প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রতিবেদন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর: খুলে গেল সম্ভাবনার দ্বার : বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে আমিরাতের শ্রমবাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর থেকে দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্টারে শুরু হওয়া দুবাই এয়ার শো ২০১৯-এর ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আবুধাবির যুবরাজ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর ডেপুটি সুপ্রিম কমান্ডার শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান এক সৌজন্য সাাৎকালে এ ইঙ্গিত দেন।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য শিগগিরই তার দেশের শ্রমবাজার পুনরায় খুলে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে যুবরাজ নাহিয়ান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলেন, ‘আপনার পরবর্তী আমিরাত সফরকালে আপনাকে এ প্রশ্নটি আর করতে হবে না।’ তিনি বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য আগের চেয়ে বেশি ওয়ার্ক পারমিট দেয়ারও ইঙ্গিত দেন।
যুবরাজ বাংলাদেশ থেকে চাল আমদানিরও আগ্রহ প্রকাশ করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদনকারী দেশ। বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের চাল উৎপাদন করছে। আমরা বিভিন্ন দেশে চাল রপ্তানি করছি।
যুবরাজ বলেন, আমরা বাংলাদেশ থেকে সেরা মানের চাল আমদানি করতে চাই। আমরা বিভিন্ন ধরনের চাল দেখার জন্য বাংলাদেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাবো।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫ দিনব্যাপী ষোড়শ দ্বিবার্ষিক এয়ার শো ইভেন্ট ‘দুবাই এয়ার শো-২০১৯’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন। দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ বিমানবন্দরের (দুবাই আল মাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবেও পরিচিত) দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্টারে ১৭ নভেম্বর এই এয়ার শো’টি শুরু হয়। ১৭ থেকে ২১ নভেম্বর প্রতিদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত দুবাইয়ের আকাশে দ্বিবার্ষিক এয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে সফল এয়ার শো এবং মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকার বৃহত্তম এরোস্পেস ইভেন্ট।
উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের আমন্ত্রণে এই এয়ার শো’তে অংশ নেন। পরে তিনি দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্টারে ফাইং ডিসপ্লে উপভোগ করেন।
এ উপলে এবছর বিশ্বের ৮৭ হাজারের বেশি ট্রেড ভিজিটর ও ১ হাজার ৩০০ এক্সিবিটর দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ বিমানবন্দর দুবাই ওয়ার্ল্ড সেন্টারে সমবেত হন। এতে ১৬০ দেশ থেকে ১৬৫ বিমানসংস্থা অংশ নেয়।
২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত এয়ার শো সাফল্যকে ছাড়িয়ে যায় এবারের শো। ওই শোতে ১১ হাজার ৩৮০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের অর্ডার পাওয়া গিয়েছিল। এর মধ্যে ছিল এয়ারবাসের কাছে ৪৩০ বিমানের জন্য ৪ হাজার ৯৫০ কোটি মার্কিন ডলারের ইন্ডিগো পার্টনার্স অর্ডার এবং ফাই দুবাইয়ের সঙ্গে বোয়িংয়ের ২ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার চুক্তি।
১৯৮৯ সালে দুবাই এয়ার শোটি প্রথম প্রদর্শিত হয়। এটি এখন বেসামরিক বিমান শিল্পের জন্য একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফরমে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের বিমান প্রস্তুতকারক সংস্থাসমূহ এখানে তাদের প্রস্তুতকৃত নতুন মডেলের বিমান প্রদর্শন ও বিক্রয় করে। পাশাপাশি এখানে প্রাইভেট ও পাবলিক সেক্টরের কোম্পানিগুলো নতুন নতুন প্রযুক্তি, সুযোগ এবং এই শিল্পের প্রতিবন্ধকতাগুলো নিয়েও আলোচনা করতে পারে। ইউএই’র বিমান কোম্পানিগুলো বেশকিছু নতুন অর্ডার ঘোষণা করে এবং তাদের আগের চুক্তিগুলো নিশ্চিতের মাধ্যমে একে এই অঞ্চলের সবচেয়ে সফল ও বৃহত্তম প্রদর্শনিতে পরিণত করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পারস্পরিক সুবিধার্থে বাংলাদেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় েেত্র বিশেষ করে তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ইউএই’র উদ্যোক্তাদের আরো বড় আকারের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আমাদের সরকার অর্থনৈতিক অঞ্চলে, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে এবং হাইটেক পার্কে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
আবুধাবিতে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানকালে হোটেল সাংরি লা’তে তার সম্মানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত সংবর্ধনা ও নৈশভোজে যোগদান করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপ (বেজা) বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ওয়ান স্টপ’ সার্ভিস সুবিধা এবং ১০০-এর অধিক অবকাঠামোসহ নানা প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদান করছে।
