প্রতিবেদন

সরকারের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও পিঁয়াজ নিয়ে অস্বস্তিতে সাধারণ মানুষ

এম নিজাম উদ্দিন
পিঁয়াজের দাম আর কত বাড়বে Ñ এ প্রশ্ন এখন ভোক্তাদের। রাজধানীর খুচরা বাজারে গত ৯ নভেম্বর মানভেদে প্রতি কেজি পিঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১২০ টাকায়, ১০ নভেম্বর ১৩০ টাকায়, ১১ নভেম্বর ১৪৫ টাকায়, ১২ নভেম্বর ১৬০ টাকায়, ১৩ নভেম্বর ১৮০ টাকায় এবং ১৪ নভেম্বর ডাবল সেঞ্চুরি অর্থাৎ ২০০ টাকায়। ১৫ নভেম্বর ডাবল সেঞ্চুরি অতিক্রম করে কোনো কোনো জায়গায় জাত ও মানভেদে ২২০-২৮০ টাকায়ও বিক্রি হতে দেখা যায় পিঁয়াজ।
সরকারি নানা উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্টদের আশ্বাসেও কমছে না নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির দাম। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে স্বল্প আয়ের মানুষ। অবস্থা এমন যে, বাজার থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সব জায়গায় এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘পিঁয়াজ’। যারা আগে বাজারে গিয়ে ২ কেজি পিঁয়াজ কিনতেন তারা এখন কিনছেন ১ কেজি। বিভিন্ন স্থানে অনেকেই আবার হালিতেও কিনছেন পিঁয়াজ। কেউ কেউ আবার বলছেন, পিঁয়াজ না খেলে কী হয়? পিঁয়াজ ছাড়া কি রান্না হয় না? অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ভারত পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করলেও দাম এতটা বাড়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ, বর্তমানে চাহিদার চেয়ে বেশি পরিমাণ পিঁয়াজ দেশে রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী গত বছর থেকে এ পর্যন্ত যে পরিমাণ পিঁয়াজ দেশে আছে, তা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি। তাহলে এভাবে লাগামহীনভাবে পিঁয়াজের দাম বাড়ছে কেন?
১৪ নভেম্বর দেশের বাজারে ১ কেজি পিঁয়াজ বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। এর আগের দিন ১৩ নভেম্বর দেশি পিঁয়াজ পাইকারিতে কেজি ১৮০ এবং খুচরায় ১৯০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
পিঁয়াজের এ দাম দণি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের পর শ্রীলঙ্কায় ১৬০, পাকিস্তানে ১৪০ ও ভারতে ৬০-৬৫ টাকায় প্রতি কেজি পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অস্থির হয় পিঁয়াজের বাজার। ২৯ সেপ্টেম্বর পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে ভারত। তখন কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়ায় দেশি পিঁয়াজের দাম। ভারতীয় পিঁয়াজও বিক্রি হতে থাকে ১০০ টাকার কাছাকাছি দরে।
বেশিরভাগ বিক্রেতা জানান, বাজারে ভারতীয় পিঁয়াজ নেই। দেশি পিঁয়াজের মজুতও প্রায় শেষ। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলে পিঁয়াজ পরিবহনে বিঘœ ঘটায় বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। তাই দাম বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর বাজারে প্রতি কেজি দেশি পিঁয়াজের দাম গত সপ্তাহেও ছিল ১১৫ থেকে ১২৫ টাকা। আমদানি করা পিঁয়াজের দাম ছিল ১০৫ থেকে ১১৫ টাকা।
৭ নভেম্বর সরকার-মজুদদার ও আড়তদার মিলে পিঁয়াজের দাম নির্ধারণ করে দেয়। ৮ নভেম্বর প্রায় সব আড়তে বেঁধে দেয়া দামে বিক্রি শুরু করে। কিন্তু ৯ নভেম্বর থেকে লোকসানের অজুহাতে মজুদদাররা আড়তে পিঁয়াজ দেয়া কমিয়ে দেয়। এরপর ১০ ও ১১ নভেম্বর পিঁয়াজ দেয়নি বেশিরভাগ মজুদদার।
১২ নভেম্বর অল্পকিছু পিঁয়াজ বাজারে ঢুকেছে। তবে আড়তদাররা জানান, তাদের নির্ধারিত দামে বিক্রি না করলে শ্যামবাজারে আর পিঁয়াজ দেয়া হবে না। এ কারণেই সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
৭ নভেম্বর সরকারের বেঁধে দেয়া দাম ছিল প্রতি কেজি দেশি পিঁয়াজ ৯০, মিয়ানমারের ৮৫ এবং চীন, মিশর ও তুরস্কের ৬০ টাকা। রাজধানীসহ সারাদেশের প্রতিদিনের বাজারদর পর্যবেণ করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ১১ নভেম্বর প্রতি কেজি দেশি পিঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হয়েছে ১৩৫ ও আমদানি করা ১২৫ টাকা। সে হিসাবে মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৬৫ থেকে ৮৫ টাকা।

