রাজনীতি

এবার বিদিশাকে নিয়ে বেদিশা এরশাদের জাপা

নিজস্ব প্রতিবেদক
রওশনের পর এবার বিদিশাকে নিয়ে বেদিশা অবস্থায় পড়েছে এরশাদের জাতীয় পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান এরশাদের ভাই জি এম কাদের এ নিয়ে পড়েছেন মহা ঝামেলায়। রওশনকেন্দ্রিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলেও বিদিশাকেন্দ্রিক ঝামেলা জাতীয় পার্টি ও তার চেয়ারম্যানকে অনেক ভোগাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন। কারণ, রওশনের ক্ষেত্রে সম্পত্তিসংক্রান্ত জটিলতা না থাকলেও বিদিশার ক্ষেত্রে এই জটিলতাই মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে।
কিছুদিন আগে রওশন যেমন তার পুত্র রাহগির আল মাহি সাদকে রংপুরে এরশাদের শূন্য আসনে মনোনয়ন দেয়া নিয়ে জাতীয় পার্টিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিলেন, একই কায়দায় এরশাদপুত্র শাহতা জারাব এরিককে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে বিদিশাও জাপায় নতুন রাজনীতির নকশা করছেন বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা।
জাপার নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিদিশা রাজনীতিতে আসার পথ খুঁজছেন। তার রাজনৈতিক আকাক্সক্ষাও জাতীয় পার্টিকে ঘিরে। কিন্তু এরশাদের জীবদ্দশায় সাংসারিক জীবনের ইতি ঘটে যাওয়ায় এরশাদের অবর্তমানে তার স্ত্রী পরিচয়ে জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে প্রবেশ করতে পারছিলেন না বিদিশা। সে কারণে এখন তিনি ‘এরিকের মা’ পরিচয়ে জাপার রাজনীতির ঘুঁটি নাড়াতে নেমেছেন। জাপার অনেকেই মনে করছেন, এবার বিদিশার কেইসটি বেশ জটিল। কারণ, রওশনের তুলনায় বিদিশা অনেক বেশি বিচক্ষণ। তাই রাজনীতিতে বিদিশার গুটির চালও হবে প্রতিপক্ষের জন্য অনেক বেশি ভাবনার কারণ।
জানা গেছে, এরিকের প্রতি অবহেলার খবর গণমাধ্যমে আসার আগে থেকেই বিদিশা প্রতিনিয়ত জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে নিয়ে ফেসবুকে নেতিবাচক স্ট্যাটাস দিতে থাকেন। অনেকে মনে করেন, এর মূল কারণই হলো বিদিশা রাজনীতিতে আসার পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করছেন জি এম কাদেরকে।
এ ধরনের স্ট্যাটাস দেয়ার আগে বিদিশা রাজনীতিতে আসার আকাক্সক্ষার কথা গণমাধ্যমে বলেছেন। তিনি বলেছেন, এরশাদের স্ত্রী হিসেবে তিনি সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছেন। মানুষের সঙ্গে মিশেছেন। ফলে তার পে রাজনীতি করা কঠিন হবে না।
যদিও এখন বিদিশা’র সোজাসাপ্টা উত্তর, তিনি তার সন্তান এরিককে ছাড়া কিছুই চান না। ছেলের ভবিষ্যতই তার কাছে সব। প্রেসিডেন্ট পার্কে এরিককে নিয়মিত খাবার দেয়া হচ্ছে না। ট্রিটমেন্টও করা হচ্ছে না। ফলে তার ওজন কমে গেছে। এ জন্যই তিনি তার পুত্রকে আর একা থাকতে দিতে চাচ্ছেন না। আর তাই তিনি প্রেসিডেন্ট পার্কে এসে উঠেছেন।
গত ১৮ নভেম্বর এরশাদের ছেলে এরিক তার মা বিদিশাকে প্রেসিডেন্ট পার্কে রাখতে গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডিতে এরিক বলেন, মা কাছে না থাকায় তার সেবা হচ্ছে না। তিনি প্রতিবন্ধী, তাই মাকে নিজের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট পার্কে রাখতে চান।
