প্রতিবেদন

বিশাল পরিসরে মুজিববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে আগামী বছরের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিববর্ষ’ ঘোষণা করে বিশাল পরিসরে উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথভাবে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘের শিা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা ইউনেস্কো। শুধু বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই নয়, বছরব্যাপী নানা আয়োজনে মুজিববর্ষ উদযাপিত হবে বিশ্বের ১৯৫টি দেশেও।
২৫ নভেম্বর প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে সংস্থার ৪০তম সাধারণ পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে বাংলাদেশের শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনির উপস্থিতিতে সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে মুজিববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
২৭ নভেম্বর গণভবনে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন প্রস্তুতি কমিটির সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইউনেস্কোর সঙ্গে মুজিববর্ষ একযোগে পালনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। ইউনেস্কো এই আয়োজনে যুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক পরিম-লে বঙ্গবন্ধুর বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবন আরো ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো।
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্যারিসে ২০৬তম ইউনেস্কো নির্বাহী বোর্ড সভায় বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ইউনেস্কোর সঙ্গে যৌথভাবে উদযাপনের প্রস্তাব সংস্থাটির সাধারণ সভার ৪০তম অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়। তবে এই প্রস্তাবে দুই সদস্য রাষ্ট্রের লিখিত সমর্থনের প্রয়োজন পড়ে। বাংলাদেশের এই প্রস্তাবে ভারত, জাপান, কিউবা, নেপাল ও পোল্যান্ড লিখিত সমর্থন দেয়। ফলে ২০৬তম বোর্ড সভায় প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এরপর গত ১৪ নভেম্বর ইউনেস্কো সাধারণ সভার চলতি অধিবেশনের প্রোগ্রাম ও বাজেট সম্পর্কিত এপিএক্স কমিশন কর্তৃক প্রস্তাবনাটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সুপারিশসহ প্লেনারি সেশনে পাঠানো হয়।
জানা যায়, গত বছরের ২৮ অক্টোবর শিা মন্ত্রণালয়াধীন বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন থেকে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সারসংপে পাঠানো হয়। সারসংেেপ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ইউনেস্কোর সঙ্গে যৌথভাবে উদযাপনের জন্য ইউনেস্কোতে প্রেরণের একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেন। এ অনুমোদনের পরিপ্রেেিত শিা মন্ত্রণালয় মাধ্যমিক ও উচ্চশিা বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সচিব সোহরাব হোসাইনকে আহ্বায়ক এবং বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল মনজুর হোসেনকে সদস্যসচিব করে ৭ সদস্যের একটি প্রস্তাবনা প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। প্রস্তাবনাটি চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুমোদন করেন শিামন্ত্রী।
প্যারিসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমতিয়াজ হোসেন, প্রথম সচিব নির্ঝর অধিকারী, ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধিদল প্রস্তাবনাটি প্রস্তুতে সহায়তা করে।
জানা যায়, ইউনেস্কো শিা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। ৫০ বছর বা এর গুণিতক যেকোনো বার্ষিকী যদি ইউনেস্কোর কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়, তাহলে ওই দিবস যৌথভাবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সেই হিসাবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ পর্যন্ত মুজিবর্ষের বিশ্বস্বীকৃতি দেয় ইউনেস্কো। এর ফলে ইউনেস্কো বা এর ১৯৫ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ বা দ্বিপীয়ভাবে এই দিবসটি পালনের সুযোগ তৈরি হলো।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী বিশ্বব্যাপী পালনের ব্যাপারে বাংলাদেশের প থেকে একাধিক যুক্তি তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, সদ্যস্বাধীন দেশে দ্রুততম সময়ে সংবিধান রচনার পাশাপাশি গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা এনে দিয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু তাঁর সারা জীবনে শিা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির মাধ্যমে জনগণের কল্যাণে কাজ করেছেন, যা সমাজে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। তিনি তাঁর জীবদ্দশায় একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সহনশীলতার সংস্কৃতিকে লালনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন; যে বিষয়টি ইউনেস্কোর মূল প্রতিপাদ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বঙ্গবন্ধু সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বলেছিলেন, ‘শিাই সর্বশ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ।’ এটি এখন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর আগে ইউনেস্কোর মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ক্যাটাগরিতে স্থান পায় বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ।
২৭ নভেম্বর গণভবনে অনুষ্ঠিত সভার শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মশতার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার সাহায্যে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আগামী ১৭ মার্চ বিকেল ৪টায় জাতীয় প্যারেড স্কোয়ারে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে।
কামাল চৌধুরী বলেন, অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ফাইপাস্ট, ১০০ শিল্পীর অংশগ্রহণে যন্ত্রসংগীত, বাংলা ও ইংরেজিতে থিম সং পরিবেশন, ৫৫ মিনিটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং লেজার শো।
তিনি আরো বলেন, অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর বড় কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ছোট কন্যা শেখ রেহানার হাতে ‘শ্রদ্ধা স্মারক’ তুলে দেয়া হবে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন। পরে প্রধানমন্ত্রী মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানমালা উদ্বোধন করবেন। পাশাপাশি কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন।
শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, শিামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, ড. গওহর রিজভী, ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী এবং সালমান এফ রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম, আইসিটি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।