আন্তর্জাতিক

পাকিস্তান: ইমরান খান আউট, ফজলুর ইন!

নিজস্ব প্রতিবেদক
‘এক দফা এক দাবি, ইমরান খান ছাড় গদি’-ঠিক এ রকম ল্য নিয়ে পাকিস্তানে ব্যাপক বিােভ করছেন বিরোধী দলের নেতারা। ডানপন্থি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ফজলের (জুই-এফ) নেতা মাওলানা ফজলুর রহমান ‘আজাদি মার্চ’ নামের এই বিশাল সমাবেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করলেই কেবল আন্দোলন থামবে। তিনি ৩ মাসের মধ্যেই নতুন নির্বাচনও দাবি করেছেন।
ইসলামাবাদে গত ৮ নভেম্বরের সমাবেশে জুই-এফের নেতাকর্মীরা সমবেত হয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে সমঝোতার জন্য সরকারের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ওই কমিটির কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘যদি আমার পদত্যাগই একমাত্র চাওয়া হয়, তা হলে ওদের সঙ্গে কথা বলেই বা কি হবে?’
ইমরান খান বলেছেন, তিনি ‘উদার মনে’ এ রকম একটি বিরোধী সমাবেশের অনুমতি দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে নির্বাচনকে ঘিরে ভোট কারচুপির যে অভিযোগ, সবই তিনি রাজনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য প্রস্তুত ছিলেন এবং এখনও আছেন।
অপরদিকে মাওলানা ফজলুর রহমানের দাবি, সাধারণ নির্বাচনে জালিয়াতি করে মতায় এসেছে ইমরানের দল।
পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা ফারহাতুল্লাহ বাবর বলেছেন, বিরোধীরা সরকারকে চাপে রেখেছে। এ আজাদি মার্চ হচ্ছে প্রথম পদপে। পাকিস্তান মুসলিম লীগ নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) আজাদি মার্চের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
‘আল্লামা ইকবাল ও জিন্নাহর স্বপ্নের পাকিস্তান গড়ার’ ঘোষণা দিয়েছেন মাওলানা ফজলুর রহমান। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এমন প্রভাব বিস্তারকারী কে এই মাওলানা ফজলুর রহমান? কেন তার আজাদি মার্চে এত লোক সমাগম। কি তার রাজনৈতিক পরিচয়?
মাওলানা ফজলুর রহমানের জন্ম ১৯৫৩ সালের ২১ জুন। ডেরা ইসমাঈল খান জেলার আব্দুল খয়েল গ্রামে মুফতি মাহমুদের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মুলতানে মাধ্যমিক শিা সমাপ্ত করে ১৯৭৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাস করেন। এরপর ধর্মীয় শিার প্রতি মনোনিবেশ করেন। মুলতানের মাওলানা কারী মুহাম্মদের কাছে কেরাত মশক করেন। এছাড়া দারুল উলূম হক্কানিয়া আকুড়াখটক মাদ্রাসায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে পড়াশোনা করেন।
পিতার হাত ধরেই রাজনীতিতে আগমন মাওলানা ফজলুর রহমানের। ১৯৭৯ সালের ৯ নভেম্বর করাচির খালিকে দুনিয়া হলে মাওলানা প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান করেন। এই বক্তব্যে তিনি তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউল হকের রাষ্ট্রপ্রধান পদ চ্যালেঞ্জ করেন।
তার অনলবর্ষী বক্তব্যে অভিভূত হয়ে নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান বলে ওঠেন, ‘থামো, এই ভূমি বড়ই উর্বর। পাকিস্তানে অচিরেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে।’
এসময় নবাবজাদা গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য এমআরডি গঠন করেন। মাওলানা ফজলুর রহমান এ আন্দোলনে সক্রিয় হন। এরপর থেকে তার জেলে যাওয়া-আসা শুরু।
১৯৮১ সালে তিনি যখন জেনারেল জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে কারাবন্দি হন তখন তাকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব নির্বাচন করা হয়।
১৯৯৫ সালের ২৮ মার্চ জামেয়া মাদানিয়া করিম পার্কে ৩২৫ সদস্যের অধিকাংশের মতামতের ভিত্তিতে জমিয়ত সভাপতি হাফিজুল হাদিস আল্লামা আব্দুলাহ দরখাস্তির ইন্তেকালের পর মাওলানা ফজলুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি রাজনৈতিক মামলায় মোট ১০ বার কারাবরণ করেন।
মাওলানা ফজলুর রহমান ১৯৮৫ সালের নির্দলীয় ভোট প্রত্যাখান করেন। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের পরে বেনজীর ভূট্টো সেনাশাসনকে দাবিয়ে রাখার জন্য গোলাম ইসহাক খানকে রাষ্ট্রপতি বানালে মাওলানা ফজলুর রহমান রাষ্ট্রপতিকে স্বপদে বহাল রাখার পরিবর্তে খান আব্দুল ওয়ালী খানকে সঙ্গে নিয়ে নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানকে রাষ্ট্রপতি পদে দাঁড় করিয়ে দেন।
১৯৯৩ সালে বেনজীর ভূট্টো দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হলে মাওলানা ফজলুর রহমান জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে যখন বেনজীর মতাচ্যুত হন, তখন নওয়াজ শরীফের তদন্ত ব্যুরো সর্বশক্তি নিয়োগ করেও তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করতে পারেনি।
এর আগে পাকিস্তানে ইসলামি অনেক দল ছিল, কিন্তু তারা কোনো জাতীয় শক্তির রূপ ধারণ করতে পারেনি। মাওলানা ফজলুর রহমান ২০০২ সালে সব ইসলামি দল নিয়ে মুত্তাহিদা মজলিসে আমল বা এমএমএ নামে একটি জোট গঠন করেন, যার সভাপতি ছিলেন বেরেলভীপন্থি মাওলানা শাহ আহমদ নূরানী এবং সেক্রেটারি বা মুখপাত্র ছিলেন তিনি নিজে। এতে জামায়াত, শিয়াসহ সব মত ও পথের লোকেরা তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং এমএমএ ৭২টি আসনে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে জয়লাভ করে।
পাকিস্তানের বিখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট হামিদ মীর এক কলামে লিখেছেন, অনেক যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করেন যে, পাকিস্তানে সর্বাধিক ধীমান রাজনীতিবিদ কে? আমি সাধারণত এমন প্রশ্ন এড়িয়ে চলি। কিন্তু কিছু নাছোড়বান্দা যখন আমাকে পেঁচিয়ে ফেলে, তখন অনায়াসে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে মাওলানা ফজলুর রহমানের নাম। মজার কথা হলো, কেউ কেউ এ জবাব শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যান, আবার কেউ কেউ অগ্নিশর্মা হয়ে বলেন যে, তাহলে তাকে ‘ডিজেল মাওলানা’ বলা হয় কেন? আমি সাধারণত এ কথার জবাব এভাবে দিই যে, তাকে ডিজেল মাওলানা খেতাবদাতা আতাউল হক কাসেমিও একথা অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য যে, মাওলানা ফজলুর রহমান পাকিস্তানের ধীমান রাজনীতিবিদদের প্রথম সারির একজন।
তার স্মরণশক্তি ও দূরদর্শিতার পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিবিসি এক প্রতিবেদনে বলেছে যে, মাওলানা একসঙ্গে ৫টি কাজ সমাধা করতে পারদর্শী। ২০০৫ সালের এশিয়ান সার্ভে রিপোর্টে মাওলানা ফজলুর রহমানকে এশিয়ার ৫ম ও বিশ্বের ১৯তম ধীমান রাজনীতিবিদ নির্ধারণ করে।
এখন সেই মাওলানা ফজলুর রহমান ইমরান খানের জন্য সাক্ষাৎ যমদূত হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন। সময়ই হয়ত বলে দেবে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ইমরান খানকে ছুঁড়ে ফেলে মাওলানা ফজলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসাবে কি না?