রাজনীতি

যে কারণে ভেঙে গেল ওয়ার্কার্স পার্টি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আদর্শগত বিরোধের জের ধরে অবশেষে ভেঙে গেল বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। তবে অনেকে বলছেন, কিছুদিন আগে ‘আমি সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি’Ñ রাশেদ খান মেননের এমন বক্তব্য, দলীয় নেতাদের মূল্যায়ন না করা এবং তাঁর বিরুদ্ধে ক্যাসিনোকা-ের অভিযোগই ওয়ার্কার্স পার্টি ভেঙে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
ক্যাসিনোকা-ে জড়িত থাকার অভিযোগ এবং রাশেদ খান মেননের স্ববিরোধী মন্তব্যের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিতে সংকট ঘনীভূত হতে থাকে। দলটির পলিটব্যুরোর প্রবীণ সদস্য ও সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাসের দলত্যাগের পর বিদ্রোহ করে বসেন দলটির ১১ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পুলিটব্যুরোর আরো ২ সদস্যসহ কেন্দ্রীয় ৬ নেতা। ‘দল মার্কসবাদী-লেনিনবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্রমান্বয়ে দণিপন্থি, বিলোপবাদী ধারায় অধঃপতিত সুবিধাবাদী পার্টিতে পরিণত হয়েছে এবং ‘মেনন দুর্নীতিগ্রস্ত’Ñ এমন অভিযোগ এনে এই ৬ নেতা গত ২৮ অক্টোবর দলের আসন্ন দশম কংগ্রেস বা জাতীয় সম্মেলন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন। এরই মধ্য দিয়ে মেননের পার্টি প্রায় নিশ্চিত ভাঙনের মুখে পড়ে যায়।
এর ফলস্বরূপ ওয়ার্কার্স পার্টির দশম কংগ্রেস বর্জনকারী নেতারা ২৯-৩০ নভেম্বর যশোরে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ‘মতাদর্শ রা সমন্বয় কমিটি’র ব্যানারে জাতীয় সম্মেলন করে ১১ সদস্যের নতুন কমিটি গঠন করেছেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) নামে এই দলের সভাপতি নুরুল আহসান ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন ইকবাল কবির জাহিদ। তারা ২ জন রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। গত ২২ অক্টোবর পার্টির মূল নেতৃত্বের বিচ্যুতির কারণ দেখিয়ে দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পদ থেকে পদত্যাগ করেন ওয়ার্কার্স পাটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পলিটব্যুরোর সদস্য বিমল বিশ্বাস। এর ৪ দিন পর পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠকে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে’ বিমল বিশ্বাসকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ২৮ অক্টোবর ১০ম কংগ্রেস বর্জনের ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় আরো ৬ নেতা। তারা হলেন পলিটব্যুরোর সদস্য নুরুল হাসান ও ইকবাল কবির জাহিদ, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জাকির হোসেন হবি, মোফাজ্জেল হোসেন মঞ্জু, অনিল বিশ্বাস ও তুষার কান্তি দাস।
এর আগে গত ২ ও ৩ নভেম্বর রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে অনুষ্ঠিত হয় মেননের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কাস পার্টির কংগ্রেস। ওই কংগ্রেসে মেনন সভাপতি ও ফজলে হোসেন বাদশা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন।
ওয়ার্কার্স পার্টির নতুন অংশের নেতারা বলছেন, ২০ বছর আগে থেকেই পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় নিয়ে নেতাকর্মীদের অবস্থান তৈরি হয়েছিল। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মন্ত্রিত্ব, বিভিন্ন শিাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিষয়ে নাম আসা, বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নাম আসা, সর্বশেষ ক্যাসিনো কারবারিদের সঙ্গে রাশেদ খান মেননের নাম আসার পর দলের ভেতরে বিরোধিতা প্রকাশ্যে আসে।
একাদশ জাতীয় সংসদের সংরতি নারী আসনে মেননের স্ত্রী লুতফুন্নেছা বিউটিকে মনোনয়ন দেয়ার পরিবারতন্ত্রের বিষয়টি পার্টির একটি অংশ মেনে নিতে পারেনি। আর এসব কারণে দলে মেননের নেতৃত্ব মানতে অস্বীকার করেছে একটি অংশ।
১৯৯২ সালে গঠিত হওয়ার পর ওয়ার্কার্স পার্টি এই নিয়ে তৃতীয় দফায় ভাঙল। ১৯৯২ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি, ইউনাইডেট কমিউনিস্ট লীগ ও সাম্যবাদী দল (আলী আব্বাস) Ñ এই ৩টি দল নিয়ে গঠিত হয় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। ১৯৯৫ সালে পলিটব্যুরোর সদস্য টিপু বিশ্বাস ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে বেরিয়ে গিয়ে গঠন করেন নতুন দল গণফ্রন্ট। ২০০৪ সালে বেরিয়ে পলিটব্যুরোর আরেক সদস্য সাইফুল হক বর্তমানে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাশেদ খান মেননের অংশটির প থেকে অবশ্য নতুন সম্মেলন করার প্রতিবাদ করা হয়েছে। ২৯ নভেম্বর দলটির পলিটব্যুরোর সদস্য কামরুল হাসান স্বারিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ওয়ার্কার্স পার্টির নাম ব্যবহার করে কথিত জাতীয় সম্মেলন অবৈধ।
রাশেদ খান মেননের নেতৃত্ব অস্বীকার করে নতুন অংশের উদ্বোধনী সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন ঢাকার কয়েকটি বাম দলের শীর্ষনেতারা। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন নান্নু, ঐক্য ন্যাপের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হারুনার রশিদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য লিয়াকত আলী।
খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী কামরুল হাসানের ভাই নুরুল হাসানের সভাপতিত্বে সমাবেশে সম্মেলনের উদ্দেশ্য তুলে ধরেন ‘মতাদর্শ রা সমন্বয় কমিটি’র সমন্বয়ক ইকবাল কবির জাহিদ। বক্তব্য রাখেন বিমল বিশ্বাস, মনোজ সাহা প্রমুখ।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (মার্কসবাদী) নামে গঠিত নতুন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির বলেন, ২০২০ সালে উপমহাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার শতবর্ষ পূর্ণ হতে চলেছে। এ সময় আমরা দেশের বহুধাবিভক্ত পার্টিগুলোর ঐক্য চাই। ল্য যখন এক, তখন এক পতাকাতলে আসার সব বাধা আমরা অতিক্রম করার উদ্দেশ্যে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে ঐক্য অর্জন করবই। এই সম্মেলনে আমরা সেই প্রত্যয় ঘোষণা করছি।
সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এই সম্মেলনকে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে ঐক্যের ধারা এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানান।