প্রতিবেদন

বাংলাদেশ আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের তৃতীয় জাতীয় সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : মাদক-সন্ত্রাস-দুর্নীতি দূর করে মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি নিশ্চিত রাখার অঙ্গীকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগের পর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনেও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। সংগঠনের ঢাকা উত্তর ও দণি শাখা কমিটিতেও এসেছে নতুন মুখ।
১৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে নির্মল রঞ্জন গুহ এবং সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আফজালুর রহমান বাবুর নাম ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে স্বেচ্ছাসেবক লীগের দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে কয়েকজনের নাম প্রস্তাব করা হয়। এসময় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, উপ-দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়–য়া প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
কমিটি ঘোষণার আগে ওবায়দুল কাদের বলেন, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি পদে ৬ জন এবং সাধারণ সম্পাদক পদে ১২ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রার্থীদের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে সংগঠনটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং মহানগর উত্তর ও দেিণর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
এরপর তিনি নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় নতুন সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ আগের কমিটির সহ-সভাপতি এবং সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। আর নতুন সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু আগের কমিটির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
দ্বিতীয় অধিবেশন থেকে আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ ঢাকা মহানগর উত্তর ও দেিণর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নামও ঘোষণা করেন ওবায়দুল কাদের। ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি হয়েছেন ইতঃপূর্বে মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসা ইসহাক মিয়া। আর সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আনিসুর রহমান নাঈম। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর দেিণর সভাপতি হয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কামরুল হাসান রিপন ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন বিগত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তারেক সাঈদ।
সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর তাৎণিক প্রতিক্রিয়ায় নির্মল রঞ্জন গুহ বলেন, জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সেই দায়িত্ব আমি অরে অরে পালন করবো। সারাদেশেই স্বেচ্ছাসেবক লীগকে সুসংগঠিত করে রাখবো।
নতুন নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া দায়িত্ব সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবো।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃষ্টিনন্দন ও নানা সাজে সজ্জিত ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে উপস্থিত হলে সারাদেশ থেকে আসা সংগঠনটির হাজার হাজার নেতাকর্মী গগনবিদারী স্লোগান দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। প্রধান অতিথি হিসেবে আওয়ামী লীগ সভাপতি উপস্থিত হওয়ার পর জাতীয় সংগীতের সুরে সুরে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিব এবং বিশেষ অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে সম্মেলনের শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর দৃষ্টিনন্দন সুবিশাল নৌকা প্রতীক দিয়ে তৈরি মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধান অতিথিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক নির্মল রঞ্জন গুহ ও সদস্য-সচিব গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু। অভ্যর্থনা উপ-কমিটির সহ-সভাপতি মতিউর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক সুব্রত পুরকায়স্থ প্রধানমন্ত্রীকে সংগঠনের প থেকে ক্রেস্ট প্রদান করেন। এরপর প্রধান অতিথিকে উত্তরীর পরিয়ে দেন দুই নেত্রী মাহফুজা বেগম সাঈদা এবং কাজী শাহানারা ইয়াসমিন। এরপর দলীয় সংগীত এবং থিম সংয়ের তালে তালে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীরা। এরপর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে লেখা দুটি গান পরিবেশন করেন দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে দুর্নীতি-সন্ত্রাস-মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখার কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, সন্ত্রাসী কর্মকা-, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে সেই টাকায় ফুটানি করলে দেশের মানুষ কখনো বরদাশত করবে না। কেন দুর্নীতি ও চুরি করে টাকা বানাতে হবে? ওই সন্ত্রাসী কর্মকা-, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে সেটা দিয়ে আবার বিলাসবহুল জীবনযাপন করা কেউ মেনে নেবে না। অসৎ পথে উপার্জিত অর্থ দিয়ে বিরিয়ানি খাওয়ার চেয়ে সৎ পথে নুন-ভাত খাওয়া অনেক মর্যাদার।
