অর্থনীতি

বাড়তি আয়ের সন্ধানে সঞ্চয়পত্রের বিকল্প খুঁজছে স্বল্প আয়ের মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বল্প আয়ের মানুষের আয়ের একটা বড় উৎস ছিল সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। এ নিরাপদ উৎস থেকে মাসে তারা যে মুনাফা পেতেন, তা দিয়েই চলত তাদের অনেকের সংসার। প্রতারণার এ যুগে অন্য কোনো খাতে বিনিয়োগে আস্থা রাখতে না পেরে স্বল্প আয়ের মানুষের আস্থার একমাত্র স্থান ছিল সঞ্চয়পত্র। কিন্তু সেখানেও হানা দিয়েছে প্রতারকচক্র। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থকে হালাল করার মাধ্যম হিসেবে তারা সঞ্চয়পত্রকে বেছে নিয়েছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে সঞ্চয়পত্র কেনার ওপর বেশকিছু শর্ত জুড়ে দিয়েছে। এতে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনা কিছুটা হয়ত কমেছে, কিন্তু যারা কষ্টার্জিত আয় সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতেন, তারা পড়েছেন বিপদে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ তাদের কাছে অলাভজনক হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন বিধি-বিধানের কারণে এটি কেনাও তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ফলে অনেক স্বল্প আয়ের মানুষই এখন সঞ্চয়পত্র কিনতে না পেরে অন্যান্য ছোট ব্যবসায় তাদের মূলধন বিনিয়োগ করছেন। কেউ অটোরিকশা কিনে তা চালাতে নেমে পড়েছেন, কেউ ভ্যানে করে সবজি বিক্রিতে নেমে পড়েছেন, কেউ করছেন হকারি। আর যারা অবসরপ্রাপ্ত ও পেনশনভোগী তারা নেমে পড়েছেন টিউশনিতে।
বেনামে, একই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বহুবার, সীমার অতিরিক্ত ও অবৈধ অর্থে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ঠেকাতে অনলাইন ডেটাবেস চালু হওয়ার পর থেকেই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। সঞ্চয়পত্র কেনায় আরোপ করা হয়েছে বেশকিছু শর্ত। ফলে চলতি অর্থছরের শুরু থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমছে। সেপ্টেম্বরে ধস নেমেছে বিক্রিতে, বিক্রি ৩৪২ শতাংশ কমেছে।
আসলে ব্যাংকবিমুখ সঞ্চয়কারীদের ভিড় ঠেকাতে সরকারের নানা পদপে এবং মুনাফা কমায় নিরাপদ এ বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি হয়েছে ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৮৫ শতাংশ কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টম্বর সময়ে নিট সঞ্চয়পত্রের বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৪১২ কোটি টাকা।
জানা গেছে, বর্তমানে ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্রের সুদের ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। ১ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের সব লেনদেন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। দুর্নীতি কিংবা অপ্রদর্শিত আয়ে সঞ্চয়পত্র কেনা বন্ধ করতে ক্রেতার তথ্যের একটি ডাটাবেসে সংরণের ল্েয অভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিক্রি কার্যক্রম শুরু করেছে।
এছাড়া সঞ্চয়পত্রে বড় বিনিয়োগে কঠোর হয়েছে সরকার। চাইলেই ভবিষ্য তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। এখন প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনতে হলে কর কমিশনারের প্রত্যয়নপত্র লাগে। পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ফার্মের নামে সঞ্চয়পত্র কিনতে লাগছে উপ-কর কমিশনারের প্রত্যয়ন। এসব কড়াকড়ির ফলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ১৭ হাজার ৪২১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের মূল ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৭২৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয় ৭ হাজার ৭৫৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা। আর ৩ মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি ৭ লাখ টাকা।
একক মাস হিসেবে সেপ্টেম্বরে মোট ৬ হাজার ১১৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের মূল ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ১২৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এই খরচে সুদ বাবদ চলে গেছে ২ হাজার ৬৭৭ টাকা। এ হিসাবে সেপ্টেম্বরে নিট বিক্রির পরিমাণ হচ্ছে ৯৮৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে মোট ৫ হাজার ২১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের মূল ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৭১৫ কোটি ৩০ হাজার টাকা। এই খরচে সুদ বাবদ চলে গেছে ২ হাজার ২০৫ কোটি ৪০ হাজার টাকা। এ হিসাবে আগস্টে নিট বিক্রির পরিমাণ হচ্ছে ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে মোট সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় ৬ হাজার ৯১ কোটি টাকা। এর মধ্যে আগের কেনা সঞ্চয়পত্রের মূল ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় হয় ৩ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা। সুদ বাবদ খরচ হয় ২ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সর্বশেষ ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদ হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমানো হয়েছিল। বর্তমানে পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, ৫ বছর মেয়াদী বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, ৩ মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের ১১ দশমিক ০৪ শতাংশ, পেনশনার সঞ্চয়পত্রের ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ মুনাফা দেয়া হয়।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলেন, কয়েক বছর ধরেই সঞ্চয়পত্র বেশি বিক্রি হচ্ছিল। বিকল্প অর্থায়নের তেমন কোনো উপায় না থাকায় সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নিয়েছে। ব্যাংক আমানতের সুদহার কম ও পুঁজিবাজারের অবস্থা ভালো না হওয়ায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকেছিলেন। কারণ এখানে সুদহার ৯ থেকে ১১ শতাংশ। বিভিন্ন নাম দেখিয়ে অনেকে এখানে বিনিয়োগ করে। কিন্তু করের হার বৃদ্ধির কারণে এখন কম মুনাফা পাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া টিআইএন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফলে অনেকে সঞ্চয়পত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে বিকল্প আয়ের সন্ধানে হাঁটছেন স্বল্প আয়ের সাধারণ মানুষ।