জিডিতে এরিকের প্রতি অবহেলার জন্য চাচা জি এম কাদেরকে পরোভাবে দায়ী করেন এরিক। তবে জিডির ঘটনাটিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন জিএম কাদের। তিনি বলেন, এরিক একজন ‘স্পেশাল চাইল্ড’। আমার মনে হয় না, সে নিজে থেকে এসব (জিডি) করেছে। কেউ হয়ত তাকে দিয়ে এসব করাচ্ছে। দলে বা দলের বাইরে তার কোনো শত্রু এ কাজ করাচ্ছে বলে মনে করেন জিএম কাদের।
এর আগে ৭ এপ্রিল এরিকের ভরণপোষণের জন্য জীবদ্দশায় এরশাদ তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্ট গঠন করেন। ওই ট্রাস্টিতে এরশাদসহ ৫ জন রয়েছেন। অন্যরা হলেন এরিক এরশাদ, এরশাদের একান্ত সচিব মেজর খালেদ আক্তার (অব.), চাচাতো ভাই মুকুল ও এরশাদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর। তবে এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ভাই জিএম কাদের নেই ট্রাস্টে। ট্রাস্টের সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসা, গুলশানের দুটি ফ্যাট, বাংলামটরের দোকান, রংপুরের কোল্ডস্টোরেজ, পল্লিনিবাস, রংপুরে জাতীয় পার্টির কার্যালয় এবং ব্যাংকে ১০ কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিট।
জাতীয় পার্টির এক প্রেসিডিয়াম সদস্য এ বিষয়ে বলেন, পৈতৃক সূত্রে এরিকের পাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ এবং এরশাদের দ্বিতীয় পুত্র হিসেবে জাপা রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার সুযোগ রয়েছে এরিকের। সে কারণে এরিককে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন এরিকের মা বিদিশা।
এদিকে ভাতিজা হাতছাড়া হয়ে গেলে অর্থ ও রাজনীতি দুটো দিক থেকেই অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে, সে জন্য খুব বুঝেশুনেই পা ফেলছেন জিএম কাদের।
উল্লেখ্য, এরশাদ ও বিদিশার বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান হয় ১৪ বছর আগে। কিন্তু আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী এরিককে রাখতেন পিতা এরশাদ প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায়। স্বাভাবিকভাবেই বিদিশাকে আলাদা থাকতে হয়। গত ১৪ জুলাই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যান। এরপর থেকে এরিককে নিয়ে নানা শঙ্কার কথা প্রকাশ করেন বিদিশা। অবশেষে ১৭ নভেম্বর বিদিশা প্রেসিডেন্ট পার্কে গিয়ে ওঠেন। সেখানে যাওয়ার পর এরিকের অযতেœর খবর গণমাধ্যমে আসে। বিদিশার পাশাপাশি এরিকও এসব অভিযোগের কথা গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেন।
জাতীয় পার্টির একটি পক্ষের ভাষ্য, বিদিশা তার সন্তানের কাছে এসেছেন। সন্তানও বলছে তার কাছে থাকতে। ফলে এরশাদের পরিবারের কেউ বা জাতীয় পার্টির কেউ এখানে এসে হস্তেেপর সুযোগ আইনিভাবে পাবে বলে মনে হচ্ছে না।
তবে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, বিদিশার সঙ্গে জিএম কাদেরের সমঝোতা ছাড়া এ দ্বন্দ্বের অবসান সম্ভব নয়। তারা আরো মনে করছেন, বিদিশা কেবল পুত্রের টানে প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায় আসেননি, কৌশলে জাপার রাজনীতিতে ভাগ বসাতেই এসেছেন। তাই জাপার রাজনীতিতে স্পেস পেতে রাজনীতির কূটকৌশলে এবার দাবার চাল চালছেন বিদিশা। ফলে বিদিশাকে নিয়ে নতুন করে সংকটে পড়েছে জাতীয় পার্টি।
এরশাদের প্রথম স্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এবং পার্টির চেয়ারম্যান ও এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদের কিভাবে এ সংকট কাটিয়ে উঠবেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।