত্বহীনতা, অবহেলা।
জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকাগামী তূর্ণা-নিশীথা ১২ নভেম্বর ভোর রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা হয়। মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার জন্য লালবাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেয় তূর্ণা-নিশীথাকে (ট্রেন নম্বর ৭৪১)।
অপরদিকে, সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭২৪) কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশপথে স্টেশন মাস্টার তাকে মেইন লাইন ছেড়ে দিয়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেন। ওই ট্রেনের ইঞ্জিনসহ ৬টি বগি ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করার পর পেছনের ৩টি বগি মেইন লাইনে থাকতেই তূর্ণা-নিশীথার চালক সিগনাল (সংকেত) অমান্য করে দ্রুত গতিতে এসে ওই ট্রেনের শেষ ৩টি বগির মধ্যেরটিতে আঘাত করে। এতে উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ওই বগির ১০ যাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায় আরো ৬ জন। আহত হন শতাধিক যাত্রী। কিন্তু ইঞ্জিন ছাড়া তূর্ণা-নিশীথার কোনো তি হয়নি। ট্রেনের সব বগি অত অবস্থায় মেইন লাইনে ছিল।
এ দুর্ঘটনার জন্য দুই চালক ও তূর্ণা-নিশীথার গার্ডকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপ। কিন্তু প্রশ্ন, তাদের স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হলেও কি স্বজনদের ফিরে পাবেন সেই পরিবারগুলো? আহতদের অন্ধকার জীবনে কি পারবেন সেই সোনালী আলো ফিরিয়ে দিতে?
এই দুর্ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে মানুষের নিরাপদ ট্রেন যাত্রা নিয়ে। বিশ্বাস ভেঙেছে Ñ এমন মন্তব্য এখন মানুষের মুখে। বাস ও লঞ্চ যাত্রার মতো ট্রেনযাত্রায়ও আতঙ্ক বেড়েছে মানুষের, যার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে দুর্ঘটনার দিন থেকেই।

উল্লাপাড়া দুর্ঘটনা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২ দিনের মাথায় ১৪ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুর্ঘটনায় পড়ে রংপুর এক্সপ্রেস। এতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও ৮টি বগি লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনায় ট্রেনের ইঞ্জিন, পাওয়ার কার, একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চেয়ার বগি ও একটি শোভন চেয়ার বগিতে আগুন ধরে যায়।
উল্লাপাড়া স্টেশনে পয়েন্টিং সিগন্যালের ত্রুটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
দুপুর ২টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উদ্ধারকাজ চালান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আগুন ধরার খবর পেয়ে উল্লাপাড়া ও শাহাজাদপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশন থেকে ৬টি ইউনিট এসে আধা ঘন্টার মধ্যে আগুন নিভিয়ে ফেলে। এ ঘটনায় ট্রেনের লোকোমাস্টার তারেক, সহকারী লোকোমাস্টার মোশারফসহ ৩০ যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দুর্ঘটনা তদন্তে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় ট্রেনের ইঞ্জিন মূল লাইন থেকে ১৫ ফুট দূরে ছিটকে পড়ে আগুন ধরে যায়। ওই আগুন ইঞ্জিনের সঙ্গে থাকা ১টি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত বগিতে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত উদ্ধারকারীরা বগির জানালার গ্লাস ভেঙ্গে যাত্রীদের টেনে-হিঁচড়ে বের করেন। এছাড়া ট্রেনের পাওয়ার কার ও অন্য একটি বগিতে আগুন ধরে যায়।
এ ব্যাপারে উল্লাপাড়া রেল ষ্টেশনের মাস্টার রফিকুল ইসলাম জানান, রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ২নং লাইনে যাওয়ার জন্য সিগন্যাল দেয়া ছিল। কিন্তু ট্রেনটি ফেস পয়েন্টে এসেই ঝাঁকুনি দিয়ে উপরে উঠে ১নং লাইনে ঢুকে পড়ে এবং দুর্ঘটনা কবলিত হয়।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন এ ব্যাপারে বলেছেন, রেললাইনের সিগন্যালের সিম পয়েন্ট নামে যে অংশটি ট্রেনকে এক লাইন থেকে অন্য লাইনে যেতে সাহায্য করে, সেখানে কোনো ত্রুটি থাকতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি। এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা রিপোর্ট দিলে হয়তো পুরোপুরি বলা যাবে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রেল দুর্ঘটনা কেন
সাধারণত দুটি কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে। টেকনিক্যাল এরর (কারিগরি ত্রুটি) ও হিউম্যান এরর (মনুষ্য ভুল)। গত কয়েক বছরের মানুষের ভুলের কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা বেড়ে গেছে। রেল কর্তৃপরে ২০১৮ সাল পর্যন্ত করা হিসাবে, ১০ বছরে ৩ হাজার ৪৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে যাতে প্রায় ৪শ যাত্রীর প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালের পর থেকে হিউম্যান এরর বেশি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং সুপারিশ জমা দেয়া হয়। সে অনুযায়ী পদপে নিলে ট্রেনদুর্ঘটনা হয়ত এড়ানো যেত।
গত ১০ বছরে রেলের দুর্ঘটনার নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, উভয় ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ, পাশাপাশি ট্রেনের ধাক্কা, চলন্ত ট্রেন বিভক্ত হয়ে পড়া, লেভেল ক্রসিংগেটের দুর্ঘটনা, সিগন্যাল অমান্য, লাইনচ্যুতির ফলে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
অভিযুক্ত ট্রেন চালক তাছেরউদ্দিন মন্দবাগ দুর্ঘটনা নিয়ে রেলের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের জানান, ট্রেনটির গতি ছিল ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার। স্টেশনে আসার পর কুয়াশার কারণে সিগন্যাল দেখতে না পাওয়ায় দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি। দুর্ঘটনার আগে ট্রেনটির গতি ছিল ২০ কিলোমিটার। উদয়ন এক্সপ্রেসের সঙ্গে ধাক্কা লাগার আগমুহূর্তে ব্রেক কষা হলেও ট্রেনটি পুরোপুরি থামানো যায়নি।
রেলের একজন কর্মকর্তা স্বদেশ খবরকে বলেন, ট্রেন বিজ্ঞানসম্মতভাবে চলে। একটি ট্রেন স্টেশনে অপেমান অবস্থায় একই লাইনে আরেকটি ট্রেন প্রবেশের সুযোগ নেই। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বিপরীতমুখী ট্রেনকে থামার সংকেত দেয়া হয় এবং এমন সংকেতে ভুল হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এসব কারণে মনে হচ্ছে, এ দুর্ঘটনায় তূর্ণা নিশিথার চালকেরই দোষ।
সংশ্লিষ্টরা জানান, উদয়ন এক্সপ্রেসের বগিতে ধাক্কা মেরেছে তূর্ণা নিশিথা। এটি মুখোমুখি সংঘর্ষ নয়। একে রেলের ভাষায় বলে সাইড কল্যুশন। তূর্ণা নিশিথার চালকের ঘুমিয়ে পড়া বা সহকারীকে দিয়ে ট্রেন চালনার ঘটনা ঘটেছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে তদন্ত কমিটি। যদিও চালক জানিয়েছেন কুয়াশায় সিগন্যাল দেখতে পাননি।
তদন্ত কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত ডিউটির কারণে চালকের তন্দ্রাভাব এসেছিল কিনা তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে, চালক চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টা বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছিলেন। তাহলে কেন তিনি অমনযোগী ছিলেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
মন্দবাগ ট্রেন দুর্ঘটনার পর চালকের গাফলতির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি। এ দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রেলে যারা কাজ করেন, তাদের আরও শক্ত (দ) করা উচিত এবং সেই সঙ্গে রেলচালকদের প্রশিণ প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, জানি না কেন, শীত মৌসুম এলে শুধু আমাদের দেশেই নয়, সমগ্র বিশ্বেই রেল দুর্ঘটনা দেখা যায়।

দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণ
গত অক্টোবরে চালক ছাড়াই ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীতে যায় পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেন। ওই ঘটনায় দায়ী ৩ জনকে তাৎণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় কর্তৃপ। বরখাস্তকৃতরা হলো, ঈশ্বরদী রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক লোকোমাস্টার (এলএম) আসলাম উদ্দিন খান মিলন, শ্রমিক লীগের একই কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও ওই ট্রেনের সহকারী লোকো মাস্টার (এএলএম) আহসান উদ্দিন আশা এবং ট্রেনের পরিচালক (গার্ড) আনোয়ার হোসেন।
ওই ঘটনার পর সারা দেশে ট্রেনচালকদের দায়িত্বহীনতার বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বলা হয়, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় এসব চালক-শ্রমিকের বিরুদ্ধে কখনোই ব্যবস্থা নিতে পারে না রেল কর্তৃপ।
একাধিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম ধরা পড়ে।
২০১৮ সালের ১৫ এপ্রিল টঙ্গী-বিমানবন্দর এলাকায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের জিএস রুলের সংশ্লিষ্ট ধারা মানার তাগিদ দেয়া হয়। সিগন্যালিং ত্রুটি ধরা পড়ে ওই দুর্ঘটনায়।
