প্রতিবেদন

অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে সরকার : প্রশাসনের নানামুখী উদ্যোগে কমতে শুরু করেছে পিঁয়াজের দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি বিভিন্ন পদেেপ কমতে শুরু করেছে পিঁয়াজের দাম। ভর্তুকি দিয়ে মশলাজাতীয় এই পণ্য ভোক্তাদের কাছে কম মূল্যে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এস আলম গ্রুপের মাধ্যমে কার্গো বিমানে করে আমদানি করা পিঁয়াজ সরকারি বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা টিসিবির মাধ্যমে ৪৫ টাকা কেজি দরে সারাদেশে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন বিমানে আসছে ১১০ টন পিঁয়াজ। দ্রুত সংকট মেটাতে প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ৭৫০ টন পিঁয়াজ আসছে বিমানে। এছাড়া সমুদ্রপথে আরও ৬০ হাজার টন পিঁয়াজ আসছে। স্বল্প দামে এসব পিঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে টিসিবির মাধ্যমে। রাজধানী ঢাকায় টিসিবির বিক্রি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। মহানগরের গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে ৫০টি ট্রাকে করে প্রতি কেজি পিঁয়াজ ৪৫ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সারাদেশেও টিসিবি পিঁয়াজ বিক্রি শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে দেশের বাজারে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পিঁয়াজের দাম বাড়তে থাকে। আবার নভেম্বরের শেষ দিকে এসে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পিঁয়াজের দাম কমতেও দেখা গেছে। ১৬ নভেম্বর যে পিঁয়াজের দাম ছিল ২৬০ টাকা কেজি, ২৪ নভেম্বর প্রতিকেজি দেশি পিঁয়াজ ১২০-১৪০ এবং আমদানি করা পিঁয়াজ ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে খুচরা বাজারে। এছাড়া বাজারে নতুন ‘পাতা পিঁঁয়াজ’ পাওয়া যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে উঠতে শুরু করেছে নতুন পিঁয়াজ।
এসব কারণে ডিসেম্বরের শুরুতে প্রতি কেজি পিঁয়াজের দাম ৬০ থেকে ৮০ টাকায় নেমে আসবে আর ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পিঁয়াজ তার স্বাভাবিক মূল্য ফিরে পাবে বলে অনেকে মনে করছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, চড়া দামের কারণে ঘরে ঘরে এখন পিঁয়াজের ব্যবহার কমে গেছে। বাজারগুলোতে ক্রেতার সংখ্যা অনেক কম। বিমানে পিঁয়াজ আসার খবরে এবং বিভিন্ন বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে পিঁয়াজের দাম এখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় কমছে।
বাংলাদেশে পিঁয়াজ আমদানি হয় প্রধানত ভারত থেকে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সেই ভারত পিঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এরপরই অস্থির হয়ে ওঠে দেশের পিঁয়াজের বাজার। ৬০ থেকে ৭০ টাকার পিঁয়াজ এক লাফে শতক ছাড়ায়। এরপর দাম বাড়তে বাড়তে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল পিঁয়াজ। চলতি মাসে ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের আঘাতের পর দাম আরো বাড়তে থাকে। দুইদিনের মধ্যে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজির পিঁয়াজ বেড়ে ২০০ টাকার ওপরে উঠে যায়। খুব দ্রুতই দাম আড়াই শ টাকার কাছাকাছি চলে আসে। গত ১৫ ও ১৬ নভেম্বর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে ২৬০ টাকায় প্রতি কেজি দেশি পিঁয়াজ বিক্রি হয়।
অবশ্য মুনাফালোভী ব্যবসায়ীচক্রের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপে এরপর থেকে পিঁয়াজের দাম কমতে শুরু করে; যা এখনও অব্যাহত আছে।
আড়তদাররা বলছেন, ৩ কারণে পাইকারি বাজারে কমেছে পিঁয়াজের দাম। ১. বিমানে করে পিঁয়াজ আসছে। ২. ৫০ হাজার টন পিঁয়াজ ইতোমধ্যে চলে এসেছে চট্টগ্রামে। ৩. ভোক্তারা পিঁয়াজ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানান, ম্যাজিস্ট্রেটের ঘন ঘন মনিটরিংয়ের কারণেও দাম কমে এসেছে। পাইকারি কেনা চালান থেকে সর্বোচ্চ ১০ টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করতে পারছেন বিক্রেতারা। এরচেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে জরিমানা করা হচ্ছে। তাছাড়া বিদেশ থেকে কার্গো বিমানে দ্রুত পিঁয়াজ আমদানি হচ্ছে ও নতুন পিঁয়াজ বাজারে আসছে Ñ এমন খবরেও পিঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে।
এ প্রসঙ্গে সরকারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যতদিন বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হচ্ছে ততদিনই পিঁয়াজ আমদানি করা হবে। মূল্য স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিমানে করে পিঁয়াজ আনা অব্যাহত থাকবে।
পিঁয়াজ চাষে কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার চিন্তাভাবনাও করছে সরকার। কৃষকরা ভালো দাম পেলেই পিঁয়াজ চাষাবাদে উৎসাহী হবেন। পিঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে সমন্বিত পদপে নেয়া হবে। ভারতীয় বা বিদেশি পিঁয়াজের ওপর নির্ভর না করে দেশি পিঁয়াজ দিয়েই যাতে বার্ষিক চাহিদা মেটানো যায়, সে লক্ষ্যে আগামী মৌসুম থেকে কৃষকদের প্রণোদনা দেয়ার পরিকল্পনাও করছে সরকার।
অনেকে বলছেন, লাফিয়ে লাফিয়ে পিঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে অসৎ ব্যবসায়ীদের মজুদদারিই দায়ী। দাম আরো বাড়বে Ñ এই অপচিন্তা থেকে আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা পিঁয়াজ মজুদ করতে থাকে। রড-সিমেন্টের ব্যবসায়ী, হোটেল ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সবজি ব্যবসায়ীরাও পিঁয়াজ মজুদে নেমে যায়। শুধু তা-ই নয়, সাধারণ ভোক্তারাও সীমিত আকারে পিঁয়াজ মজুদে নেমে যায়। ১০০-১২০ টাকা কেজি যখন পিঁয়াজ চলছিল, তখনও অনেক ভোক্তা ১ কেজির জায়গায় ১০ কেজি পিঁয়াজ কিনতে থাকে। এসব কারণে পিঁয়াজের দাম লাফিয়ে বেড়ে একসময় আড়াই শ’ টাকা ছাড়িয়ে যায়। তবে পিঁয়াজ মজুদ করে প্রায় সব অসৎ মজুদদারই বড় অংকের গচ্ছা দিয়েছে। পিঁয়াজ সংরক্ষণের যে নীতি আছে, তা না মেনে যে যেভাবে সম্ভব সেভাবে মজুদ করায় ৫-৭ দিনের মধ্যেই মজুদকৃত পিঁয়াজ পচতে শুরু করে। ফলে আশাতীত লাভের বদলে পুঁজি হারিয়েছে প্রায় সব অসৎ মজুদদার। আর পচা পিঁয়াজের স্থান হয়েছে নদীবক্ষে। পচা পিঁয়াজ ফেলে দিতেও ক্যারিং চার্জবাবদ অনেককে গচ্ছা দিতে হয়েছে অনেক টাকা।
পিঁয়াজের দাম ২৬০ টাকার বেশি বাড়তে না দিয়ে তাকে আবার নিচের দিকে নামিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকাটি রেখেছেন ভোক্তারাই। তারা পিঁয়াজ খাওয়া একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন। যে ভোক্তা ১ কেজি কিনতেন, তিনি ১ পোয়া কিনতে থাকেন। ফলে যে খুচরা দোকানদার সারা দিনে ১২০ কেজি পিঁয়াজ বিক্রি করতেন, তার বিক্রি ১৫-১৬ কেজিতে নেমে আসে। বিক্রি কম হওয়ায় খুচরা দোকানদার পাইকারের কাছ থেকে ক্রয় কমিয়ে দেন। পাইকার কমিয়ে দেন আড়তদারের কাছ থেকে ক্রয়। এ কারণে অসৎ মজুদদারের পিঁয়াজ পচতে শুরু করে। তাই বলা যায়, এবার পিঁয়াজ আগ্রাসন অনেকটাই রুখে দিয়েছেন ভোক্তারা। অবশ্য পিঁয়াজের বাজার সহনীয় মাত্রায় নামিয়ে আনতে সরকারও ছিল বেশ সক্রিয়।