স্বেচ্ছাসেবক লীগ সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক নির্মল রঞ্জন গুহের সভাপতিত্বে এবং সদস্য-সচিব গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চুর সঞ্চালনায় সম্মেলনে আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন অভ্যর্থনা উপ-কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান মতি। শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন দপ্তর সম্পাদক সালেহ মোহাম্মদ টুটুল। এরপর সবাই ১ মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করেন। পরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় অধিবেশনে কাউন্সিলরদের মতামত ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক লীগের নতুন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী কারো অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশের মানুষের জন্য একটা সুন্দর জীবন দেয়াই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের মূল ল্য। দেশে একটা শ্রেণি আছে, একটি গোষ্ঠী আছে- মানুষ যখন ভালো থাকে তখন তারা মনোকষ্টে ভোগে, অসুস্থতায় ভোগে। তাদের এই রোগ কিভাবে সারানো যায়, এটা জনগণই বিচার করবে। জনগণই এটা দেখবে।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, দেশ দারিদ্র্যমুক্ত হলে দারিদ্র্য বিক্রি করে যারা চলত, তাদের আঁতে ঘা লাগে। তাই তারা বারবার বাগড়া দেয়ার চেষ্টা করে এবং অপপ্রচার চালায়। কেউ যেন এই অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হন, আমি সেটাই বলব। আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর থেকে জনগণের যে সেবা দিচ্ছে, এই কথাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এই গতি আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।
দুর্নীতি-সন্ত্রাস-মাদকের বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই দেশ থেকে মাদক, সন্ত্রাস, দুর্নীতি দূর করতে চাই। এর বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে, সেই অভিযান আমরা অব্যাহত রাখব। কারণ বাংলাদেশের মানুষের জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আর একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ থাকলেই উন্নতি সম্ভব। সেই শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আমরা চাই।
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগকে নিঃশেষ করতে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া অনেক ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু পারেনি। কারণ আওয়ামী লীগের শিকড় বাংলাদেশের মানুষের মাঝে। আওয়ামী লীগের শিকড় দেশের মাটির অনেক গভীর প্রোথিত। আমরা যতই এগিয়ে যাই, মানুষ যখন ভালো থাকে তখন একটা না একটা ইস্যু তৈরি করা হয় এবং মানুষের মাঝে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের মূল নীতিই হচ্ছে দেশের কোনো মানুষ পেছনে পড়ে থাকবে না। আমরা বিজয়ী জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবেই সারা বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে চাই।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সরকার গৃহীত আর্থসামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য যা যা করণীয় তা আমরা করে যাচ্ছি এবং করে যাব। এমন একটা সময় ছিল যখন মানুষ এক বেলা খেতে পেত না, এটা খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ১০-১১ বছর আগের কথাটিই আপনারা চিন্তা করুন, তখন দেশের অবস্থা কী ছিল, এখন আর সেই অবস্থা নেই।
‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ সবাইকে পড়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, নীতি ও আদর্শ নিয়ে বঙ্গবন্ধু মহান আত্মত্যাগ করে গেছেন, দেশকে স্বাধীন করে গেছেন। কখনো নিজের দিকে তাকাননি। তাই যারা মুজিবাদর্শে বিশ্বাসী, সবাইকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতি মেনেই নিজেদের গড়ে তুলতে হবে, মানবকল্যাণে কাজ করতে হবে। এদেশকে গড়ে তুলতে হবে। কী পেলাম বা কী পেলাম না, সেটি বড় কথা নয়। দেশের মানুষকে কী দিয়ে যেতে পারলাম সেটিই বড় কথা। বাংলাদেশকে আমরা এক উচ্চ মর্যাদায় নিয়ে গেছি। এই মর্যাদা আমাদের ধরে রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণে সরকারের ১০০ বছরের ডেল্টা প্ল্যান ঘোষণার কথা উল্লেখ করে বলেন, ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, আর ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই একটি বছরকে আমরা মুজিববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছি। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দণি এশিয়ার সবচেয়ে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। আর ২০৭১ সালে আমরা স্বাধীনতার শতবার্ষিকী পালন করব। সে কারণে আমরা শত বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, যাতে আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি সুন্দর ও অর্থবহ জীবন দিতে পারি। তাই সবাইকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে সেবার মনোভাব নিয়ে জনকল্যাণে কাজ করে যেতে হবে। ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশকে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলব।