রাজনীতি

নব উদ্দীপনায় দল গোছাতে ব্যস্ত আওয়ামী লীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ কৃষক লীগের ১০ম জাতীয় সম্মেলন হয়েছে গত ৬ নভেম্বর। সম্মেলনে কৃষক লীগের সভাপতি পদে সমীর চন্দ্র চন্দ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে উম্মে কুলসুম স্মৃতি নতুন নেতৃত্বে এসেছেন।
জাতীয় শ্রমিক লীগের ১৩তম জাতীয় সম্মেলন হয়েছে গত ৯ নভেম্বর। সম্মেলনে শ্রমিক লীগের সভাপতি পদে ফজলুল হক মন্টু এবং সাধারণ সম্পাদক পদে কে এম আযম খসরু নতুন নেতৃত্বে এসেছেন।
স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৃতীয় জাতীয় সম্মেলন হয়েছে গত ১৬ নভেম্বর। সম্মেলনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদে নির্মল রঞ্জন গুহ এবং সাধারণ সম্পাদক পদে আফজাল বাবু নতুন নেতৃত্বে এসেছেন।
২৩ নভেম্বর যুবলীগের আসন্ন সম্মেলনেও নতুন নেতৃত্ব আসবে এমনই আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাছাড়া আর মাসখানেকেরও কম সময় বিরতি দিয়ে আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে।
কৃষক, শ্রমিক ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও যুবলীগের মতো মূল দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেও পরিবর্তনের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। যুবলীগের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদেও নতুন নেতৃত্ব আসছে বলে শোনা যাচ্ছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মধ্যেই নব উদ্দীপনায় দল গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছে আওয়ামী লীগ।
যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয় এখন জমজমাট। দুই অফিসের সামনে টানানো হয়েছে অসংখ্য ব্যানার। শেখ হাসিনার আস্থাভাজন নেতাদের সঙ্গে কেউ কেউ যোগাযোগ করছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সুনজর পেতে বিভিন্ন কর্মসূচিও নিচ্ছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে শুরু করেছেন অনেকে।
ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হওয়ার পর প্রথম দিকে নেতাকর্মীদের খুব বেশি উপস্থিতি দেখা যায়নি যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। তবে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণার পরদিনই জমজমাট হতে শুরু করে যুবলীগের অফিস। যুবলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনের সর্বশেষ প্রেসিডিয়াম সদস্যদের বৈঠকে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। পুরো বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায় যুবলীগ নেতাকর্মীদের ভিড় ছিল চোখের পড়ার মতো।
জানা গেছে, এবার জাতীয় কাউন্সিল ও চার সহযোগী সংগঠনের সম্মেলনের আগে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দুর্নীতিবিরোধী অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এ জন্যই এই কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে কোনো বিতর্কিত ও দুর্নীতিবাজ দলের নেতৃত্বে আসতে না পারে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আগামী জাতীয় কাউন্সিলে অনেক পরিবর্তন আসবে। অনেকেই বাদ পড়বেন।
শেখ হাসিনার নির্দেশের পর উপজেলা ও জেলা থেকে অনেকের দুর্নীতি এবং অপরাধের তথ্য আসছে। তবে কিন ইমেজধারী নেতাকর্মীদের মেসেজ হলো দল থেকে দুর্নীতিবাজ বের করলে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়বে, দল শক্তিশালী হবে।
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের চার সহযোগী সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে এবার পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী ৩টি সহযোগী সংগঠনে নেতৃত্বের পরিবর্তনও হয়েছে। মেয়াদপূর্তির পর বহু সময় পার হয়ে যাওয়ায় চার সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের বিলাসিতা ভর করেছিল। দলের ভাবমূর্তির চেয়ে তারা নিজেদের ব্যক্তিগত লাভকেই প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। এই মনোভাবের কারণে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চার সহযোগী সংগঠনকেই ঢেলে সাজাবেন। আর এরই অংশ হিসেবে নতুন পদ-পদবি পাওয়ার জন্য নেতাদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় দৌড়ঝাঁপ। পুরনো পদ-পদবিওয়ালারা কিন ইমেজধারী হওয়ার চেষ্টায় নামেন।
এদিকে দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানের পাশাপাশি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলোতে অনুপ্রবেশকারী বা হাইব্রিডদের তালিকা তৈরি করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এই তালিকায় আছে প্রায় দেড় হাজার জন। তারা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগে অনুপ্রবেশ করেছে। সরকারি দলের রাষ্ট্রীয় মতায় তারা সুবিধাভোগী। বিগত ১০ বছরে দলটিতে অনুপ্রবেশ করেছে তারা। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ফ্রিডম পার্টিসহ বিভিন্ন দল তো বটেই, এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী পরে প্রজন্মও ক্ষমতাসীন দলে অনুপ্রবেশ করেছে। অনুপ্রবেশকারীদের এই তালিকাটির বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়ার অংশ হিসেবে অনেকেই বাদ পড়ছেন সহযোগী সংগঠনের নেতৃত্ব থেকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা একজন চেঞ্জ মেকার। তিনি সব সময়ই সম্মেলনের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে থাকেন। কাউন্সিলররা দলের সভাপতি শেখ হাসিনার ওপরই কমিটি গঠনের সব দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এবারের হয়ে যাওয়া ৩টি সম্মেলনের মাধ্যমে নবীন-প্রবীণের সমন্বয় ঘটেছে। যুবলীগের সম্মেলনেও নতুন মুখের সমাবেশ ঘটবে।
জানা গেছে, যাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাসের মতো অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে তারা মূল দল এবং সহযোগী সংগঠন Ñ কোথাও কোনো পদ-পদবি পাবেন না বলে একাধিকার বলেছেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এমন কঠোর অবস্থানে কেন্দ্রীয় ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে বড় বড় পদে থাকা অনেক নেতাই আতঙ্কে ভুগছেন। পক্ষান্তরে যারা কিন ইমেজধারী তারা এবার আশায় বুক বাঁধছেন এ জন্যই যে, তারা মনে করছেন, তাদেরকে স্থান দেয়ার জন্যই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দুর্নীতিবিরোধী একটি সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছেন।