প্রতিবেদন

ভর্তি লড়াইয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী-অভিভাবক: রয়েছে বাণিজ্যের ফাঁদও

নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন শিক্ষাবর্ষে ভর্তিলড়াই শুরু হয়েছে। ভর্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্কুল কর্তৃপক্ষ। ভর্তিযুদ্ধে নানা অসঙ্গতির কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উৎকণ্ঠাও আছে। কোনো কোনো বেসরকারি স্কুলে নভেম্বর থেকেই শুরু হয়েছে ভর্তি ফরম বিতরণ কার্যক্রম। তবে বেশিরভাগই শুরু হয়েছে ডিসেম্বরের ১ তারিখ থেকে, চলবে মাসজুড়ে।
প্রতি বছর এ সময় স্কুলে ভর্তিযোগ্য সন্তানদের অভিভাবকের চোখে ঘুম থাকে না। পছন্দের স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করানোই থাকে তাদের ল্য। এ কারণে ঠিকমতো হাঁটতে শেখার আগেই শিশুর পরিচয় ঘটে যায় প্রাইভেট টিউটর ও কোচিংয়ের সঙ্গে। আর এসব কোচিং সেন্টার শিশুদের স্কুলে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে রমরমা ব্যবসা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজধানীর নামিদামি স্কুলগুলোর বিরুদ্ধেও ভর্তিবাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। রাজধানীতে কিছু নামি বেসরকারি স্কুলে ভর্তির জন্য রীতিমতো যুদ্ধ হলেও প্রশিতি শিক এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো থাকার পরও শিার্থী পায় না অনেক সরকারি স্কুল। শিাবিদরা বলছেন, অভিভাবকদের পছন্দের স্কুলে ভর্তি হতেই শিশুদের নামিয়ে দেয়া হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে। এক শ্রেণির অভিভাবক এলিট রোগে ভোগে। তাদের মনে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সরকারি স্কুলে গরিবের সন্তানরা পড়াশোনা করে।
এবার মহানগরী ও জেলা সদরের পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ের স্কুলগুলোর ভর্তি আবেদনও অনলাইনে গ্রহণ করার রীতি চালু করা হয়েছে। এবারও প্রথম শ্রেণিতে লটারির মাধ্যমে ভর্তি করা হবে। আর দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লিখিত পরীার মাধ্যমেই শিার্থী বাছাই করা হবে। প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির জন্য একজন শিশুর বয়স হতে হবে ৬ বছরের উপরে। এসব বিষয় উল্লেখ করে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিার্থী ভর্তি নীতিমালা-২০২০ চূড়ান্ত করেছে শিা মন্ত্রণালয়।
এবার দ্বিতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এমসিকিউ পরীা নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু সে বিষয়ে দ্বিমত থাকায় আগের মতোই লিখিত পরীার মাধ্যমে শিার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত হয়েছে, সৃজনশীল বা এমসিকিউ কোনো পদ্ধতিতেই ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে না। ‘এক কথায় উত্তর দাও’ ভিত্তিতে পরীক্ষা নেয়া হবে। যেমন পল্লী কবির নাম কী? উত্তর: জসীম উদ্দীন। আই হ্যাভ এ কাউ এর প্যাসিভ ভয়েস কী? উত্তর: এ কাউ ইজ হ্যাড বাই মি। ২, ৪, ৪৮ এর ল.সা.গু কত? উত্তর: ৪৮।
ভর্তিযুদ্ধ বিষয়ে শিক্ষকরা বলেন, আমাদের অভিভাবকদের মনে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, সরকারি স্কুলে গরিবের সন্তানরা পড়াশোনা করে। তারা এক ধরনের এলিট রোগে ভুগছে। ফলে তারা কথিত নামিদামি স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করাতে মরিয়া হয়ে ওঠে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিভাবকরা সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে চায়। এজন্য তারা রীতিমতো যুদ্ধে নামে। তবে ভালো স্কুলের মাপকাঠি কি, তা অভিভাবকদের আগে বুঝতে হবে।
দ শিক ও সঠিক পরিচালনা পর্ষদ হলো একটি ভালো স্কুলের প্রধান মাপকাঠি। শুধু খ্যাতনামা স্কুলেই যে দক্ষ শিক্ষক আছে, এমন নয়। অনেক অখ্যাত স্কুলেও দক্ষ শিক্ষক আছেন, যারা নানা কারণে কোনো সময়েই খ্যাতনামা স্কুলে যেতে পারেন না।
ঢাকা শহরের নামিদামি স্কুলগুলোতে ভর্তিবাণিজ্য হয় বলে অভিযোগ আছে। কোন শিাপ্রতিষ্ঠানে কত আসন রয়েছে তার কোনো হিসাব নেই সরকারের কাছে। তাই শিাপ্রতিষ্ঠানে ২০০ আসন থাকলে সেখানে ১৫০ আসন ঘোষণা দিয়ে বাকি আসনগুলো টাকার বিনিমিয়ে ভর্তি করিয়ে থাকে। এছাড়া নামিদামি স্কুলে ভর্তির নিশ্চয়তা দিয়ে রাজধানীর কোচিং সেন্টারগুলোতেও চলছে রমরমা ব্যবসা।
জানা গেছে, রাজধানীর ৪১টিসহ সারাদেশের সকল সরকারি স্কুলে (সংযুক্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক) শুরু হতে যাচ্ছে নতুন শিাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম। রাজধানীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিা অধিদপ্তর (মাউশি)। ১ ডিসেম্বর রাত ১২টায় শুরু হয়ে আনলাইনে আবেদন গ্রহণ চলবে ১৪ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত। টেলিটকের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে (.িমিংধ.ঃবষবঃধষশ.পড়স.নফ) আবেদন করা যাবে।
এসএমএসের মাধ্যমে টেলিটক মোবাইল থেকে আবেদনের ফি দেয়া যাবে। ঢাকা মহানগরীর ৪১টি সরকারি স্কুলকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করে ভর্তি করা হবে। ১৮ ডিসেম্বর এ গ্রুপের ১৪টি স্কুলের, ১৯ ডিসেম্বর বি গ্রুপের ১৪টি স্কুলে এবং ২০ ডিসেম্বর সি গ্রুপের ১৩টি স্কুলের ভর্তি পরীা অনুষ্ঠিত হবে। ২৪ ডিসেম্বর তিন গ্রুপের স্কুলগুলোতে প্রথম শ্রেণির ভর্তি লটারি অনুষ্ঠিত হবে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ৫০ নম্বরে এক ঘণ্টার আর চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ১০০ নম্বরের দুই ঘণ্টার ভর্তি পরীা অনুষ্ঠিত হবে।
জানা গেছে, মোট ১৭টি হাইস্কুলে প্রথম শ্রেণিতে শিার্থী ভর্তি করা হবে। বাকি স্কুলগুলোর কোনোটিতে দ্বিতীয় আবার কোনোটিতে তৃতীয় বা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে শিা কার্যক্রম শুরু হবে।
প্রথম শ্রেণিতে শিার্থী নেয়া স্কুলগুলো হচ্ছে আজিমপুর গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি উচ্চ বিদ্যালয়, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ উচ্চ বিদ্যালয়, ধানমন্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ উচ্চ বিদ্যালয়ের ফিডার শাখা, তেজগাঁও বালক উচ্চ বিদ্যালয়, তেজগাঁও বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, শেরেবাংলা নগর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মতিঝিল বালক উচ্চ বিদ্যালয়, খিলগাঁও সরকারি হাইস্কুল, খিলগাঁও সরকারি হাইস্কুলের ফিডার শাখা, নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি বিজ্ঞান কলেজ সংযুক্ত উচ্চ বিদ্যালয়, মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও গণভবন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়।