চলতি বছরের ২৩ জুন দুর্ঘটনা ঘটায় উপবন এক্সপ্রেস। এ েেত্রও হিউম্যান এরর পাওয়া গেছে। এসব দুর্ঘটনার নেপথ্যে অপারেটিং বিভাগে লোকবলের স্বল্পতাও বড় কারণ। মেকানক্যিাল বিভাগের অধীন ট্রেনচালক পদেও জনবল সংকট রয়েছে। অতিরিক্ত ডিউটি করতে হয় চালকদের। একদিকে
ট্রেন বাড়লেও অন্যদিকে কমছে চালকের সংখ্যা।
অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, রেলে ১ হাজার ৭৪২টি পদ রয়েছে ট্রেন চালকের। এর মধ্যে ৬১৬টিই শূন্য। এর মধ্যে প্রথম ধাপে মানে গ্রেড-২ অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকোমাস্টারের (এএলএম) ৩৮৮টি পদের মধ্যে শূন্য ১৭০টি। একজন সহকারী লোকোমাস্টার কয়েক বছর পর লোকোমাস্টার হিসেবে পদোন্নতি পান। এজন্য পরীায় উত্তীর্ণ হওয়ার ধাপ রয়েছে। এছাড়া ট্রেন চালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদ স্টেশন মাস্টার। এেেত্র ১ হাজার ২০৫টি পদের বিপরীতে ৪৪৯টিই শূন্য। তদুপরি ৫০ জন স্টেশনমাস্টার দায়িত্ব পালন করছেন চুক্তির ভিত্তিতে। অথচ স্টেশনমাস্টার পদে দায়িত্ব পেতে কয়েক বছর অপো করতে হয়। ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত পয়েন্টসম্যানের ১ হাজার ৪৪৫টি পদের মধ্যে ১৫৪টি শূন্য এবং পোর্টারের ৫৪৭টি পদের মধ্যে ২৩৮টি শূন্য।
মন্দবাগ স্টেশনে যে দুর্ঘটনা ঘটে, সেটি ‘বি’ কাস স্টেশনের। রেলে বি কাস, ডি কাস ও হল্ট Ñ এ তিন শ্রেণির স্টেশন রয়েছে। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ট্রেন অতিক্রম করতে লাইন কিয়ারেন্সের দরকার হয়। রেলে বি কাসের ৩৪৫টি, ডি কাসের ১০২টি এবং হল্ট কাসের ১৫টি স্টেশন রয়েছে। সব মিলিয়ে চালু স্টেশন ৩৫৪টি আর বন্ধ ১১২টি রেলস্টেশন।
লোকবলের এত সংকটের মধ্যেও জানা গেছে, রেলের চলমান নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সংস্থাটির নিয়োগ প্রক্রিয়া চলে ১৯৮৫ সালের বিধির মাধ্যমে। তবে এ নিয়োগবিধি অবৈধ বলে সম্প্রতি মত দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।
রেলের সেবাপ্রদান ও নিরাপত্তার জন্য এ এক দুঃসংবাদই বটে।

রেলপথে বড় বড় যত দুর্ঘটনা
এর আগে দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে ১৯৮৯ সালে টঙ্গীতে। ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ১৭০ জন। আহত হন চার শতাধিক মানুষ। ৩০ বছর আগে সেই দুর্ঘটনাও ছিল দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে।
এরপর চট্টগ্রাম লাইনে কয়েকটি মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণ গেছে শতাধিক যাত্রীর।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি ও রেল নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা বলছেন, সিগন্যালের দুর্বলতায় মুখোমুখি সংঘর্ষে ও লাইনচ্যুতির কারণে প্রাণ গেছে যে সহস্রাধিক মানুষের, চাইলেই তা এড়ানো সম্ভব ছিল।
স্প্যান ভেঙ্গে পড়ে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাটি ঘটে ১৯৮৩ সালের ২২ মার্চ ঈশ্বরদীতে। সেতুর স্প্যান ভেঙ্গে কয়েকটি বগি নিচে শুকনা জায়গায় পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় ৬০ জন যাত্রী নিহত হন।
পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রাম রেললাইনে গত ৩০ বছরে কয়েকটি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালে ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কাছাকাছি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ১৩ জন নিহত ও ২০০ জন আহত হন। একই লাইনে ২০১০ সালে নরসিংদী স্টেশনে চট্টগ্রামগামী আন্তঃনগর ট্রেন ‘মহানগর গোধূলী’ ও ঢাকাগামী মেইল ‘চট্টলা’র মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। এ ঘটনায় চট্টলা ট্রেনের একটি বগি মহানগর ট্রেনের ইঞ্জিনের ওপরে উঠে যায়। সেই দুর্ঘটনায় চালকসহ ১২ জন নিহত হয়েছিলেন।
এছাড়া উত্তরবঙ্গেও বেশকিছু ট্রেনদুর্ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ‘হিলি ট্র্যাজেডি’ নামে পরিচিত ১৯৯৫ সালের ১৩ জানুয়ারি গোয়ালন্দ থেকে পার্বতীপুরগামী ৫১১ নম্বর লোকাল ট্রেনটির দুর্ঘটনা অন্যতম। এ ঘটনায় পার্বতীপুরগামী ট্রেনটি হিলি রেলস্টেশনের এক নম্বর লাইনে এসে দাঁড়ায়। এর কিছুণ পর সৈয়দপুর থেকে খুলনাগামী আরেকটি আন্তঃনগর সীমান্ত এক্সপ্রেস একই লাইনে ঢুকে পড়ে। এসময় মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটলে অর্ধশতাধিক যাত্রী নিহত হন।