প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে পিকেএসএফ লাভ করেছে শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) আয়োজিত ‘উন্নয়ন মেলা-২০১৯’ উদ্বোধন হয়েছে ১৪ নভেম্বর। প্রধান অতিথি হিসেবে মেলা উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, স্বাধীনতার পরপরই জাতির পিতা ুদ্র ঋণ কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। মানুষকে কিভাবে সমবায়ের মাধ্যম একত্রিত করে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করে তাদের দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে আনবেন, সেই পরিকল্পনাই জাতির পিতা নিয়েছিলেন।
পিকেএসএফ আয়োজিত উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কল্যাণে নিরলস কাজ করে পিকেএসএফ ইতোমধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রান্তিকগোষ্ঠী ও পিকেএসএফ-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে ৭ দিনব্যাপী এ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। মেলা ২০ নভেম্বর পর্যন্ত সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন এবং পিকেএসএফ চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। পিকেএসএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে কৃষকদের কল্যাণ ও দারিদ্র্য নিরসন এবং কৃষির উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সম্মাননা স্মারক মতিয়া চৌধুরীর হাতে তুলে দেন। পুরস্কার হিসেবে একটি সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট ও ৫০ হাজার টাকার চেক দেয়া হয়।
গ্রামীণ এলাকা থেকে পিকেএসএফ-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, গবেষণা ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সেবামুখী সংগঠনসহ ১৩০টি সংস্থার ১৯০টিরও বেশি স্টল উন্নয়ন মেলায় স্থান পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে পিকেএসএফ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ছাড়াও শিা, স্বাস্থ্য, দতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি প্রভৃতি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে দেশ-বিদেশে একটি শীর্ষস্থানীয় উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করেছে। বর্তমানে ১ কোটি ৪০ লাখ দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারকে পিকেএসএফ বিভিন্ন কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ফাউন্ডেশন দেশের ২০২টি ইউনিয়নে ‘সমৃদ্ধি’ নামের কর্মসূচির মাধ্যমে স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিাসহ জীবন ও জীবিকাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সমন্বিত করে একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। বয়স্ক মানুষের জীবন-মানোন্নয়নে বাস্তবায়ন করছে ‘প্রবীণ কর্মসূচি’। এছাড়া পিকেএসএফ দেশের কৃষি খাতে আর্থিক পরিসেবার পাশাপাশি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজার সংযোগসহ কৃষির বিভিন্ন উপখাতের ভ্যালু চেইন ও দ উদ্যোক্তা উন্নয়নে কাজ করার মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিতে বিশেষ অবদান রাখছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নেই সবসময় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সরকার বরাবর দারিদ্র্য বিমোচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সরকারের বহুমুখী কর্মতৎপরতার ফলে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২০০৬ সালে ৪১.৫ শতাংশ থেকে বর্তমানে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। সরকারের চলতি মেয়াদের মধ্যেই দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, সরকার পিকেএসএফ-এর কার্যক্রমকে ুদ্রঋণের গ-ি থেকে বের করে সামগ্রিক উন্নয়নের পথে পরিচালিত করেছে। পিকেএসএফ তার সহযোগী সংস্থাগুলোর সদস্যদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন ও বিপণনের জন্য যে উন্নয়ন মেলার আয়োজন করেছে, তা আগামীতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে বলে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলধারায় সংযুক্ত করার েেত্র পিকেএসএফ-এর প্রচেষ্টা সামগ্রিকভাবে সফল হয়েছে। পিকেএসএফের প্রতিষ্ঠালগ্নে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮.৮ শতাংশ, যা ২০১৮ সালে ২১.৮ শতাংশে নেমে এসেছে এবং এই অভাবনীয় সফলতায় পিকেএসএফ-এর অবদান অসামান্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। সবশেষে অর্থমন্ত্রী প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত পণ্যের সম্প্রসারণে আয়োজিত পিকেএসএফ মেলার সফলতা কামনা করেন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় পিকেএসএফ ুদ্রঋণ কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র, রূপকল্প ২০২১-সহ সরকারি বিভিন্ন নীতিমালার সাথে সমন্বয় রেখে উপযুক্ত অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানে বিবর্তিত হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি পিকেএসএফ ১৮ লাখ ুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে বলে তিনি জানান।
পিকেএসএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সাবেক সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ বলেন, পিকেএসএফ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনসহ সরকারের অন্যান্য দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়ায় সরকারের সহায়ক হিসেবে কাজ করছে এবং তা অব্যাহত থাকবে। পিকেএসএফ-এর ভবিষ্যৎ দারিদ্র্য বিমোচন কার্যক্রমে সরকারের সার্বিক সহায়তা বৃদ্ধি পাবে বলে মঈনউদ্দিন আবদুল্লাহ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পিকেএসএফ সূত্রে জানা যায়, দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনে গতি সঞ্চারের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থায়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি শিা, স্বাস্থ্যসেবা, দতা উন্নয়ন, জলবায়ুপরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, সামাজিক নিরাপত্তা ও দরিদ্র মানুষ বিশেষ করে নারীর মতায়নে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সমাহারে টেকসই উন্নয়ন ল্য অর্জনের ল্েয পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন, পিকেএসএফ অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। দেশব্যাপী এ প্রতিষ্ঠানটি তার সহযোগী সংস্থাসমূহের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সহযোগী সংস্থাসমূহের সদস্যগণ বিভিন্ন আর্থিক পরিষেবা ও অন্যান্য কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে, যার মাধ্যমে নিজস্ব ও মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও দরিদ্র মানুষ বিশেষ করে নারীর মতায়ন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দারিদ্র্যের তীব্রতা ও গভীরতার তারতম্যের আলোকে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের বিষয়টি পিকেএসএফ-এর আর্থিক ও অন্যান্য সেবা কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।
জানা যায়, টেকসই উন্নয়ন ল্য অর্জনে সরকারের সহায়ক হিসেবে পিকেএসএফ বিভিন্ন েেত্র বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ‘ পিপলস ভয়েস: স্ট্রেংথদেনিং এসডিজি ইমপ্লিমেন্টেশন ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে। এ প্ল্যাটফর্ম হতে সরকারের নীতিমালা, দিকনির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনার আলোকে টেকসই উন্নয়ন ল্য অর্জনে পিকেএসএফ বিভিন্ন কর্মকা- পরিচালনা করছে।