দণি এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সব থেকে সহনীয় বিনিয়োগ নীতি বিদ্যমান উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগকারীরা তৈরি পোশাকশিল্প, ভবন অবকাঠামো নির্মাণ, নির্মাণশিল্প, যোগাযোগ, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, জাহাজনির্মাণ, পর্যটন, হালকা প্রকৌশল, শিল্পপার্ক এবং পণ্য সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শীর্ষ উদ্যোক্তাগণ ও ইউএই’র স্বনামধন্য ব্যবসায়ী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং তাদের সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
দেশে বিদ্যমান বৈদেশিক বিনিয়োগ সুরা নীতিমালার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আইন দ্বারা বিদেশি বিনিয়োগকে সুরা প্রদান, শুল্ক রেয়াত, যন্ত্রাংশ আমদানিতে স্বল্প শুল্ক, যেকোনো সময় লাভ ও আসলসহ প্রস্থানের সুবিধা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
তৈরি পোশাকের পরই আমাদের রপ্তানির েেত্র কৃষিভিত্তিক পণ্য উল্লেখযোগ্য আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আরব আমিরাতের উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশের কৃষিজাত এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।’
বাংলাদেশ ও আরব আমিরাতের মধ্যে ব্যবসা ও বিনিয়োগের েেত্র অপার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতেই বাংলাদেশ ও ইউএই’র যৌথ উদ্যোগের জন্য সম্ভাবনাময় বেশকিছু খাত খুঁজে বের করেছি।
প্রধানমন্ত্রী আশা করেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপ (বিডা) ও আমিরাতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্তৃপ এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপ (বেজা) ও আমিরাত অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপরে মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দুই দেশের মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের েেত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশের পণ্য আমদানির জন্য ইউএই’র প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ফার্মাসিউটিক্যালস সামগ্রী, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক, চামড়া, খাদ্যদ্রব্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, নিটওয়্যার, ফ্রোজেন ফুড, বস্ত্র, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য এবং প্রকৌশল সামগ্রী আমদানি করতে পারে আমিরাত।
প্রধানমন্ত্রী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর ইউএই সফরের কথা স্মরণ করেন, যখন বাংলাদেশ ও ইউএই’র মধ্যে বন্দর স্থাপন, শিল্প পার্ক, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, এলএনজি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের চুক্তি স্বার হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সফরকালে আমরা ইউএই’র প থেকে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছিলাম। ইউএই বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও সৌরশক্তিসহ জ্বালানি েেত্র বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা তখন এলএনজি টার্মিনাল ও বন্দর প্রতিষ্ঠায় আগ্রহ দেখিয়েছিল। আমরা তখন আমিরাত অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপরে কাছ থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রকল্প চালুর প্রস্তাব পেয়েছিলাম।

দুবাই এয়ার শোতে বিমানের
দু’টি ড্রিমলাইনার কেনার ঘোষণা
দুবাই এয়ার শোতে বোয়িংয়ের কাছ থেকে দু’টি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার কেনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িং এক বিবৃতিতে এ খবর জানিয়েছে।
এ ধরনের উড়োজাহাজ এমনিতে ৫৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারে বিক্রি করে বোয়িং। তবে বাংলাদেশ তারচেয়ে অনেক কম দামে উড়োজাহাজ দু’টি পেতে যাচ্ছে বলে এর আগে ধারণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।
বিমানের বহরে এখন ৩টি বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনারসহ মোট ১৬টি উড়োজাহাজ আছে। এর মধ্যে ৪টি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ এবং ২টি ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজ ভাড়া করা।
বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল মুহাম্মাদ এনামুল বারীকে উদ্ধৃত করে বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বিমানবহরের আধুনিকায়নে জোর দিচ্ছি, যাতে আধুনিক প্রযুক্তির নতুন উড়োজাহাজ নিয়ে আমরা আরো বেশি গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি। ২৯৮ আসনের ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার একবার জ্বালানি নিয়ে ১৩ হাজার ৯৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে পারবে। পুরনো উড়োজাহাজগুলোর তুলনায় এই ড্রিমলাইনারে জ্বালানি খরচ ও কার্বন নিঃসরণ ২৫ শতাংশ কম হবে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিমানের বহরে চতুর্থ ড্রিমলাইনার ‘রাজহংস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেই আরও ২টি নতুন ড্রিমলাইনার কেনার কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সেদিন বলেছিলেন, আমরা একটা খবর পেলাম, বোয়িং আরো দুইখানা প্লেন খুব শিগগিরই বিক্রি করতে চাচ্ছে। কেউ অর্ডার দিয়ে পরে নেয়নি। সুযোগটা আমরা নেব।
এরপর ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার ২টির দাম নিয়ে বিমান ও বোয়িংয়ের মধ্যে চলে দর-কষাকষি। সেই কাজ শেষ হওয়ার পর সিয়াটলে বোয়িং ফ্যাক্টরিতে শুরু হয় বিমানের জন্য উড়োজাহাজ দু’টি সাজিয়ে তোলার প্রস্তুতি। উড়োজাহাজ দু’টি চলতি বছরই বিমানের বহরে যুক্ত হতে পারে।