প্রতিবেদন

সরকারের ত্বরিত হস্তক্ষেপে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরুদ্ধে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের কারণে সারাদেশে টানা দু’দিন সাধারণ মানুষের যারপরনাই ভোগান্তির পর অবশেষে ২০ নভেম্বর মধ্যরাতে ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা এসেছে। সরকার ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পর সরকারের তরফে বলা হয়েছে, চালক-শ্রমিকরা এখন যেসব লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র ব্যবহার করছেন, সেগুলো আরও ৭ মাস অর্থাৎ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবেন। এ সময়ের মধ্যে চালকদের লাইসেন্স, গাড়ির কাগজপত্র ইত্যাদি বিআরটিএ-র কাছ থেকে হালনাগাদ করে নিতে হবে।
এ থেকে বোঝা যায়, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এখনই কার্যকর হচ্ছে না। এছাড়া পরিবহন নেতাদের প থেকে সড়ক পরিবহন আইনের যে ৯টি ধারা সংশোধনের দাবি তোলা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে যৌক্তিক যেসব দাবি রয়েছে, সেগুলো মেনে নেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে সরকারের প থেকে। এ ল্েয চালক-শ্রমিকদের দাবিগুলো যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে সুপারিশ আকারে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সার্বিক পরীা-নিরীার পর এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ২০ নভেম্বর রাত ১২টা ৫০ মিনিটে প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এ সময় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতাসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটে দেশব্যাপী ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হয় যানবাহন সংকট। এ অবস্থার উত্তরণে সেদিন পরিবহন নেতাদের সঙ্গে ধানমন্ডির বাড়িতে বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কিন্তু ওই বৈঠকে কোনো ফয়সালা না হওয়ায় ২০ নভেম্বর রাতে ফের বৈঠকে বসে দু’প।
ইতঃপূর্বের খবরে বলা হয়, নতুন সড়ক আইন প্রত্যাহারের একপেশে অযৌক্তিক দাবিতে একাট্টা পরিবহন শ্রমিকরা। তাদের দাবি না মানলে মানুষ ভোগান্তিতে পড়বে, জরুরি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে, বেড়ে যাবে পণ্যসামগ্রীর দাম। কাজেই বাধ্য হয়ে একপর্যায়ে এসব দাবি মেনে নেয়া হবে Ñ এমন বদ্ধমূল ধারণার জোরেই দেশজুড়ে পরিবহন শ্রমিকদের ঘোষিত-অঘোষিত ধর্মঘট শুরু হয়। এতে দেখা যায়, যা ইচ্ছে তা-ই হচ্ছে দেশের সড়কগুলোতে। পরিবহন খাতে এহেন কা- নতুন নয়, এর আগেও যাচ্ছেতাই পরিস্থিতি দেখা গেছে।
পরিবহন শ্রমিকদের যুক্তি, ইচ্ছা করে কেউ দুর্ঘটনা ঘটায় না। তাই দুর্ঘটনার জন্য, এমনকি মানুষ মেরে ফেলার জন্যও শাস্তি নয়। এ কুযুক্তি দেখিয়ে দেশের মানুষকে জিম্মি করে তারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, অহরহ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন, রাস্তায় মর্জিমাফিক যানজট সৃষ্টিÑ এসব অপকর্ম করতে চাইছে। এককথায়, সড়কে চলমান নৈরাজ্য অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই ধর্মঘটের নামে চলে পরিবহন সংকট। এতে জনভোগান্তি চরমে পৌঁছায়।
উল্লেখ্য, ২০১০ সাল থেকে সড়ক আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার পর থেকেই মানুষকে জিম্মি করার কর্মসূচি দেয়া হয়।
ধর্মঘট আহ্বান করতে হলে শ্রম আইনে বেশ কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। যেমন, নোটিশ দেয়া, ন্যূনতম সময় দেয়া, উভয়পরে সঙ্গে কথা বলে সমঝোতার চেষ্টা করা। এর কোনোটিই না করে যখন খুশি ধর্মঘট ডাকে পরিবহন নেতারা। বিষয়টি তুলে ধরলে তারা বলে, ধর্মঘট ডাকা হয়নি, এটি তাদের ‘স্বেচ্ছায়’ কর্মবিরতি।
এতে রাজধানীসহ সারাদেশে স্বল্প ও দূরপাল্লার যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েই ট্রাক-কাভার্ডভ্যান সড়কে নামায়নি নেতারা। আর যাত্রীবাহী যান চলাচল অনেকটা কমে আসে ধর্মঘটের ঘোষণা ছাড়াই অর্থাৎ অঘোষিত ধর্মঘটের কারণে।
সড়কে ১৯ ও ২০ নভেম্বর দু’দিনের পরিস্থিতি ছিল খুবই নাজুক। এই ২ দিন রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য যাত্রীকে বাসের অপোয় দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। কেউ কেউ রিকশায় বা ভ্যানে চড়ে কিংবা হেঁটেই কর্মস্থলের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন আন্তঃজেলা ও মহাসড়কেরও একই দশা; যান চলেনি বললেই চলে। কিছু স্থানে গাড়ি সচল রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যায় পুলিশ বাহিনী। দেশের বিভিন্ন সড়কে সরকারি গণপরিবহন বিআরটিসি এবং ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচলও আটকে দেয় উচ্ছৃঙ্খল পরিবহন শ্রমিকরা। বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে আড়াআড়িভাবে গাড়ি রেখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। কেউ বিকল্প বাহনে গন্তব্যে যেতে চাইলেও বাধা দেয়া হয়।
গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার ব্যাপারে পরিবহন নেতা খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, আইনে মৃত্যুদ- আছে Ñ এমন গুজব ছড়িয়ে শ্রমিকদের রাস্তায় নামানো হয়েছে। অথচ আইনের কোথাও এমন কথা বলা নেই। আমরাও চাই, আইন হোক। সবার সহযোগিতা দরকার। তবে কিছু েেত্র সংশোধনী এলে সবার জন্যই ভালো।

সেই ‘সবার জন্য ভালো’টিই বেরিয়ে এসেছে সরকার ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে বলা চলে কার্যত ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত স্থগিত হয়ে গেল।
পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, জনভোগান্তি দূর করতে সরকারপক্ষের এছাড়া অন্য কোনো উপায়ও ছিল না। কারণ, পরিবহন শ্রমিক ও নেতারা বস্তুত ২ দিন ধরে মানুষকে জিম্মি করে ফেলেছিল। সরকার ত্বরিত হস্তক্ষেপ করে মানুষকে জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করে।