রাজনীতি

গ্রুপিং নিষ্ক্রিয়তা দলত্যাগ : বিএনপিতে হতাশা

নিজস্ব প্রতিবেদক
দলের ভেতরে গ্রুপিং, স্থায়ী কমিটি ও মহানগর নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রভাবশালী নেতাদের দলত্যাগের হিড়িকে বিএনপিতে লেজে-গোবরে অবস্থা বিরাজ করছে। বড় কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারছে না দলটি, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি প্রশ্নে জোরালো কোনো আন্দোলনও করতে পারছে না দেশের অন্যতম বৃহৎ এ রাজনৈতিক দলটি। নেতায়-নেতায় দ্বন্দ্ব, দলে নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং পারস্পরিক সন্দেহ-অবিশ্বাসের কারণে অস্থিরতা চলছে বিএনপিতে। আর এ নিয়ে চরম হতাশায় নিমজ্জিত বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকরা।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য জেনারেল মাহবুবুর রহমান রাজনীতি থেকে অবসরে চলে যাওয়ায় এবং ভাইস চেয়ারম্যান মোরশেদ খান দল ত্যাগ করায় সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে বিএনপি।
জেনারেল মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, অন্তত দেড় থেকে দুই মাস আগেই নিজের হাতে লেখা পদত্যাগপত্র তিনি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে দিয়েছেন। বিগত কয়েক বছরে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, ইনাম আহমেদ চৌধুরী ও কেন্দ্রীয় নেতা আলী আসগর লবির পর গত ৫ নভেম্বর বিএনপি ছাড়েন আরেক ভাইস চেয়ারম্যান এম মোরশেদ খান।
জানা গেছে, মাহবুবুর রহমান ও মোরশেদ খানের পদত্যাগের নেপথ্য কারণ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত জানুয়ারিতে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে মাহবুবুর রহমান অভিযোগ করেন, একাদশ নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি ভুল করেছে। যদি দলের নেতৃত্ব দিতে হয়, তারেক রহমানকে দেশে আসতে হবে। দেশে এসেই তাকে নেতৃত্ব দিতে হবে। বিদেশ থেকে দলের নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব নয়। অপরদিকে মোরশেদ খান বলেছেন, বিএনপি এখন স্কাইপে পার্টিতে পরিণত হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকার মতায় আসার পর থেকে বিগত ১০ বছরে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, মোসাদ্দেক আলী ও এমএ হাসেমের মতো আলোচিত নেতারা দল ছেড়েছেন। সর্বশেষ পদত্যাগ করলেন এম মোরশেদ খান ও জেনারেল মাহবুবুর রহমানের মতো হেভিওয়েট নেতা। এই দুই নেতার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বিএনপি ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ (অব.), মেজর শাহজাহান ওমর (অব.), আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ একাধিক নেতা বিএনপি থেকে পদত্যাগ করতে পারেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন না করলে নেতাদের পদত্যাগ ঠেকানো যাবে না। খালেদা জিয়ার অবর্তমানে তারেক রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দলে। কোনো নেতাকেই পাত্তা না দেয়া এবং স্কাইপের মাধ্যমে নির্দেশ চাপিয়ে দেয়ার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
২৯ অক্টোবর ২০১৫ সালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী দল থেকে পদত্যাগ করেন। ৬ আগস্ট ২০১৬-তে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান মোসাদ্দেক আলী ফালু। কমিটি ঘোষণার সাড়ে ৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরাবর লেখা পদত্যাগপত্রটি নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছে দেন তিনি। সম্প্রতি ফালুর ৩৪৩ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ হয়। জানা গেছে, ফালুকে নাকি বলা হয়েছে, বিকল্প বা নতুন বিএনপি গঠন না করলে বাদবাকি সম্পত্তিও হাতে রাখা যাবে না। ফলে ফালুও ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন নতুন বিএনপি গঠনের কাজে। ফালু মূলত নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনে অর্থসংস্থানের কাজটি করছেন। এ বিষয়ে ফালু পারটেক্স গ্রুপের কর্ণধার এম এ হাসেমের সাহায্যও নিচ্ছেন। শোনা যাচ্ছে, এম এ হাসেম নতুন বিএনপির মহাসচিবের পদ পেতে যাচ্ছেন।
নেতাদের একে একে পদত্যাগের কারণে থমকে আছে দলটির পুনর্গঠন প্রক্রিয়া। সাংগঠনিক কর্মকা-ে গতি আসছে না কোনোভাবেই। ৮১টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ১৯টিতে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির দায়িত্বশীল নেতাদের ৩ মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে বলা হলেও নির্ধারিত সময়ে অধিকাংশ জেলাই তা দিতে পারেনি। অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল আংশিক কমিটি দিয়ে বছরের পর বছর পার করছে। তাদেরও নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে কয়েক দফা সময় বেঁধে দেয়া হয়। তার পরও তারা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দাবি উঠেছে নতুনভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে কমিটি গঠনের।

নির্ধারিত সময়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি বিএনপির আরও চার অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, মৎস্যজীবী দল, তাঁতী দল ও ওলামা দল। এরই মধ্যে বিএনপির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলের দুই শীর্ষ পদে নির্বাচনের মাধ্যমে নেতা বানানো হয়েছে। ছাত্রদল নেতাকর্মীরা নিয়মিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও যাচ্ছেন। তবে তারাও সব গ্রুপের নেতাদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। জানা গেছে, সেখানে গ্রুপিং মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।
বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি, ছাত্রদলের মতো বিএনপির সব অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের সব কমিটিই যেন কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলেও নির্বাচিত কমিটি চান তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যুবদলের মাত্র বাকি দুই মাস। তার পরও নানা সমীকরণে এ দুই অঙ্গসংগঠনের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা যাচ্ছে না। জানা যাচ্ছে, গ্রুপিংয়ের কারণেই বিএনপির বিভিন্ন স্তরের কমিটি গঠন আটকে আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে যারা আছেন তাদের মধ্যে আছে তীব্র মতবিরোধ। স্থায়ী কমিটির কোনো সদস্যই অপর কোনো সদস্যকে বিশ্বাস করেন না। মওদুদ, নজরুল ইসলাম, মঈন খানরা মনে করেন, মির্জা ফখরুল সরকারের সঙ্গে আঁতাত করে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান হতে দিচ্ছেন না। আবার মির্জা ফখরুলও মনে করেন, মওদুদ আহমেদ ও তার অনুসারীরা আওয়ামী লীগে যোগ দিতে পারেন যেকোনো সময়েই। উভয় পক্ষই আবার এসব নিয়ে লন্ডন অবস্থানরত তারেক রহমানের কাছে অভিযোগ জানিয়ে আসছে নিয়মিত।