পিকেএসএফ-এর আর্থিক কার্যক্রম ও উদ্যোগ উন্নয়ন সম্পর্কে জানা যায়, সারাদেশে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থার সংখ্যা ২৭৮টি। সংস্থাসমূহের সংগঠিত মোট সদস্য সংখ্যা ১ দশমিক ৪০ কোটি, যার মধ্যে ৯১ শতাংশের বেশি নারী। মাঠ পর্যায়ে আর্থিক পরিষেবা গ্রহণকারী সদস্য সংখ্যা ১ দশমিক ৮ কোটি, যার মধ্যে নারী সদস্য ৯২ শতাংশ। সংস্থাটির শুরু থেকে জুন ২০১৯ পর্যন্ত সহযোগী সংস্থা পর্যায়ে ক্রমপূঞ্জীভূত আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৩৪ হাজার ৭৪৬ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা এবং ঋণ আদায় হার ৯৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সদস্য পর্যায়ে ক্রমপূঞ্জীভূত আর্থিক সহায়তার পরিমাণ ৩ লাখ ৫৭ হাজার ২৬৫ দশমিক ৫১ কোটি টাকা এবং ঋণ আদায় হার ৯৯ দশমিক ৬২ শতাংশ।
ইনহেনসিং রিসোর্সেস অ্যান্ড ইনক্রিজিং ক্যাপাসিটিস অব পুওর হাউজহোল্ডস টুয়ার্ডস ইলিমিনেশন অব দেয়ার পোভার্টি (ঊঘজওঈঐ) প্রকল্পের আওতায় পিকেএসএফ প্রকৃতঅর্থে দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিা, প্রশিণসহ মানব জীবনধারণের প্রতিটি পর্যায়ে অর্থাৎ মাতৃগর্ভ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনচক্রের প্রতিটি ধাপকে ধারণ করে একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ২০১০ সাল থেকে ‘দারিদ্র্য দূরীকরণের ল্েয দরিদ্র পরিবারসমূহের সম্পদ ও সমতা বৃদ্ধি (সমৃদ্ধি)’ শীর্ষক একটি সমন্বিত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ‘উন্নয়ন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’-এ ধারণায় সরকারের সর্বনিম্ন প্রশাসনিক স্তর ‘ইউনিয়ন’-কে বিবেচনায় রেখে নির্বাচিত ইউনিয়ন, সহযোগী সংস্থা ও পিকেএসএফ-এর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে যৌথভাবে এ কর্মসূচি বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার ১৬৪টি উপজেলার ২০২টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মসূচির আওতায় পিকেএসএফ-এর ১১৬টি সহযোগী সংস্থার ৩৭৬টি শাখার মাধ্যমে ১২ দশমিক ৪৭ ল খানার প্রায় ৫৬ দশমিক ৯২ ল সদস্যকে বিভিন্ন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়েছে এবং নানাবিধ সেবা প্রদান করা হচ্ছে। ওই ইউনিয়নসমূহে স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি, শিাসহায়তা, যুব উন্নয়ন, ভিুক পুনর্বাসন, বন্ধুচুলা ও সৌরবিদ্যুৎ, সমৃদ্ধিকেন্দ্র স্থাপন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, সমৃদ্ধ বাড়ি তৈরি, বিশেষ সঞ্চয় ও আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সমৃদ্ধি কর্মসূচির স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের আওতায় ৩৭৪ জন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ২ হাজার ৬৩৪ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক নিয়োজিত রয়েছেন যারা স্ট্যাটিক কিনিক, স্যাটেলাইট কিনিক এবং স্বাস্থ্য-ক্যাম্পের মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত সেবা প্রদান করেন। এছাড়া চু ক্যাম্পের মাধ্যমে ২২ হাজার ১২ জন রোগীর বিনামূল্যে চোখের ছানি অপারেশন করা হয়েছে।
প্রাথমিক স্তরের শিার্থীদের মানোন্নয়ন ও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরেপড়া রোধে শিাসহায়তা বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ২০২টি ইউনিয়নে ৬ হাজার ৬০৬টি শিাকেন্দ্রের মাধ্যমে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬১৬ জন ছাত্রছাত্রীকে নিয়মিত বৈকালিক পাঠদান করা হচ্ছে। এ কার্যক্রম পরিচালনার ফলে বর্তমানে সমৃদ্ধিভুক্ত ইউনিয়নে ছাত্রছাত্রীদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরেপড়ার হার শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে।
বসতবাড়ির জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারের আয় বৃদ্ধি ও পুষ্টিস্তর উন্নতকরণের ল্েয ফলদ, বনজ, ওষুধি গাছ, সবজি বাগান, মাছ চাষ, পশু-পাখি পালন এবং বাড়ির সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পরিচ্ছন্নতা ও ফুল বাগান তৈরির মাধ্যমে ৫ হাজার ৪৫৭টি বাড়িকে সমৃদ্ধ বাড়িতে রূপান্তর করা হয়েছে। মানবকেন্দ্রিক এ কর্মসূচির মূল দর্শনই হচ্ছে কাউকেই বাদ দিয়ে নয়, বরং সকলের অংশগ্রহণে উন্নয়ন টেকসই করা।
