রাজনীতি

মেননের কারণেই ভেঙে যাচ্ছে ওয়ার্কার্স পার্টি!

নিজস্ব প্রতিবেদক
সভাপতি রাশেদ খান মেননের সাম্প্রতিক কর্মকা-ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি দুই টুকরা হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে পার্টি থেকে যেসব নেতা বেরিয়ে গেছেন, তাদের ফেরা অনেকটাই অনিশ্চিত। আগেই বেরিয়ে যাওয়া পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ^াসের নেতৃত্বে এ অংশটি নিজেরাই একটি নতুন দল করার চিন্তাভাবনা করছেন। আগামী ২৯ নভেম্বর পৃথক প্ল্যাটফর্ম থেকে তারা সম্মেলনের ডাক দিয়েছেন। প্ল্যাটফর্মের নাম দিয়েছেন ‘ওয়ার্কার্স পার্টির মতাদর্শ রা কমিটি’।
মূল দলে আছেন এমন অনেক নেতাও বিদ্রোহীদের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন এবং বিদ্রোহী অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তারা আলাদা প্ল্যাটফর্ম না করে ‘ওয়ার্কার্স পার্টি’ নামেই ভিন্ন নেতৃত্ব গড়ে তোলার প্রস্তাবও দিয়েছেন। সেেেত্র বিমল বিশ^াসের নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন রাখবেন বলে জানিয়েছেন বিদ্রোহী অংশের নেতারা।
এমন প্রোপটে পার্টির ভাঙন ঠেকাতে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় নেতারা। একদিকে যেমন পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশাসহ মূল নেতৃত্ব নিজেদের ভাবমূর্তি রার চেষ্টায় তৎপর; তেমনি নিজেদের মতাদর্শ অুণœ রাখতে মরিয়া বিমল বিশ^াসের নেতৃত্বে বিদ্রোহী ৬ জন। ফলে দুই পকে আলোচনার টেবিলে বসিয়ে সমঝোতার চেষ্টায় বেশ বেগ পেতে হচ্ছে পার্টির অন্য নেতাদের।
১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠার পর আরও দু’বার ভাঙে পার্টি। প্রথমবার ১৯৯৫ সালে পলিটব্যুরোর সদস্য টিপু বিশ^াস দল থেকে বেরিয়ে গণফ্রন্ট নামে নতুন দল গঠন করেন। পরে ২০০৪ সালে পলিটব্যুরোর আরেক সদস্য সাইফুল হক পার্টি থেকে বেরিয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি নামে আরেকটি দল করেন। এবার তৃতীয় দফায় ভাঙনের মুখে ওয়ার্কার্স পার্টি।
পার্টির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন পার্টির পলিটব্যুরোর কয়েকজন সদস্য। তবে পার্টির বৃহত্তর অংশ জোটগতভাবে নির্বাচনের পে ছিলেন। এ নিয়ে পার্টির ভেতরে বিভিন্ন সময় আলোচনা হলেও ওই বিরোধের কোনো সমাধান হয়নি। পরবর্তী সময়ে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কার্স পার্টির ১০ম কংগ্রেসকে কেন্দ্র করে বেশকিছু বিষয়ে প্রকাশ্য বিরোধে জড়িয়ে পড়েন কেন্দ্রীয় নেতারা। বিরোধকে কেন্দ্র করে গত ২২ অক্টোবরে প্রথমে দল থেকে প্রাথমিক সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেন বিমল বিশ্বাস। পরে পার্টি তাকে ‘বহিষ্কার’ করে। এরপর ২৮ অক্টোবর পার্টির পলিটব্যুরোর ২ সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ এবং ৪ কেন্দ্রীয় সদস্য জাকির হোসেন হবি, মোজাম্মেল হক মঞ্জু, তুষার কান্তি দাস ও অনীল বিশ^াস কংগ্রেস বর্জনের ডাক দেন। এ কারণে তাদের প্রাথমিক সদস্যপদ স্থগিত করে পার্টি।

এদিকে বিদ্রোহী নেতাদের আনীত অভিযোগসমূহ নাকচ করে দিয়েছেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে তারা বিরোধিতা করছেন সেসব সিদ্ধান্ত বিমল বিশ^াসের সময়েই নেয়া হয়েছে। তিনি দুইবার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে বিমল বিশ^াস নিজেও ভোট করে হেরেছেন। এখন তারা যা বলছেন তা স্ববিরোধিতা।
বিদ্রোহী বিমল বিশ^াস বলেন, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপস করে আমাদের নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তবে শুধু যে নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার জন্যই ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বেরিয়েছি তা ঠিক না, বেরিয়ে যাওয়ার পেছনে মতাদর্শগত বিষয় রয়েছে। বর্তমানে ওয়ার্কার্স পার্টির মূল নেতৃত্ব মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের কথা বললেও তারা এই আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে যে ঐক্য তা শুধু এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার জন্য। ২০১১ সালে আমাদের বিরোধিতার জন্যই মেনন (রাশেদ খান মেনন) মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেননি। পার্টির ভেতরে আমাদের অবস্থান যখন দুর্বল হয়েছে তখনই তারা মন্ত্রিত্ব নিয়েছেন।
গত ১৯ অক্টোবর বরিশাল নগরীতে ওয়ার্কার্স পার্টির জেলা কমিটির সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাশেদ খান মেনন বলেছিলেন, ‘আমি নিজেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছি। তারপরও আমি স্যা দিয়ে বলছি, এই নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদেও ভোট দিতে পারে না, উপজেলায়ও পারে না।’
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান মেননের এই বিস্ফোরক বক্তব্য ঝড় তোলে রাজনৈতিক অঙ্গনে। প্রতিক্রিয়ায় পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘মন্ত্রী হলে মেনন কি একথা বলতে পারতেন?’
পরদিনই (২০ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে আগের দিনের অবস্থান থেকে সরে মেনন দাবি করে বলেন, ‘আমার বক্তব্য সম্পূর্ণ উপস্থাপন না করে অংশবিশেষ উপস্থাপন করায় এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। একাদশ সংসদের সফল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু অভিজ্ঞতাটি সুখকর নয়। আমার বক্তব্য সম্পর্কে গণমাধ্যম ভুল বার্তা দিয়েছে।’
মেনন এই দাবি করলেও তারা বক্তব্যের ভিডিও ইউটিউব ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এখনও রয়ে গেছে। এমনকি তিনি নিজেও পরবর্তীতে কখনও দুঃখপ্রকাশ করেছেন, কখনও বলেছেন, মুখ ফসকে এই মন্তব্য বের হয়ে গেছে।
রাশেদ খান মেননের এমন মন্তব্যের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতেও সংকট ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। দলটির পলিটব্যুরোর প্রবীণ সদস্য ও সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাসের দল থেকে পদত্যাগের পর বিদ্রোহ করে বসেন দলটির ১১ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পুলিটব্যুরোর আরো ২ সদস্যসহ কেন্দ্রীয় ৬ নেতা। ‘দল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্রমান্বয়ে দণিপন্থি, বিলোপবাদী ধারায় অধঃপতিত সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং শীর্ষ নেতৃত্ব দুর্নীতিগ্রস্ত’ Ñ এমন অভিযোগ এনে এই ৬ নেতা ১০ম কংগ্রেস বা জাতীয় সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন। জাতীয় সম্মেলনে তারা অংশও নেননি। এর মধ্য দিয়ে মেননের পার্টি আরেক দফা প্রায় নিশ্চিত ভাঙনের মুখে পড়লো বলে মনে করা হচ্ছে।