প্রতিবেদন

দ্রুত এগিয়ে চলছে আবরার হত্যাকান্ডের বিচার কাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যার বহুল আলোচিত মামলায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ১৩ নভেম্বর ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ডিবি পুলিশ চার্জশিট প্রদান করে। অভিযুক্তদের মধ্যে ১১ জন হত্যাকা-ে সরাসরি অংশ নিয়েছিল, বাকিরা অন্যভাবে জড়িত। অভিযুক্ত ২৫ জনের মধ্যে ২১ জন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে, যার মধ্যে ১৬ জন এজাহারনামীয় আসামি। এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে হত্যাকা-ে জড়িত থাকায় আরও ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৪ আসামি পলাতক আছে। ৪ জনের মধ্যে ৩ জন মামলার এজাহারনামীয় আসামি। এজাহারের বাইরে মাত্র ১ জন।
উল্লেখ্য, ৬ অক্টোবর আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে সহপাঠীরা। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় তৎপরতার কারণে মাত্র ৩৮ দিনের মাথায় ১৩ নভেম্বর এই হত্যাকা-ের চার্জশিট দেয়া হয়। দ্রুততম সময়ে এই হত্যাকা-ের চার্জশিট দেয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষ অভিযুক্তদের বিচারের ব্যাপারে বেশ আশাবাদী।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে অনেকেই বলেছেন, আবরার হত্যাকা-ের বিচার হারিয়ে যাবে না। হত্যাকা-ে ছাত্রলীগ জড়িত থাকলেও দ্রুত বিচার আইনে দ্রুত বিচার করে সরকার এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায়। কারণ, সরকার চায় না এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটুক। অনেকে বলছেন, হত্যার মতো জঘন্য অপরাধকে স্তব্ধ করে দিতে আবরার হত্যাকা-ের বিচার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
শিবির সন্দেহ, বড় ভাইদের সব সময় সালাম না দেয়া, উচ্ছৃঙ্খল আচরণে আসামিদের অভ্যস্ততার কারণে হত্যাকা-টি ঘটে বলে পুলিশ চার্জশিটে উল্লেখ করে। হত্যাকারীরা রাজনৈতিক পরিচয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্রদের সঙ্গে অছাত্রের মতো আচরণ করত। বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত আসামিরা ডেকে নিয়ে মারধর শুরু করলে একপর্যায়ে আবরারের মৃত্যু হয় বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়।
এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সঠিক ও নির্ভুল চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত আছে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, আবরার হত্যামামলার বিচার হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে, যেমনটা আবরারের পিতা দাবি করেছেন।
১৩ নভেম্বর ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম। সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আব্দুল বাতেন, ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম, ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার মাসুদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়।
আবরারকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার একটি স্কেচ ভিডিও তৈরি করেছে মামলাটির তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ভিডিওতে আসামিদের কার কী ভূমিকা ছিল তা দেখানো হয়েছে। আসামি ও সাীদের দেয়া তথ্য মোতাবেক স্কেচ ভিডিওটি তৈরি করা হয়।
প্রায় আড়াই মিনিটের ভিডিওটিতে প্রথমে বুয়েট ক্যাম্পাস ও শেরে বাংলা হলের ১০১১ নম্বর রুমটি দেখানো হয়। দেখা যায়, হলের করিডোরে আবরারের ছাত্ররাজনীতি নিয়ে তথাকথিত বড় ভাইকে (ছাত্রলীগের) জানাচ্ছে তার এক রুমমেট। ৪ অক্টোবর আবরারের বিষয়ে হলের ক্যান্টিনে মিটিং করে অভিযুক্তরা। এর পরপরই হলের গেস্টরুমে মিটিংয়ে বসে তারা আবরারকে নিয়ে আলোচনা করে। ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ওই ‘বড় ভাই’য়ের নির্দেশে কয়েকজন আবরারকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেদিন আবরারকে তার ল্যাপটপ ও মোবাইলসহ ২০১১ নম্বর রুমে যেতে বলা হয়। সে গেলে ওই রুমে তাকে ফোরে বসিয়ে একটি প তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। হলের কেউ বিতর্কিত ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত কি না, জানতে চাওয়া হয়। আরেকপ তার ল্যাপটপ ও মোবাইল চেক করতে থাকে। এ সময় তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। যন্ত্রণায় ফোরে বমি ও প্রস্রাব করে দেন আবরার। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ২০১১ থেকে ২০০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০০৫ নম্বর রুমে তিনি আরও অসুস্থ হলে রুম থেকে বের করে তাকে সিঁড়ির পাশে শুইয়ে রাখা হয়। দীর্ঘণ সেখানে পড়ে থাকার পর বুয়েটের চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর একে একে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের চিত্র দেখানো হয়।