এ দর্শনকে ধারণ করে সমৃদ্ধি কর্মসূচির আওতায় জনপ্রতি ১ ল টাকা মূল্যের আয়বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমের উপকরণ প্রদানের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ হাজার ১৭৫ জন ভিুককে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে অধ্যয়নরত ১৪ হাজার শিার্থীকে প্রায় ২০ কোটি টাকার শিাবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।

বর্তমান সরকারের রূপকল্প-২০২১ এবং টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা (এসডিজি)-তে বিধৃত মানবকেন্দ্রিক উন্নয়নের মূল ধারণা এই কর্মসূচিতে প্রতিফলিত হয়েছে।
পিকেএসএফ-এর ফুড সিকিউরিটি ২০১২ বাংলাদেশ-উজ্জীবিত প্রকল্পের আওতায় অতিদরিদ্র ও নাজুক পরিবারের দারিদ্র্য হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ২৮টি জেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩ লাখ ২৫ হাজার জন অতিদরিদ্র সদস্য এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ সকল সদস্যের মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬১ জনকে কৃষি, অকৃষি ও বৃত্তিমূলক প্রশিণ প্রদান করা হয়েছে। প্রশিণের পাশাপাশি প্রকল্পের ল্য অর্জনে পুষ্টি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সমতা এবং সামাজিক সমতা উন্নয়নে সহায়তা করা হচ্ছে।
পিকেএসএফ-এর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ঋণ কার্যক্রম কর্মসূচির আওতায় অগ্রিম শ্রম বিক্রয় ও মূল্যবান সম্পদ বিক্রয়ের মতো অবস্থা থেকে অসহায় মানুষদের রায় দ্রুত আর্থিক সুবিধা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
পিকেএসএফ-এর সোশ্যাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড নলেজ ডিসেমিনেশন ইউনিট কর্মসূচির আওতায় বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ, সমাজের বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির ল্েয কর্মশালা আয়োজন, বিভিন্ন দিবস উদযাপন, প্রশিণ, গণসমাবেশ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, কিশোরী কাব গঠন, পোস্টার ও লিফলেট মুদ্রণ প্রভৃতির মাধ্যমে এ ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পিকেএসএফ-এর নেতৃত্বে এবং তামাকবিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়িত সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণে ‘জাতীয় তামাকবিরোধী প্ল্যাটফর্ম’ গঠন করা হয়েছে। তামাক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে পিকেএসএফ ‘তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে বিকল্প ফসল উৎপাদন ও বহুমুখী আয়ের উৎস সৃষ্টি’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নিয়েছে।
পিকেএসএফ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্ব উপলদ্ধি করে ‘পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন ইউনিট’ প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক কনভেনশনের আওতায় গঠিত গ্রিন কাইমেট ফান্ড (জিসিএফ) পিকেএসএফকে তাদের অর্থ ব্যবহারের উপযুক্ত সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জিসিএফ হতে অর্থপ্রাপ্তির ল্েয পিকেএসএফ ইতোমধ্যে ৪টি প্রকল্প দাখিল করেছে। এছাড়াও পিকেএসএফ-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় এনে এর তিকর প্রভাব মোকাবিলায় নানামুখী উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে।