পিঁয়াজ নিয়ে মারামারি
দেশে পিঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ২০০ টাকা। কোথাও তা আরো বেশি। নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্য কিনতে এখন তাই মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ভরসা রাষ্ট্রীয় বিক্রয় সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-এর খোলা ট্রাক।
রাজধানীর বেশকিছু স্থানে ১৪ নভেম্বর খোলা ট্রাকে ৪৫ টাকা কেজি দরে পিঁয়াজ বিক্রি করতে দেখা যায়। একজনের কাছে ২ কেজি পিঁয়াজ বিক্রির অনুমতি দেয়া হয়। ফলে পিঁয়াজ কিনতে লম্বা লাইনও চোখে পড়ে। পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় লাইনের শেষের দিকে থাকলে পিঁয়াজ না কিনেই ফিরতে হতে পারে। তাই ক্রেতাদের মধ্যে থাকে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
তবে জাতীয় প্রেসকাবের সামনের রাস্তায় পিঁয়াজের ক্রেতাদের দেখা গেছে মারামারি করতে। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে কয়েকজন নারী ও পুরুষকে হাতাহাতি করতে দেখা যায়। লাঠালাঠিও চোখে পড়ে এসময়। কয়েকজন ক্রেতা বলেন, লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে সামান্য হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।
পিঁয়াজের দাম যে ক্রেতাদের অস্থির করে তুলেছে – এ যেন তারই চিত্র।

১৫ বছর পর পাকিস্তান থেকে
পিঁয়াজ আনছে বাংলাদেশ
কমপে ১৫ বছর পর বাংলাদেশের কাছ থেকে পিঁয়াজ রপ্তানির অর্ডার পেল পাকিস্তান। সম্প্রতি করাচির রোশান এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে ঢাকার তাসো এন্টারপ্রাইজের মধ্যে ৩০০ টন পিঁয়াজ আমদানির চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কমপে ১২ কন্টেইনার পিঁয়াজ বাংলাদেশে আসবে। এরপর আরও রপ্তানি হবে।

ফায়দা লুটছে অসাধু ব্যবসায়ীরা
দফায় দফায় দাম বাড়ায় পিঁয়াজ নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে সাধারণ মানুষ। এভাবে দাম বাড়ার পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ১৪ মনিটরিং টিম সর্বদা কাজ করছে নিত্যপণ্যের বাজারে। অকারণে মজুদকৃত পিঁয়াজের দাম বেশি নেয়া হলে শাস্তি পেতে হবে ব্যবসায়ীদের।
এদিকে গত ১৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ বাজারের কাছে চাক্তাই খালের কিছুটা দূরে রাতের অন্ধকারে কে বা কারা বস্তাভর্তি পচা পিঁয়াজ ফেলে গেছে। এতে বুঝা যায়, দাম আরো বাড়ার আশায় নিজেদের গুদামে মজুদ করে রাখা পিঁয়াজে পচন ধরার কারণে পচা পিঁয়াজ এখন ফেলে দেয়া হচ্ছে।
আসলে বাস্তবতা অনেকটা এরকমই। ব্যবসায়ীদের অতি লোভের ব্যাপারটি না থাকলে বাজারে পিঁয়াজ নিয়ে এতো আওয়াজ হতো না। সাধারণ মানুষ বা সরকার কেউই এরকম অস্বস্তিতে পড়তো না।

এবার কার্গো বিমানে আসছে পিঁয়াজ
সাধারণ মানুষের মতো অনেক ব্যবসায়ীও মনে করেন, গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজিতে বাজার থেকে পিঁয়াজ উধাও হয়ে গেছে। ‘পিঁয়াজ নেই’ বলে কৃত্রিম সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে দাম হাঁকা হচ্ছে ইচ্ছেমতো। মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কারসাজি ছড়িয়ে পড়ছে খুচরা বাজারেও। দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে দাম। সর্বশেষ গত ১৫ নভেম্বর বিকেলে রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় ২৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি দেশি পিঁয়াজ।
তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে পিঁয়াজের সংকট থাকলেও ৩০-৪০ টাকা মূল্যের পিঁয়াজের দাম এতো বাড়ার কোনো কারণ নেই। তারা পিঁয়াজের অস্বাভাবিক এই দাম বৃদ্ধির পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
জানা যায়, এর প্রতিকারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আপৎকালীন চাহিদা মেটাতে ১৭ নভেম্বর থেকে জরুরি ভিত্তিতে মিশর থেকে কার্গো বিমানে করে পিঁয়াজ আনা হচ্ছে। নতুন পিঁয়াজ বাজারে না আসা পর্যন্ত প্রতিদিন কার্গো বিমানযোগে পিঁয়াজ আনার এ উদ্যোগ অব্যাহত রাখা হবে বলে জানা গেছে। এছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) প্রথমবারের মতো তুরস্ক থেকে পিঁয়াজ আমদানি করছে।
জানা গেছে, ১৫ নভেম্বর (শুক্রবার) ছুটির দিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সারাদিন অফিস করেন। বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীনের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জরুরি ভিত্তিতে পিঁয়াজ আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। দেশের অন্যতম ব্যবসায়িক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্র“পকে দ্রুত পিঁয়াজ আনার জন্য সরকারি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এই শিল্প গ্র“পকে বাংলাদেশে অবস্থিত মিশর দূতাবাস সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়ার কারণে ১৭ নভেম্বর থেকে কার্গো বিমানে করে দেশে পিঁয়াজ আসা শুরু হয়েছে। এতে পিঁয়াজের বাজার দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

পিঁয়াজাগ্রাসন ঠেকাতে ভোক্তারাও নিতে পারেন বিশেষ উদ্যোগ
পিঁয়াজ অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নয়, নিত্যব্যবহার্য পণ্য। তরকারিতে লবণ না দিলে চলে না, কিন্তু পিঁয়াজ না দিলেও চলে। স্বাদের একটু হেরফের হয় সত্য, তবে তাই বলে পিঁয়াজের জন্য এত হাহাকার করতে হবে কেন? অনেকের মতে, ভোক্তারাই পারেন পিঁয়াজের টুঁটি চেপে ধরতে। যে তরকারিতে ৪টি পিঁয়াজ দেয়া দরকার, সেখানে ১টি পিঁয়াজ দিলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না। এতে পিঁয়াজের চাহিদা এক-চতুর্থাংশে নামিয়ে আনা যাবে। পিঁয়াজ যেহেতু পচনশীল সবজি, সেহেতু চাহিদা কমে গেলেই পচনের হাত থেকে রক্ষা করতে মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা পিঁয়াজের দাম কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে। রসনাবিলাসের স্বার্থে পিঁয়াজের জন্য হাহাকার না করে তাই সকলেরই উচিত পিঁয়াজের ব্যবহার কমিয়ে দেয়া। এটাই হবে অতি লোভী ব্যবসায়ীদের ওপর একটি মোক্ষম আঘাত।