প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় মাদকাসক্তদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর লক্ষ্যে কাজ করছে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
বাংলাদেশের উন্নয়নের সফল রূপকার এবং সন্ত্রাস-জঙ্গি দমনে সফলতার পর সমাজ বা রাষ্ট্র থেকে মাদক নির্মূলেও কঠোর অবস্থানে থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ডিজি মো. জামাল উদ্দীন আহমেদের অকান্ত পরিশ্রমে সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ অভিযানের ফলে মাদক কারবারীরা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানের কারণে মাদক চোরাকারবারীরা এই অন্ধকার পথ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে দেশে মাদকের চোরাচালান ও বিস্তার অনেকটাই কমে এসেছে। মাদকের অবাধ প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তরা মাদকগ্রহণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। তারপরও দেশে যেসব মাদকাসক্ত রয়ে গেছে, তারা যাতে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে সে লক্ষ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নিরলস কাজ করে চলেছে। এই কেন্দ্রের প্রচেষ্টায় অনেক মাদকাসক্তই ইতোমধ্যে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সমাজের মূল ধারায় অবদান রাখতে শুরু করেছে।
দেশে মাদকাসক্তের সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সারাদেশে আনুমানিক ৭০ লাধিক লোক মাদকাসক্ত। এদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার জন্য সরকারিভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীতে ১টি করে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। পাশাপাশি সংস্থার সার্বিক তত্ত্বাবধানে বেসরকারি পর্যায়ে সারাদেশে ৩২৩টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে বেসরকারি এই মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলো ১ বছর পর পর নবায়নসাপেক্ষে লাইসেন্সপ্রাপ্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রতি মাসে ১ বার বেসরকারি এসব নিরাময় কেন্দ্রের কার্যক্রম ও সেবার মান মনিটরিং করে থাকেন। এতে একটি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র বছরে ১২ বার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সক্রিয় মনিটরিংয়ের আওতায় থাকে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার সরকারি ৪টি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে বিনামূল্যে রোগীদের থাকা, খাওয়া, ওষুধপত্র ও চিকিৎসা দেয়া হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে এসব কেন্দ্রে মাদকাসক্তদের নিয়মিত কাউন্সেলিং করানো হয়। এমনকি রোগীর পাশাপাশি অভিভাবকদের জন্যও বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে এসব সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে। কারণ এসব েেত্র চিকিৎসার পাশাপাশি রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের সচেতনতা খুবই জরুরি বলে মনে করে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট (যুগ্ম সচিব) ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন স্বদেশ খবরকে বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা দেয়ার পাশাপাশি মাদকাসক্ত ও তাদের অভিভাবকদের সাইকো এডুকেশনের ব্যবস্থা রয়েছে। মাদকাসক্তদের অভিভাবকদের জন্য সাইকো এডুকেশন খুবই জরুরি। কারণ একজন মাদকাসক্ত মাদক ছেড়ে দিয়ে পরিবারের অজ্ঞতার কারণে আবার মাদকের পথে পা বাড়ায়। অভিভাবকরা সচেতন হলে সে হয়ত পুনরায় মাদকাসক্ত হতো না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলো মাদকাসক্তের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের সাইকো এডুকেশনের বিষয়টিতে তাই সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নেয়ার পর পরিবার ও তার নিজস্ব সমাজের সার্বিক সহযোগিতা পেলে সারাজীবন পুরোপুরি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।
ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির চিফ কনসালট্যান্ট ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন স্বদেশ খবরকে বলেন, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের বেড সংখ্যা মোট ১২৪টি। এর মধ্যে পুরুষ বেড ৯০টি, মহিলা বেড ২৪টি এবং শিশু বেড ১০টি। ২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে মাদকাসক্ত শিশু বা পথশিশুদের চিকিৎসার জন্য ১০টি বেড বরাদ্দ দেয়া হয়। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায় ২৫টি করে মোট ৭৫টি বেড রয়েছে। সে হিসেবে সারাদেশে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে মোট বেড সংখ্যা ১৯৯টি।
রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের বেড সংখ্যা একসময় ছিল মাত্র ৫টি করে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ এসব নিরাময় কেন্দ্রের বেড সংখ্যা ৫ থেকে ২৫-এ উন্নীত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দেশে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ২৪টি মহিলা বেড সংস্থানেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন সংস্থার ডিজি জামাল উদ্দীন আহমেদ।
এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) মো. জাকির হোসেন স্বদেশ খবর প্রতিবেদককে বলেন, ঢাকার বাইরে ৭টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের কাজও হাতে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া সরকারি নিরাময় কেন্দ্র ছাড়াও কুমিল্লা, যশোর ও রাজশাহী জেলা কারাগার হাসপাতালে মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিৎসা সেবা আরো বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বর্ধিত এ সেবার আওতায় দেশের অন্যান্য জেলার কারাগারগুলোও অন্তর্ভুক্ত হবে।
জানা গেছে, সরকারি ৪টি নিরাময় কেন্দ্রের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে সারাদেশে যে ৩২৩টি অনুমোদিত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আছে, তাতে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৪৩ হাজার ৩৫৩ জন চিকিৎসা নিয়েছে।
জাকির হোসেন আরো বলেন, চাহিদা অনুযায়ী মাদকাসক্তদের চিকিৎসাসেবার আওতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সরকারি-বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে মাদকের আগ্রাসী ছোবল থেকে রা পেতে আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে তৎপর হওয়ার বিশেষ নির্দেশনা দেয়া আছে। এটা নিয়ন্ত্রণে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চলছে তেমনি যারা একবার জড়িয়ে গেছে, তাদের ঘৃণা না করে সচেতনতা ও চিকিৎসার মাধ্যমে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে আরও নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়াও চলছে। এর ধারাবাহিকতায় বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়েও নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জাকির হোসেন বলেন, চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার ২৫ বেডের নিরাময় কেন্দ্রকে ২০০ বেডে উন্নীত করার কাজ চলছে। এছাড়া সিলেট, রংপুর, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে ২০০ বেডের মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। ইতোমধ্যে বরিশাল ও ময়মনসিংহ সদরে নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের জন্য জনবলের অনুমোদন পাওয়া গেছে। এছাড়াও প্রত্যেক জেলাশহরে ১টি করে ৫০ বেডের নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
সূত্র জানায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিভাগের পরিচালকের তত্ত্বাবধানে দেশে বর্তমানে চিকিৎসা সেবাদানকারী ৩২৩টি বেসরকারি ও ৪টি সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় সরকারিভাবে গড়ে উঠা সবচেয়ে বড় কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র এ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে অবদান রেখে চলেছে। এরই অংশ হিসেবে বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রগুলোকে ৯টি কারিকুলামের মাধ্যমে ইউনিভার্সেল ট্রিটমেন্ট প্রশিক্ষণ প্রদান করে কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূলত নিরাময় কেন্দ্রগুলোর কর্তৃপক্ষ মাদকাসক্তদের সঙ্গে কিরূপ ব্যবহার করবে, তাদের কিভাবে চিকিৎসা দেবে, কিভাবে কাউন্সেলিং করবে ইত্যাদি বিষয়ে শেখানো হয়। পাশাপাশি নৈতিক ও ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী মাদকসেবন যে অন্যায়, তা-ও শেখানো হয়। রোগীদের দেয়া তথ্যাবলির গোপনীয়তা রক্ষা করার বিষয়টিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। ইউনিভার্সেল ট্রিটমেন্ট কারিকুলামে প্রতিটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের ৩ জনকে প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হয়। কোনো নিরাময় কেন্দ্র প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ না করলে ওই নিরাময় কেন্দ্রের লাইসেন্স নবায়ন করা হয় না।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ২ হাজার ৫৭২ জন মাদকাসক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে আন্তঃবিভাগে ভর্তি রোগীর সংখ্যা পুরুষ ৬৪৫ জন, মহিলা ৫৭ জন ও শিশু ৯৭ জন। বহিঃবিভাগে নতুন রোগীর সংখ্যা পুরুষ ৯২৮ জন, মহিলা ৫৫ জন ও শিশু ৮০ জন। হাজিরার ভিত্তিতে পুরাতন রোগীর সংখ্যা পুরুষ ৬৩২ জন, মহিলা ৮ জন ও শিশু ৭০ জন।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ২০১২ সাল হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মোট ১৭ হাজার ২৪৮ জন রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে পুরুষ ১৫ হাজার ২৯৬ জন, মহিলা ৫২ জন ও শিশু ১ হাজার ৯০০ জন। ২০১২ সালে চিকিৎসা নেয়া মোট রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ১০৩ জন, ২০১৩ সালে ১ হাজার ৭৮৭ জন, ২০১৪ সালে ২ হাজার ২০০ জন, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৩২৪ জন, ২০১৬ সালে ২ হাজার ৯০০ জন, ২০১৭ সালে ২ হাজার ৭৬২ জন এবং ২০১৮ সালে চিকিৎসা নেয়া মোট রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ১৭২ জন।
কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন জানান, নিরাময় কেন্দ্রে ১ জন রোগীকে ২৮ দিনের চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়। চিকিৎসক যদি মনে করেন, এই সময়ের মধ্যে রোগীর মাদকাসক্তি প্রবণতা আর নেই, তাহলে ওই রোগীকে ছাড়পত্র দেয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসক যদি মনে করেন, মাদকাসক্তি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়নি তাহলে ওই রোগীর আরো ২৮ দিনের পুনর্বাসন ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এতেও মাদকাসক্তি থেকে উন্নতি না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আরো ২৮ দিনের জন্য পুনর্বাসন ট্রিটমেন্ট চালানো হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ১ জন রোগী (২৮+ ২৮) দিনে অর্থাৎ ২ মাসের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন।
ডা. ইমামুল হোসেন জানান, মাদকাসক্তদের জন্য ডায়েট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সে লক্ষ্যে রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। রাতে ঘুমের সময় বাদ দিয়ে প্রতি ৩ ঘণ্টা পর পর খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ১ জন রোগীর জন্য প্রতিদিন ডায়েট বাবদ বরাদ্দ মোট ১২৫ টাকা। এই টাকার মধ্যে দুপুর ও রাতের খাবার ছাড়াও ৪ বার নাস্তা সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ২০.০৪ টাকায় দেয়া হয় সকালের নাস্তা, সকাল ৯টার নাস্তা বাবদ ১৩.৭০ টাকা, বিকেলের নাস্তা বাবদ ৯.৯৮ টাকা এবং ১২.২০ টাকায় দেয়া হয় রাত ৮টার নাস্তা। অর্থাৎ ৪ বেলা নাস্তা বাবদ ব্যয় হয় ৫৫.৯২ টাকা। বাদবাকি ৬৯.০৮ টাকা দুপুর ও রাতের খাবার বাবদ ব্যয় করা হয়।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ডাক্তার আছেন ৮ জন, নার্স ১২ জন। কিনার আছে ৪ জন। সিকিউরিটি গার্ড (আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগকৃত) ২০ জন। এছাড়া নিজস্ব জনবল পাওয়ার লক্ষ্যে ১৪৩ জনের চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্সসহ যারা কাজ করছেন তারা সবাই প্রেষণে। ফলে কোনো চিকিৎসক, নার্স সহজে এখানে আসতে চান না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, নিয়োগবিধি তৈরি হলে এ সমস্যাটা মিটে যাবে।
জানা যায়, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির সময় একজন বৈধ অভিভাবককে অঙ্গীকারনামায় স্বার করতে হয়। মাত্র ১০ টাকা ফি দিয়ে ভর্তি হওয়া যায়। চিকিৎসার সময়সীমা ২৮ দিন। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার সময় রোগীর নিকট ভর্তির সময় জামানত হিসেবে গ্রহণ করা ৫০০ টাকা ফেরত দেয়া হয়।
নিরাময় কেন্দ্রের বহিঃবিভাগে ১০ টাকায় টিকিট ক্রয় ও রেজিস্ট্রেশন করে মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়। রোগী ও অভিভাবকদের প্রি-অ্যাডমিশন কাউন্সেলিং শেষে ভর্তি করা হয়। ভর্তিকৃত রোগীর জিনিসপত্র যাচাইপূর্বক ওয়ার্ডে প্রেরণ করা হয়। প্যাথলজিক্যাল পরীা-নিরীা শেষে রোগীকে ওয়ার্ডে চিকিৎসা করানো হয়।
জানা যায়, বাংলাদেশে এখন অধিকাংশ নারীর মাদকাসক্তির বিষয়টি সুপ্ত অবস্থায় আছে। আবার নারী মাদকাসক্তদের পরিবারও তাদের চিকিৎসায় অনাগ্রহী। কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নারী মাদকাসক্তদের জন্য বেড আছে ২৪টি। সামাজিকতা ও লোকলজ্জার কারণে নারী মাদকাসক্তদের অনেকেই চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখে। ফলে সেই নারীরা আসলে যথাযথ চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না তা জানা যাচ্ছে না। আবার পারিবারিক ভাবমূর্তি ুণœ হওয়ার ভয়ে অনেক নারী চিকিৎসা থেকে দূরে থাকছেন।
কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, নারী মাদকাসক্তদের চিকিৎসায় মূল বাধা হচ্ছে তার পরিবার। এ েেত্র ভুক্তভোগীকে চিকিৎসার ব্যাপারে পরিবার কোনো সহযোগিতা করে না। অন্যদিকে পরিবারের সদস্যদের অনাগ্রহের পাশাপাশি সেই মাদকাসক্ত নারী নিজেও চিকিৎসার ব্যাপারে আগ্রহী হন না। বেশিরভাগ েেত্র মাদক গ্রহণের পর শরীর যখন আর সহ্য করতে পারে না তখন নারীরা চিকিৎসা নেন।
কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সূত্র জানায়, পুরুষ হোক আর নারী হোক, এখানে আসা একজন রোগীকে প্রথমে ২৮ দিনের চিকিৎসা দেয়া হয়। এই সময়ের চিকিৎসায় রোগীর ডোপ টেস্ট, বিভিন্ন পরীা করানো হয়। কাউন্সেলিং, খেলাধুলা ও বিভিন্ন মোটিভেশনাল (ধর্মীয় কাস) কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিকল্পনামাফিক এমনভাবে রোগীর চিকিৎসা হয় যেন তিনি সুস্থ হয়ে নিজেই তার ভালোমন্দ ঠিক করতে পারেন।

দুই.
কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রটি তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। ১৯৮৮ সালে তেজগাঁও থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯১ সাল থেকে এটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর পরিচালনা করে আসছে। এ কেন্দ্রে বর্তমানে ১২৪টি বেড রয়েছে। এখানে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়। তিনতলা ও পাঁচতলার দুটি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে তিনতলা ভবনের দুটি তলায় রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ১৩ তলা একটি ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে গেছে অনেক দূর।
কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র আগে ছিল ৫০ শয্যাবিশিষ্ট। ক্রমান্বয়ে এটি ১২৪ বেডের করা হয়। শয্যা দ্বিগুণের বেশি হলেও সে অনুপাতে জনবল নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ১ জন ভারপ্রাপ্ত স্টুয়ার্টকে একাই ৩ জনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। এছাড়াও ১২৪ বেডের জন্য বর্তমানে মাত্র ১২ জন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন।
নাম পরিচয়ে অনিচ্ছুক একাধিক নার্স স্বদেশ খবরকে বলেন, মাদকাসক্তরা অন্য রোগীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের চিকিৎসার জন্য পর্যপ্ত জনবল প্রয়োজন। এ রোগীরা চিকিৎসা চলাকালীন মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলে। তাদের ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসার মধ্যে রাখা হয়।
হাসপাতালের তিনতলা ভবনের দুটি ফোরের ছোট পরিসরেই রোগীদের চিকিৎসা, থাকা ও খেলাধুলাসহ সবকিছু করতে হচ্ছে। এতে রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী ওষুধের পাশাপাশি সাইকোসোশ্যাল, সাইকোরিলিজিয়াস পদ্ধতিতে পরামর্শ, কাউন্সেলিং, থেরাপিসহ বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীদের খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনমূলক কার্যক্রমও রয়েছে। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার পরও তাদের মাসে ২ বার হিসেবে ১২ মাসে ২৪ বার এবং ২ বছরে ৪৮ বার ফলোআপ এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, যাতে রোগী পরবর্তীকালে আবার মাদকাসক্ত হয়ে না পড়ে।
মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালটেন্ট (পরিচালক) ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন বলেন, এখানে সাইকিয়াট্রিস্ট, চিকিৎসক ও নার্সসহ জনবল পর্যাপ্ত নয়। তবে আমাদের নিয়োগ নীতিমালা প্রায় শেষ পর্যায়ে। খুব দ্রুত জনবল নিয়োগ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে মাদকাসক্ত রোগীদের চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিচালক (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন) মো. জাকির হোসেন স্বদেশ খবর প্রতিবেদককে বলেন, কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ডাক্তার-নার্সসহ জনবলের কিছুটা সংকট রয়েছে। আমরা জনবল বাড়ানোর চেষ্টা করছি।
তিনি বলেন, মাদক সেবন থেকেই মাদক ব্যবসায়ী হয়ে যায়। মাদকসেবীদের জেলহাজতেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে।
এ বিষয়ে ডা. ইমামুল হোসেন বলেন, সীমিত জনবল নিয়েই আমরা সাধ্যমতো একজন মাদকাসক্তকে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। একজন মাদকাসক্ত যাতে পুনরায় মাদকে আসক্ত না হয় সে জন্য রোগীর পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সাইকো এডুকেশন ও ফ্যামিলি থেরাপির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদের নির্দেশনায় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে বরং রোগীর মতো বিবেচনা করে এবং তারা যাতে সুস্থ হয়ে আলোর পথে ফিরে যেতে পারে সেই লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। একজন মাদকাসক্ত এখানে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ-স্বাভাবিক দেহে হাসিমুখে নিরাময় কেন্দ্র থেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বাড়ি ফিরে যাবে Ñ এটাই কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের ডাক্তার-নার্সসহ সকলের চাওয়া।
তবে এক্ষেত্রে ঢাকার কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালটেন্ট (পরিচালক) ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন মাদকাসক্তদের পরিবারের প্রতি আবেদন জানান, তারা যেন বিষয়টি অবহেলা বা গোপন না করে প্রাথমিক পর্যায়েই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এতে মাদকাসক্তরা নিশ্চিতভাবে দ্রুত সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক কর্মক্ষম জীবনে ফিরে যেতে সক্ষম হবে।