জানা যায়, এসডিজির অভীষ্ট, ল্য ও টার্গেট পূরণে বৈশ্বিক উদ্যোগের সাথে একীভূত হয়ে কাজ করছে পিকেএসএফ। ইতোমধ্যে পিকেএসএফ ‘গণমানুষের কণ্ঠস্বর: টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদারকরণ’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গঠন করেছে। এই প্ল্যাটফর্মের আওতায় পিকেএসএফ-এর সভাপতির নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে স্টিয়ারিং কমিটি ও উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নেতৃত্বে কার্যকরী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া এসডিজির অভীষ্ট ১, ২, ৪, ৫, ৬, ৮ ও ১০-এর ওপর ৪টি সেমিনার আয়োজন এবং এর সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের পদপে গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ‘এসডিজি ও পিকেএসএফ’ নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে এবং আরো কয়েকটি সংকলন প্রকাশের অপোয় আছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় জানুয়ারি ২০১৬ হতে শুরু হয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৬৪টি জেলার ২১৮টি ইউনিয়নে ১১৬টি সংস্থা কর্তৃক মোট ৩ দশমিক ২০ ল প্রবীণকে নিয়ে বিভিন্ন সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে আরও ৯টি ইউনিয়নে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে মোট ২২৭টি ইউনিয়নে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পিকেএসএফ ‘লো ইনকাম কমিউনিটি হাউজিং সাপোর্ট’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো ১৩টি নির্বাচিত পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় বসবাসকারী স্বল্প আয়ের মানুষের উন্নত আবাসন তৈরির ল্েয নতুন বাড়ি নির্মাণ, পুরাতন বাড়ি সংস্কার এবং সম্প্রসারণে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন করা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে শহরে বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠী মানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন সুবিধা পাচ্ছে।
জানা যায়, টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রা অর্জন তথা সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পিকেএসএফ কর্তৃক গ্রামীণ আবাসন খাত উন্নয়নের ল্েয ‘আবাসন কর্মসূচি’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। প্রাথমিকভাবে ১৫টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে ১৮টি জেলার ২৭টি উপজেলায় চলতি অর্থবছরেই এ কর্মসূচির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ এলাকায় বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠী মানসম্মত ও পরিবেশবান্ধব আবাসন সুবিধা পাবে। একই সাথে তাদের জীবনযাত্রার মানও বৃদ্ধি পাবে।
দতা উন্নয়নমূলক প্রশিণ প্রদানের মাধ্যমে দ জনবল তৈরি করার ল্েয পিকেএসএফ স্কিলস ফর অ্যামপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (ঝঊওচ) বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পের ল্য হলো প্রশিণপ্রাপ্তদের মধ্য ন্যূনতম ৬০ শতাংশের চাকরিতে সংস্থাপন নিশ্চিত করে আর্থিক সমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবার ও ব্যক্তির মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা, যাতে তারা নিজ নিজ জীবনমান উন্নয়নে সম হয়।
সূত্রমতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছর থেকে পিকেএসএফ-এর নিজস্ব অর্থায়নে ‘কৃষি ইউনিট’ এবং ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ ইউনিট’-এর আওতায় মাঠ পর্যায়ে দতা উন্নয়নমূলক ও কারিগরি কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইউনিট দুটির আওতায় কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদজাত পণ্যের উৎপাদন মেয়াদকাল, ভৌগোলিক অবস্থান, মৌসুম, তহবিল চাহিদা বিশ্লেষণপূর্বক সংগঠিত কৃষক ও খামারিদের পিকেএসএফ হতে প্রদত্ত আর্থিক পরিষেবার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতকরণের ল্েয আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কৃষিসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। এছাড়াও ইউনিট দু’টির আওতায় কৃষিভিত্তিক আয়বর্ধনমূলক কর্মকা-ের ভ্যালু-চেইন প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।
লার্নিং অ্যান্ড ইনোভেশন ফান্ড টু টেস্ট নিউ আইডিয়াস (খওঋঞ) কর্মসূচির মাধ্যমে পিকেএসএফ দারিদ্রবান্ধব বিভিন্ন সৃজনশীল ও উদ্ভাবনীমূলক কর্মকা-ে অর্থায়ন করছে। এ পর্যন্ত মোট ৭৯টি সংস্থার মাধ্যমে ৪৭টি জেলায় এ কর্মসূচির কার্যপরিধি বিস্তৃতি হয়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় দেশব্যাপী ৬১টি সৃজনশীল ও উদ্ভাবনীমূলক উদ্যোগ মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা ইতোমধ্যে অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি, জীবনমান উন্নয়ন ও জীবিকায়নের েেত্র দৃষ্টিগ্রাহ্য অভিঘাত ফেলতে সম হয়েছে।
পিকেএসএফ জানুয়ারি ২০১৫ হতে প্রোমোটিং এগ্রিকালচার কমার্শিয়ালাইজেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রাইজেস (চঅঈঊ) প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে ুদ্র-উদ্যোগ কর্মকা- পরিচালনার জন্য উদ্যোক্তাগণ আর্থিক পরিষেবার পাশাপাশি বিভিন্ন কৃষি ও অকৃষি উপখাত উন্নয়নে ভ্যালু চেইন কর্মকা- পরিচালনা ও প্রযুক্তি সহায়তা পাচ্ছেন। বর্তমানে ১৪ লাধিক ুদ্র উদ্যোক্তা তার উদ্যোগের চাহিদা অনুযায়ী ১০ ল টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। দেশের অভ্যন্তর ও বিদেশ হতে কার্যকর ও উপযুক্ত প্রযুক্তি স্থানান্তর করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য ১৭টি উপ-প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপ-প্রকল্পগুলোর আওতায় উচ্চ মূল্যমানের ফল ও ফসল চাষ সম্প্রসারণ, একই জমিতে বছরে ৪ ফসল উৎপাদন, সবজি সংরণাগার স্থাপন, ফুলের গুণগত মান উন্নয়নে টিস্যু কালচার ল্যাব স্থাপন, শুঁটকি মাছ উৎপাদনে ফিস ড্রায়ার প্রযুক্তি, কার্প-গলদা মিশ্রচাষে প্রোবায়োটিক প্রযুক্তি, মধু প্রক্রিয়াকরণে ফো-হাইভ ইত্যাদি কৃষিপ্রযুক্তি এবং অকৃষিভুক্ত বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে প্রযুক্তি স্থানান্তর করা হয়েছে। দেশের একমাত্র মৎস্য প্রজনন ত্রে হালদা নদীর পরিবেশ রায় বিশেষ ভ্যালু-চেইন উপ-প্রকল্প গ্রহণ করার ফলে ওই নদীতে কার্প জাতীয় মাছের ডিম ছাড়ার প্রবণতা বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। হালদা নদীর পরিবেশ রায় গবেষণার জন্য প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ে ‘হালদা নদী গবেষণা ল্যাবরেটরি’ স্থাপন করা হয়েছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বিকাশমান কাঁকড়া চাষ খাতের জন্য ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম থেকে কাঁকড়া হ্যাচারিপ্রযুক্তি সফলভাবে স্থানান্তর করা হয়েছে।
জানা গেছে, মার্চ ২০১৬ হতে শুরু হয়ে বর্তমান সময় পর্যন্ত পিকেএসএফ-এর আওতাধীন ৬২টি সংস্থার মাধ্যমে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্মসূচি পরিচালনা করছে পিকেএসএফ। সংস্থাগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী পিকেএসএফ শিশু-কিশোর-তরুণদের মাঝে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও মূল্যবোধ উন্নয়নে নানা কর্মকা- পরিচালনা করছে। ‘মেধা ও মননে সুন্দর আগামী’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিগত ২১ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘বাংলাদেশ কিশোর-কিশোরী সম্মেলন ২০১৮’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
পিকেএসএফ সূত্রে জানা যায়, দেশে ক্ষুদ্র ঋণ সেক্টরে বর্তমানে সংস্থাটির ঋণস্থিতি রয়েছে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে পিকেএসএফ-এর সহযোগী সংস্থাসমূহের ঋণস্থিতির পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। পিকেএসএফ পরিচালিত ঋণ কার্যক্রমে মোট সদস্য সংখ্যা ১ কোটি ৪০ লাখ ৬৭ হাজার ৩৭১ জন। মোট সদস্যের মধ্যে নারী ৯১ দশমিক ১৩ শতাংশ ও পুরুষ ৮ দশমিক ৮৭ শতাংশ। মোট ঋণগ্রহীতার সংখ্যা ১ কোটি ৮ লাখ ৬২ হাজার ৮৯২ জন। মোট ঋণগ্রহীতার মধ্যে নারী ৯১ দশমিক ৯৯ শতাংশ ও পুরুষ ৮ দশমিক ০১ শতাংশ।