আদালত স্যা হিসেবে এ ধরনের ভিডিও সাধারণত গ্রহণ করে না। তারপরও আদালত যদি অনুমতি দেয়, তাহলে তা জমা দেয়া হবে বলে জানান মনিরুল ইসলাম। আবরারকে হত্যার নানা কারণের বিষয়ে তিনি বলেন, কেউ আসামিদের সঙ্গে দ্বিমত করলে, সব সময় সালাম না দিলে, তাদের সামনে কারণে অকারণে হাসলে ওইসব ছাত্রকে আসামিরা ডেকে নিয়ে নির্যাতন করত। অভিযুক্তরা র‌্যাগিংয়ের নামে নতুনদের সঙ্গে এসব অসদাচরণ করত। যদিও এসব বিষয়ে তাদের কাছে আগে কোনো অভিযোগ আসেনি।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, একজনকে সালাম না দেয়ায় তাকে বেধড়ক পিটিয়েছিল হত্যাকা-ে জড়িতরা। র‌্যাগিংয়ের নামে উচ্ছৃঙ্খল কর্মকা-ের অংশ হিসেবেই আবরার হত্যাকা- ঘটে। হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে মনিটরিং করলে এমন ঘটনা না-ও ঘটতে পারত। এটা তাদেরই মনিটর করার কথা।
ঘটনার দিন আবরারকে ডেকে নেয়ার পর রাত ১০টা থেকে তার ওপর নির্যাতন শুরু করে আসামিরা। ওরা অনেক সময় ধরে তাকে পিটিয়েছিল। রাত ৩টা নাগাদ আবরারকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক। খানিক আগে তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে আবরার না-ও মারা যেত পারত।
বুয়েটের ১৭তম ব্যাচের ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র আবরার ফাহাদকে হত্যার পর ওই দিন (৬ অক্টোবর) রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হলের দ্বিতীয় তলা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ। পুলিশ ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানায়, আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আবরারের পিতা বরকত উল্লাহ গত ৭ অক্টোবর রাজধানীর চকবাজার মডেল থানায় ১৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যামামলা করেন।
ঘটনার পরপরই গ্রেপ্তার হয় বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ১৩তম ব্যাচের ছাত্র মেহেদী হাসান রাসেল, ছাত্রলীগের বুয়েটের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বুয়েটের ১৫তম ব্যাচের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র অনিক সরকার, ছাত্রলীগের উপ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক, ১৬তম ব্যাচের বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ইফতি মোশাররফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মেফতাহুল ইসলাম জিওন, মুনতাসির আলম জেমি, খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির, মুজাহিদুর রহমান, মুহতাসিম ফুয়াদ, মনিরুজ্জামান মনির, আকাশ হোসেন, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মাজেদুল ইসলাম, শামীম বিল্লাহ, মোয়াজ আবু হুরায়রা ও এ এস এম নাজমুস সাদাত।
এজাহারভুক্ত পলাতক আসামিরা হলো জিসান, তানিন ও মোর্শেদ। এজাহারবহির্ভূত একমাত্র পলাতক আসামি রাফি। আবরার হত্যায় অনিক সরকার, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, ইফতি মোশাররফ সকাল, মেহেদী হাসান রবিন, মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মনিরুজ্জামান মনির, এস এম নাজমুস সাদাত ও খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভির আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
এজাহারবহির্ভূত আসামিরা হলো মেকানিক্যাল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ইসতিয়াক আহম্মেদ মুন্না, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা, ওয়াটার রিসোর্সেস বিভাগের ১৬তম ব্যাচের ছাত্র মিজানুর রহমান, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ছাত্র শামসুল আরেফিন রাফাত ও এস এম মাহমুদ সেতু।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম জানান, মামলায় ৩৩ জন সাী রয়েছেন। এদের মধ্যে তদন্তকারী সংস্থা ডিবির কাছে ১৬১ ধারায় ৩১ জন স্যা দিয়েছেন। বাকি দুই সাী আদালতে ১৬৪ ধারায় স্যা দিয়েছেন।

আসামিদের গ্রেপ্তার ও দ্রুত চার্জশিট প্রদানে আবরারের পিতার সন্তোষ
নিহত আবরারের বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই সড়কে। তার পিতা ও মামলা বাদী বরকত উল্লাহ একটি এনজিওতে কর্মরত। চার্জশিট দাখিল করার পর তিনি সাংবাদিকদের কাছে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। ছেলে আবরার হত্যাকা-ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও চার্জশিট প্রদানে সন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি তিনি মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার দাবি করেছেন। তিনি ছেলে হত্যার ঘটনায় আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে ব্যক্তিগত পছন্দের আইনজীবী নিয়োগ করার কথা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে তিনি সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।