প্রতিবেদন

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে অনুরোধ জানালেন বান কি মুন

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে এ সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন।
২৩ নভেম্বর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এর একটি রাজনৈতিক সমাধান হওয়া উচিত।
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ জানিয়ে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বলেন, রোহিঙ্গারা যাতে তাদের নিজ দেশে অবাধ ও নিরাপদে ফিরে যেতে পারে তার জন্য মিয়ানমার সরকারের আরো উদার ও সহানুভূতিশীল হওয়া আবশ্যক।
১১ লাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বান কি মুন বলেন, বাংলাদেশ সরকার এককভাবে এ কাজটি করতে পারবে না। এ কারণে, আমি রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করছি।
এ বছর বাংলাদেশে তার শেষ সফরকালে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বলেন, এটা একটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক অবস্থা। পরিস্থিতি (রোহিঙ্গাদের ভোগান্তি) বর্ণনা করা কঠিন, যা আমার কাছে খুবই দুঃখজনক মনে হয়েছে। বান কি মুন জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ল্যমাত্রার (এসডিজি) বাস্তবায়ন, নারী ও যুবকদের মতায়নসহ সকল বিশ্ব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ও ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজন কার্যক্রমে যথেষ্ট ভালো করছে উল্লেখ করে বান কি মুন বলেন, জলবায়ু অভিযোজনে গোটা বিশ্বে বাংলাদেশের সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর ফাতু বেনসৌদা বলেছেন, আইসিসির বিচারকরা শঙ্কিত যে, রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলাকে মিয়ানমার ‘রাষ্ট্রীয় নীতি’ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
এ নারী কর্মকর্তা ২৩ নভেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তিসঙ্গত কারণে বিচারকের এই বিশ্বাস জন্মেছে যে, সেখানে মিয়ানমার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার রাষ্ট্রীয় নীতি গ্রহণ করতে পারে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের পরিকল্পিত অপরাধের তদন্ত শুরুর ব্যাপারে আইসিসি’র অনুমোদনের পরে এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়।
বিচারকদের পর্যবেণ তুলে ধরে প্রসিকিউটর বলেন, সেখানে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, মিয়ানমারের বিভিন্ন সরকারি বাহিনীর উপস্থিতিতে এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সংস্থা ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থা ও কিছু স্থানীয় লোকদের যৌথ অংশগ্রহণে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
অভিযোগ গ্রহণ করে বিচারকদের পর্যবেণ তুলে ধরে প্রসিকিউটর বলেন, এই দমন কার্যক্রম এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অথবা জাতিগত নিধনের অভিযোগ মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
বিচারকরা বৃহত্তর পরিসরে এই অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন উল্লেখ করে বেনসৌদা এটিকে মিয়ানমারের নৃশংসতার বিরুদ্ধে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
১৪ নভেম্বর প্রি-ট্রায়াল চেম্বার তৃতীয় আদালতের বিচারকরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের জন্য প্রসিকিউটর অফিসকে নির্দেশ দিয়েছে।
এতে উল্লেখ করা হয়, মিয়ানমার আইসিসি’র সদস্য দেশ নয়, এজন্য দেশটি আইসিসি’র প নয়। তবে বাংলাদেশ আইসিসি’র প।
প্রসিকিউটর চেম্বার আদালতের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে আদালত বলেছে, মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে যে সব বেসামরিক নাগরিক বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে এসেছে তারা হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে এখানে এসেছে, এই ঘটনায় সুস্পষ্টভাবে ভৌগোলিক সংযোগ রয়েছে। এটি মিয়ানমারের অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। উল্লেখ্য, এর আগে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, সংকট মোকাবিলায় অব্যাহতভাবে বাংলাদেশের পাশে থাকবেন তারা। ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় প্রদানে বাংলাদেশের মহানুভবতার প্রশংসা করেন তারা এবং এই বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় বাংলাদেশের পাশে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তারা। রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে মিয়ানমারের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করবে বলেও তারা আশ্বস্ত করেছিলেন। এই দু’জনের পাশাপাশি আরো অনেক বিশ্বনেতৃত্ব ও সংস্থা অনুরূপ আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু গত ২ বছর ধরে জাতিসংঘের সাবেক ও বর্তমান মহাসচিব, বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট, ওআইসি মহাসচিব, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার প্রেসিডেন্টসহ অন্য নেতৃবৃন্দ রোহিঙ্গাদের বিষয়ে অনেক কথা বললেও মিয়ানমার ১ জন রোহিঙ্গাকেও বাংলাদেশ থেকে ফেরত নেয়নি।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ একটি মুসলিমপ্রধান দেশ এবং রোহিঙ্গারা সব মুসলমান। ধর্মীয় এই সুযোগটি গ্রহণ করেই মিয়ানমার নিপীড়ন চালিয়ে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, মুসলিমপ্রধান দেশ বলেই সব রোহিঙ্গাকে একমাত্র বাংলাদেশেরই গ্রহণ করতে হবে, এটা কেমন কথা! রোহিঙ্গা নামের এই মুসলিম জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব নেয়া উচিত বিশ্বের সব মুসলিমপ্রধান রাষ্ট্রকেই। ‘বাংলাদেশ বিরাট মানবতা প্রদর্শন করেছে’- এমন স্তুতিবাক্য না করে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর উচিত রোহিঙ্গাদের ভাগ করে নিয়ে যাওয়া। তাহলে বাংলাদেশের ওপর চাপ অনেকটাই কমে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে যেহেতু রাজি করানোই যাচ্ছে না, সেহেতু মুসলিম দেশগুলোর উচিত বাংলাদেশের সমস্যা লাঘব করা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা অনেক হয়েছে। এখন মুসলিম দেশগুলোর উচিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের দুর্দশা লাঘবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া।